Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৪ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:৫৯
দেশ শোষণমুক্ত হবেই হবে
বাদল নূর
দেশ শোষণমুক্ত হবেই হবে
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বলেছেন, দেশ শোষণমুক্ত হবেই হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন পথে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

তার মতে, গণতন্ত্রের পথ ধরেই সমাজতন্ত্রের দিকে এগোতে হবে। দেশে এ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে ছাত্র-যুবকদের ঐক্যবদ্ধ করা জরুরি। রাজধানীর বারিধারায় তার বাসভবনে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলছিলেন। উপমহাদেশে বাম রাজনীতির পুরোধাদের অন্যতম ৯৪ বছর বয়সী প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, রাজনীতি করতে হলে বা নেতা হতে হলে গবেষণা করা চাই। ব্যাপক পড়াশোনার প্রয়োজন। রাজনীতিকদের মধ্যে দেশপ্রেম থাকতে হয়। মানুষকে ভালোবেসে নিজ স্বার্থ বিসর্জন দিতে হয়। তিনি বলেন, এখন তো নেতা হওয়ার জন্য এসব কারও করতে হয় না। সদাচারী স্পষ্টভাষী প্রবীণ এই নেতা শারীরিক অসুস্থতার কারণে আগের মতো চলাফেরা করতে পারেন না। ডাক্তারের পরামর্শ মেনে জীবন-যাপন করতে হয় তাকে। কোমরে ব্যথা,  দিন-রাত বিছানায় শুয়ে থাকেন। তারপরও দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তা করেন তিনি। দেশ কেমন চলছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মন্দের ভালো। তবে দেশে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি চলছে। দেশ স্বাধীনের পর থেকে এ ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। কখন কী হয় বলা যায় না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে আমাদের চলতে হচ্ছে। এর বিকল্প নেই। তিনি বলেন,  বিএনপি ভারত নিয়ে কিছুদিন লাফালাফি করে এখন চুপ রয়েছে। তাদেরও করার কিছু নেই। জঙ্গিবাদের আস্ফাালনে উদ্বেগ প্রকাশ করে অধ্যাপক মোজাফফর বলেন, জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে জঙ্গিবাদ দমন করতে হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কিছু বিপথগামী লোক জঙ্গি হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যার মতো নিষ্ঠুর পথ বেছে নিয়েছে। ধর্মের কথা বলে বিপথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে দেশের তরুণ যুবকদের। জঙ্গিবাদ বা মানুষ হত্যা ইসলামের দীক্ষা নয়। এ নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যে কোনো মূল্যে এটি বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জঙ্গি হামলা চালানো হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে আরও শক্তিশালী ও কঠোর হতে হবে। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ব্যক্তিগত জীবনে একমাত্র কন্যাসন্তানের জনক। তার স্ত্রী আমিনা আহমদ এমপি বর্তমানে ন্যাপের হাল ধরেছেন। ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার থানার এলাহাবাদ গ্রামে অধ্যাপক মোজাফফরের জন্ম। তার পিতা স্কুলশিক্ষক আলহাজ কেয়াম উদ্দিন ভূঞা, মাতা আফজারুন্নেছা। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ হোসেনতলা স্কুল, জাফরগঞ্জ রাজ ইনস্টিটিউশন, দেবিদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চবিদ্যালয় ও ভিক্টোরিয়া কলেজে লেখাপড়া শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ এমএ ডিগ্রি পরে ইউনেস্কোর ডিপ্লোমা অর্জন করেন। বিভিন্ন সরকারি কলেজসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। রাজনীতিতে পদার্পণ ১৯৩৭ সালে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন ১৯৫৪ সালে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে দেবিদ্বার আসনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী মোজাফফর আহমদ মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে হারিয়ে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুবের সামরিক শাসনামলে তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয় এবং ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তিনি আত্মগোপন অবস্থায় আইয়ুবী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। তিনি ৮ বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৬৬ সালে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আবার ফিরে আসেন। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন। ১৯৬৯-এ আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং কারাবরণ করেন। তিনি আইয়ুব খান আহৃত রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিল বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামে মূল নেতৃত্বের একজন ছিলেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের নিজস্ব ১৯ হাজার মুক্তিযোদ্ধা গঠনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। তিনি ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে ন্যাপ-সিপিবি এবং প্রগতিশীল শক্তির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রাক্কালে কারারুদ্ধ হন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, অস্ট্রিয়া, ভারত, দক্ষিণ ইয়েমেন, লিবিয়া, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যসহ পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের বহু দেশ সফর করেন। অধ্যাপক মোজাফফর সমাজতন্ত্র কী এবং কেন প্রকৃত গণতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানার কথা মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্র ও কিছু বই এবং পুস্তিকা প্রকাশ করেছেন। ঘটনাবহুল বিশ্ব ব্যবস্থায় তার রাজনৈতিক দর্শন ও দূরদর্শিতা বাস্তবানুগও সময়োপযোগী বলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে তার গবেষণার বিষয় নতুন শতাব্দীতে নতুন সভ্যতা জন্ম নিচ্ছে। তিনি দেশপ্রেমিক কর্মী সৃষ্টির জন্য মদনপুরে উপমহাদেশে একমাত্র শিক্ষায়তন ‘সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। নির্বাচন কমিশন কেমন দেখতে চান এ বিষয়ে তিনি বলেন, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি কমিশন দেখতে চাই।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow