Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৫ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:১২
খাদিজার জীবন এখনো শঙ্কায়
পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তুললেন নেত্রীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক
খাদিজার জীবন এখনো শঙ্কায়

সোমবার সিলেটে ছাত্রলীগ নেতার চাপাতির আঘাতে গুরুতর আহত কলেজছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসের অবস্থা এখনো পরিবর্তন হয়নি। চিকিৎসকরা জানিয়েছে, তার আশঙ্কা এখনো কাটেনি। বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৫ শতাংশ। এ অবস্থায়ই গতকাল তার পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলেছেন ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেত্রী, যা নিয়ে  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে শুরু হয়েছে বিতর্কের। আহত হওয়ার পর ওই দিন মধ্যরাতে খাদিজাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অপারেশনের পর তাকে ৭২ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে (আইসিইউ) রেখেছেন চিকিৎসকরা। এই হিসেবে আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় শেষ হবে ৭২ ঘণ্টা। এর পরই তার অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নেবেন চিকিৎসকরা। খাদিজার অবস্থা সম্পর্কে গতকাল স্কয়ার হাসপাতালের মেডিসিন অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. মির্জা নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘৭২ ঘণ্টার আগে কিছু বলা সম্ভব নয়। তার অবস্থা সংকটাপন্ন হলেও আমরা এখনো আশাবাদী।’ চিকিৎসাধীন খাদিজার সার্বিক খোঁজখবর নিতে গতকাল হাসপাতালে যান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এদিকে খাদিজাকে নির্মমভাবে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করার ঘটনায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আসামি বদরুল আলম। জবানবন্দি গ্রহণের পর তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। অন্যদিকে বদরুলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন সিলেটের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। বদরুলের বিরুদ্ধে করা মামলা দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর, তার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্য কলেজে পরীক্ষাকেন্দ্র থাকলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষক প্রতিনিধি যাওয়া বাধ্যতামূলকসহ চার দফা দাবি জানিয়েছেন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা।

পাশে দাঁড়িয়ে নেত্রীদের সেলফি : ঠোঁটে লিপস্টিক ও গায়ে আইসিইউ গাউন। পেছনে নাকে-মুখে নল লাগানো অচেতন খাদিজা বেগম। খাদিজাকে দেখতে গিয়ে তোলা ছবি (সেলফি) গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে নিজের ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করেন সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিন। সঙ্গে যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য অপু উকিলসহ আরেকজন নারী। আইসিইউর মতো স্পর্শকাতর জায়গায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা খাদিজার পাশে সরকারদলীয় নারী নেত্রীদের এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে খাদিজার ওপর নৃশংসতায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, ভর্ত্সনা করেছেন।

‘বিচারহীনতার সংস্কৃতির ফসল’ : স্কয়ার হাসপাতালের চতুর্থ তলায় আইসিইউর ৪০৫ নম্বর কক্ষে গতকাল বেলা ১২টায় খাদিজাকে দেখতে যান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় নারীর ওপর সহিংসতার ঘটনাগুলোর বিচার হলে আজকের এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। খাদিজার ওপর হামলার ঘটনা বিচারহীনতার সংস্কৃতির ফসল। অপরাধী যে দলেরই হোক, দ্রুত তার বিচার করতে হবে। আর দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করতে সাত থেকে ১৫ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিতে হবে।

‘সরকার ছাড় দেবে না’ : জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের পর খাদিজাকে দেখতে যান মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ‘বিষয়টা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও নিষ্ঠুর। আমাদের সরকার কোনোভাবেই কোনো অন্যায়কারীকে ছাড় দেবে না। বিশেষ করে যে অন্যায়কারী প্রকাশ্য দিবালোকে সবার সামনে এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’

‘বদরুল প্রতারণা করেছে’ : এদিকে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী খাদিজার ওপর হামলাকারী বদরুল আলম সংগঠনের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলে দাবি করেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ। একই সঙ্গে বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে তারা। গতকাল শাবি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন শাবি শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থ। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমরা ছাত্রলীগের কমিটি দেওয়ার সময় বদরুল তার অনেক তথ্য গোপন করেছে। বদরুল যে একটা চাকরি করত এটা আমাদের জানা ছিল না। আমাদের সীমাবদ্ধতার কারণে এত কর্মীদের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা সম্ভব হয়নি।’ ঘটনার পরদিনই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বদরুলকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে। ঘটনা তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বদরুলের শাস্তির দাবিতে শাবির প্রধান ফটকে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী। সিলেট প্রতিনিধি জানান, গতকাল দুপুরে সিলেট ওসমানী হাসপাতাল থেকে বদরুলকে প্রথমে শাহপরান থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ডের পর বেলা পৌনে ৩টার দিকে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। সিলেটের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম উম্মে সরাবন তহুরা ১৬৪ ধারায় বদরুলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করেন। আদালতের বরাত দিয়ে সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) তৌহিদুল ইসলাম জানান, খাদিজা বেগমকে বদরুল চাপাতি দিয়ে কোপানোর দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। বিচারক তার বক্তব্য গ্রহণ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ সময় বদরুলকে কারাগারে নেওয়ার পথে আদালতপাড়ায় উপস্থিত জনতা ‘ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই’ স্লোগান দিতে থাকে। অন্যদিকে দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা।

আহত নার্গিসকে হাসপাতালে নিয়ে যান সাহসী ইমরান : সিলেটের এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে সরকারি মহিলা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসকে কোপানোর ঘটনাটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত অনেকেই যখন কোপানোর দৃশ্য দেখছিলেন বা ভিডিও করছিলেন তখনই ‘সাহসী’ এক যুবক এগিয়ে যান নার্গিসকে বাঁচাতে।

 ঘাতক বদরুল নার্গিসকে কুপিয়ে আহত করে ফেলে রেখে গেলে এগিয়ে যান ইমরান। সেখান থেকে নার্গিসকে তুলে দৌড়ে হাসপাতালে নিয়ে আসেন তিনি। নার্গিসের রক্তে ভরে যায় ইমরানের সারা শরীর। শরীরে রক্তমাখা ইমরানের সেই ছবি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল। অনেকেই তাকে ‘সাহসী’ খেতাব দিয়ে প্রশংসা করছেন। সেই সঙ্গে সমালোচনা করছেন যারা ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থেকে ভিডিও করেছেন অথচ নার্গিসকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি তাদের।

up-arrow