Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৬ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:৪৯
১২ রকমের আতঙ্কে বিএনপি
শফিউল আলম দোলন ও মাহমুদ আজহার
১২ রকমের আতঙ্কে বিএনপি

বার রকমের আতঙ্কে বিএনপি। আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ‘সাজা আতঙ্ক’ বিরাজ করছে।

দল ভাঙা ও নেতৃত্বশূন্যতার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এ নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে নানা কথা শোনা যায়। নিত্যনতুন মামলা ও জেল-জুলুমের ভয়ভীতি তো আছেই। নিজেদের মধ্যে সন্দেহ অবিশ্বাস এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি দলটি। অগোছালো দলও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। ঘোষিত জাতীয় নির্বাহী কমিটি নিয়েও দলের ভিতরে-বাইরে এখনো স্নায়ুযুদ্ধ চলমান। ঢাউস কমিটি হলেও প্রত্যাশিত পদ না পেয়ে দলের একাংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। দুর্বল দলকে নিয়ে সহসা আন্দোলনে যাওয়ার চিন্তাও করছেন না বিএনপিপ্রধান বেগম খালেদা জিয়া। তাই বিএনপির লক্ষ্য এখন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের চেয়ে সবার মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠন। দলীয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ভাইস চেয়ারম্যান পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, দল ভাঙার শঙ্কা শুধু তৃণমূলের নেতা-কর্মীদেরই নয়, খোদ চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যেও এ নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে। গত দেড় বছরে কিছু সিনিয়র নেতার বক্তব্য, গোপনে সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে কারও কারও যোগাযোগ, গা বাঁচিয়ে চলার মতো নেতাদেরও খোঁজখবর রাখেন বেগম জিয়া। নির্বাহী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে অতীতে আন্দোলন সংগ্রাম ও দলের দুঃসময়ের বিষয়টি সামনে রাখেন। একইভাবে সামনে অঙ্গ সংগঠন ও মহানগর বিএনপির কমিটির ক্ষেত্রেও সেদিকে দৃষ্টি রাখছেন তিনি। তবে বাধ্য হয়ে অনেক নেতাকেই কমিটিতে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। না দিলেও সমস্যা হতে পারে, সেই শঙ্কাও ছিল। তবে সামনে দলের কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করলে বিএনপি প্রধান ক্ষমা করলেও নেতা-কর্মীরা করবেন না।

আইন পেশায় যুক্ত বিএনপির সিনিয়র নেতারা জানান, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির দুই মামলা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট্র ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। মামলার গতি-প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে, দুই-তিন মাসের মধ্যেই রায় হয়ে যাবে। মামলা দুটিতে নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি আইনজীবী নেতারাও ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। গতকালও এ দুই মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করা হয়েছে। এক সপ্তাহ পরপরই মামলার দিন ধার্য করা হচ্ছে। সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রীর মামলায় এ ধরনের তত্পরতা ‘নজিরবিহীন’। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগে মামলা হয়েছে, সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নাইকো দুর্নীতির একই অভিযোগে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে, অথচ বিএনপি চেয়ারপারসনের মামলা চলছে। তারেক রহমানের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মূল আসামি মুফতি হান্নানও ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে তারেক রহমানের নাম উল্লেখ করেননি। সুতরাং প্রশ্নবিদ্ধ অভিযোগে এসব মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেকের সাজা দেওয়ার চিন্তা করলে আইনের শাসন হুমকির মুখে পড়বে। ’ বিএনপি চেয়ারপারসনের অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া গতকাল সন্ধ্যায় বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ‘জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা দ্রুত শেষ করার প্রক্রিয়া চলছে। এখন বাদী পক্ষের সাক্ষী চলছে। যেভাবে চলছে তাতে এক-দেড় মাস লাগতে পারে। এরপর যুক্তিতর্ক। এরপরই রায়। আমরা ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছি। কিন্তু পাব কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। ’

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্র জানায়, এরই মধ্যে ২৪ হাজার মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। আরও পাঁচ-সাত হাজার মামলা নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। এসব মামলায় প্রায় ৫ লাখ নেতা-কর্মীই আসামি। এর মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধেই ৩৩ মামলা। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মানহানিসহ একশরও ওপরে মামলা রয়েছে। দলের মহাসচিব ৮২ মামলার আসামি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সম্প্রতি প্রয়াত সদস্য আ স ম হান্নান শাহের বিরুদ্ধেও ৩৩টি মামলা ছিল। স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, তরিকুল ইসলাম, এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সালাউদ্দিন আহমদসহ সিনিয়র নেতাদের কারও কারও বিরুদ্ধে মামলা এক ডজন থেকে শুরু করে অর্ধশত ছাড়িয়েছে।

এরই মধ্যে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এক মামলায় সাত বছরের ‘সাজা’ দেওয়া হয়েছে। আরেক ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকাসহ কয়েক নেতাকেও সাজা দেওয়া হয়েছে। দলের মহাসচিবসহ নেতা-কর্মীদের আশঙ্কা, খালেদা জিয়াসহ সিনিয়র সব নেতাকে সাজা দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য করে সরকার ২০১৮ সালে একটি নির্বাচন দিতে পারে। এ সম্পর্কে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করতে এবং আগামী নির্বাচনে নেতাদের অযোগ্য ঘোষণার উদ্দেশ্যে এসব মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে উদ্দেশ্যমূলক রায় দেওয়া হতে পারে। তবে আদালতে ন্যায়বিচার হলে এসব মামলার একটিও ধোপে টিকবে না। ’

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সরকার বিএনপিকে ধ্বংস করার জন্য যা কিছু করা দরকার, তার সবকিছুই করছে। কিন্তু এসব নিয়ে আমরা মোটেও চিন্তিত নই। কারণ জেল খাটার অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। ম্যাডামেরও আছে। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও তিনি জেল খেটেছেন। কাজেই আমাদের আর জেলের ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। আমরাও জেলে যেতে প্রস্তুত। তবে গণতন্ত্রের জন্য তা কতটুকু মঙ্গল বয়ে আনবে, তাও দেশবাসী দেখবে। ’ স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমাদের মামলা-হামলা আর জেলের ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। সাজা দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করবে করুক। তারও বোধহয় খুব বেশি প্রয়োজন হবে না। কারণ, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ছাড়া এই সরকারের অধীনে আমরা এমনিতেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাব না। ’

শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক মামলায় খালেদার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন ৮ নভেম্বর : মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়ায় বেগম খালেদা জিয়া ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে মানহানি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৮ নভেম্বর দিন ধার্য করেছে আদালত। গতকাল এ মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ছিল। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এ দিন প্রতিবেদন দাখিল না করায় ঢাকা মহানগর হাকিম সত্যপদ শিকদার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নতুন এ দিন ঠিক করেন। মামলার বিবরণীতে জানা যায়, ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, ‘আজকে বলা হয় এত লাখ শহীদ হয়েছে, এটা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে। ’

এই পাতার আরো খবর
up-arrow