Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৮ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৩৩
সচিবালয়ে আবারও তদবির বাণিজ্য জমজমাট
চাকরির তদবির থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য টিআর, কাবিখা জিআরের বরাদ্দ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ
নিজস্ব প্রতিবেদক

আবারও  তদবিরকারীরা তত্পর হয়ে উঠেছে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ে। মন্ত্রী, সচিবের দফতর থেকে শুরু করে অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ করছেন তদবিরকারীরা। চাকরির তদবির থেকে শুরু করে বদলি, দরপত্র, বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারের বিভিন্ন দফতরে কাজ পাইয়ে দেওয়া, টিআর, কাবিখা, জিআর-এর বরাদ্দ বণ্টন সবকিছুতেই তদবিরকারীদের দৌরাত্ম্য। সচিবালয়ে দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার সীমিত করতে কর্মকর্তাদের দেওয়া ‘দর্শনার্থী পাস’ এর সংখ্যা কমিয়ে আনা হলেও তদবিরকারীদের প্রবেশ কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না। বিভিন্ন উপায়ে তদবিরকারীরা সপ্তাহের সোমবার বাদে বাকি চার  দিন সচিবালয়ে প্রবেশ করছেন। এতে করে তদবিরকারীদের চাপে অনেক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারছেন না। সচিবালয়ে তদবিরকারীদের চাপ এতটাই বেড়ে গেছে যে, সম্প্রতি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অফিস টাইমের পর কর্মকর্তাদের সচিবালয়ে উপস্থিতির ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যদিও নিরাপত্তার বিষয়টি উল্লেখ করে ওই আদেশ জারি করা হয়। গত কয়েক দিন সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, স্বরাষ্ট্র, অর্থ, ভূমি, আইন, পরিবেশ ও বন, পানিসম্পদ, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদসহ প্রায় সবকটি মন্ত্রণালয় তদবিরকারীদের উপস্থিতি দেখা গেছে। তদবিরকারীদের একটা বড় অংশ নারী। তদবিরকারীরা নিজেদের সরকারি দলের পরিচয় দিয়ে মন্ত্রী, সচিব ও আমলাদের কাছে গিয়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তদবির করে থাকেন। বিশেষ করে ভূমি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, খাদ্য, স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তদবিরকারীদের ভিড় সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। গত মাসের শেষ দিকে পুলিশে কনস্টেবল পদে সারা দেশে লোক নিয়োগ করা হয়। এ নিয়োগে নিজেদের লোকজনকে চাকরি পাইয়ে দিয়ে তদবিরকারীরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-সচিব তো বটেই, মন্ত্রণালয়ের অনেক অতিরিক্ত ও যুগ্ম সচিবের কাছেও পর্যন্ত তদবির করেছেন। এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাইরে অন্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের দিয়েও তদবির করিয়েছেন অনেকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ নিয়োগে তদবিরকারীদের চাপে অনেক কর্মকর্তার স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়েছে। সূত্র জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে টিআর ও কাবিখার বরাদ্দ পাইয়ে দিতে তদবিরকারীরা সবচেয়ে বেশি তত্পর। ওই মন্ত্রণালয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রও রয়েছে, যারা টিআর ও কাবিখার জন্য কাজ করে থাকে। ওই চক্রের সঙ্গে তদবিরকারীদের সখ্য রয়েছে। অভিযোগ আছে, তদবিরকারীরা ভুয়া ডিও লেটারের মাধ্যমে বরাদ্দ পেতে ওই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একসঙ্গে কাজ করে। এর বাইরে প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়েই তদবিরকারীরা বিভিন্ন কাজ নিয়ে নিয়মিতই হাজির হন মন্ত্রী, সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে। সূত্র জানায়, তদবিরকারীরা মূলত কমিশনের বিনিময়ে বা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিভিন্নজনের পক্ষ নিয়ে তদবির করতে মন্ত্রণালয়ে ভিড় করে। সচিবালয়ে নিয়মিত দায়িত্ব পালনকারী একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সচিবালয়ে তদবিরকারীদের উপস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি। তদবিরকারীদের একটা বড় অংশই আসে দুপুরের পর। থাকে শেষ সময় পর্যন্ত। এমনকি অনেকে অফিস সময় শেষ হওয়ার পরও বিভিন্ন কর্মকর্তার দফতরে বসে থাকেন তদবিরের জন্য। অফিস সময় শেষ হওয়ার পর অনেক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা নিজ দফতরে অবস্থান করায় গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনদেরও সচিবালয়ে অবস্থান করতে হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরগুলো বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত। এ বিষয়টি গোয়েন্দাদের নজরে আসার পরপরই একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গোপন প্রতিবেদনও দিয়েছে। সূত্র জানায়, গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত মাসের ২৪ সেপ্টেম্বর একটি আদেশ জারি করে নির্দিষ্ট সময়ের পর দফতরে উপস্থিতির বিষয়ে। মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা শাখা-২ থেকে জারি করা ওই আদেশে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়া অফিস সময়ের পর সচিবালয়ে কেউই অবস্থান করতে পারবেন না। তবে পূর্বানুমতি নিয়ে অফিস সময়ের পর সচিবালয়ে অবস্থান করা যাবে বলে নিষেধাজ্ঞায় উল্লেখ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. সাহিদ আলী স্বাক্ষরিত এই আদেশটি সব মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বিভাগের প্রধানদের কাছে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সচিবালয় প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় জরুরি প্রয়োজনে অফিস সময়ের পরও কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিসে কাজ করেন। আবার কিছুসংখ্যক কর্মচারী বিনা অনুমতিতে সচিবালয়ে রাত্রিকালীন অবস্থান করে থাকেন যা কাম্য নয়। বাংলাদেশ সচিবালয় সংরক্ষিত ও স্পর্শকাতর এলাকা বিধায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া পূর্বানুমতি ব্যতীত রাত্রিকালীন কেউ সচিবালয়ে অবস্থান করতে পারবেন না। পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনো কর্মচারী রাত্রিকালীন যাতে সচিবালয়ে অবস্থান না করেন সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তাতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কোনো কর্মচারী অফিস সময়ের পর যেন সচিবালয়ে অবস্থান না করেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। তবে কোনো কর্মচারীর রাত্রিকালে সচিবালয়ে অবস্থান করা অপরিহার্য হলে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা এবং দীর্ঘকাল অবস্থানের প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।

এর একদিন পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ওই আদেশ সম্পর্কে বলেন, আদেশটি একটু সংশোধন করা হয়েছে। অফিস সময়ের পর সচিবালয়ে কারও অবস্থান না করার নির্দেশনা মন্ত্রী ও সচিবদের জন?্য প্রযোজ?্য হবে না। তবে মন্ত্রী-সচিব ছাড়া আর কারও যদি ৫টার পর থাকার প্রয়োজন হয়, তাহলে নিরাপত্তাবাহিনীকে জানিয়ে কাজ করতে হবে।

সূত্র জানায়, মূলত তদবিরকারীদের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর এবং নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই আদেশটি জারি করে।

up-arrow