Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৯ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৪৭
জঙ্গি নেটওয়ার্ক তছনছ
৯ অভিযানে নিহত ৩৪
মির্জা মেহেদী তমাল

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একের পর এক অভিযানে তছনছ হয়ে গেছে জঙ্গি নেটওয়ার্ক। দেশের যেখানেই জঙ্গি আস্তানার খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই হানা দিচ্ছে পুলিশ ও র্যাব। ধ্বংস করা হচ্ছে জঙ্গিদের আস্তানা ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক। সিরিজ জঙ্গি হামলার মাস্টারমাইন্ড, অস্ত্রদাতা, অর্থদাতা, প্রশিক্ষণ-প্রশিক্ষক ও জঙ্গিদের আশ্রয়দাতারাও এখন চিহ্নিত। বিগত তিন মাসে ৯টি আস্তানায় পুলিশ ও র্যাবের সাঁড়াশি অভিযানে নিহত হয়েছে ৩৪ জঙ্গি। বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ানো এই জঙ্গি প্রত্যেকেই উগ্রপন্থি সংগঠন নিউ জেএমবির ‘সুইসাইড স্কোয়াড’-এর সদস্য। সর্বশেষ গত শনিবার গাজীপুরে ২টি, টাঙ্গাইল এবং আশুলিয়ায় ১টি করে মোট চারটি জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এক দিনেই এই চার আস্তানায় নিহত হয়েছে ১২ জঙ্গি। এদের মধ্যে একজন জঙ্গিদের অর্থদাতাও আছে। সরকারি সূত্রগুলো বলছে, নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত জঙ্গিবিরোধী এমন অভিযান চলতেই থাকবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে জঙ্গি নিধনের এমন সফলতা বিগত বছরগুলোতে আসেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গিদের মূলোৎপাটনের খুব কাছাকাছি রয়েছে। জঙ্গি নেটওয়ার্কের অনেক তথ্যই এখন গোয়েন্দাদের হাতে। আর কয়েকজন মাস্টারমাইন্ডকে ধরতে পারলেই জঙ্গিদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা যাবে। গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেছেন, সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে জঙ্গি নেটওয়ার্ক তছনছ করা সম্ভব হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবারও বলেছেন, ধর্মের নামে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, জঙ্গিবাদের কোনো স্থান আমাদের দেশে নেই। জঙ্গিদের নিশ্চিহ্ন করা হবে। পুলিশের আইজি এ কে এম শহীদুল হক বলেছেন, অচিরেই জঙ্গিমুক্ত হবে বাংলাদেশ। ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, একে একে জঙ্গিদের সমূলে উৎপাটন করে চলেছি। র্যাবের প্রধান বেনজীর আহমেদ বগুড়ায় বলেছেন, ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি খুঁড়ে জঙ্গিদের বের করে আনা হবে। আর এসব বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটে জঙ্গি দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানগুলোতে। পুলিশ ও গোয়েন্দারা বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ঘাপটি মারা পলাতক জঙ্গিরা দিশাহারা হয়ে পড়েছে। তারা বার বার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করছে। অনেকে দেশ ত্যাগের চেষ্টা করছে বলে খবর রয়েছে। কিন্তু সীমান্ত এলাকাতেও রেড অ্যালার্ট জারি করা আছে। পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) হুমায়ুন কবীর বলেন, পুলিশ জঙ্গি দমনে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। একের পর এক অভিযানে তাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তছনছ করে দিয়েছে পুলিশ। তিনি বলেন, পলাতক জঙ্গিদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে পুলিশি অভিযান অব্যাহত আছে। তাদেরকে ধরা পড়তেই হবে। তারা ধরা পড়বেই। ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, পহেলা জুলাই গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর পুলিশের জঙ্গি দমন ইউনিটের সদস্যরা কিছুটা হতাশ হন। এত বড় ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম নিয়েও দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। তবে এর ২৫ দিনের মাথায় কল্যাণপুর ও এরপর নারায়ণগঞ্জের জঙ্গি আস্তানায় সফল অভিযানের পর তাদের মনোবল যেমন চাঙ্গা হয়েছে, তেমনি গুলশান হামলাসহ দেশের বিভিন্ন জঙ্গি হামলা তদন্তে নানা সূত্রও পাওয়া যাচ্ছে। গোয়েন্দারা জঙ্গি নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়েছে।

নেটওয়ার্ক তছনছ : নব্য জেএমবির তত্পরতা শুরু হয়েছিল গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার মধ্য দিয়ে। সেনা কমান্ডো অভিযানে সেখানে তাদের পাঁচ সদস্য নিহত হয়। এরপর একের পর এক অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরাশায়ী হয়েছে নব্য জেএমবির সদস্যরা। সর্বশেষ গত শনিবার গাজীপুরে পৃথক দুই অভিযানে ৯ জঙ্গি, টাঙ্গাইলে দুই জঙ্গি এবং আশুলিয়ায় নিহত হয় জঙ্গিদের আশ্রয়দাতা। তিন মাসের ৯ অভিযানে মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরীসহ  নব্য জেএমবির ৩৪ নেতা-কর্মী নিহত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, নব্য জেএমবির অনেক নেতা-কর্মী নিহত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের পয়লা জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার পর দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করে নব্য জেএমবির পাঁচজনের একটি দল। জঙ্গি হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ মারা যায় দেশি-বিদেশি ২২ নাগরিক। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’ চালায় সেনা কমান্ডোর একটি দল। এতে নিহত হয় পাঁচ হামলাকারী। তারা হলো রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সাবিহ মোবাশ্বের, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, গুলশানের ঘটনার সাত দিনের মাথায় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদের দিন পুলিশের ওপর হামলা চালায় নব্য জেএমবির একটি গ্রুপ। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় আবীর রহমান নামে নব্য জেএমবির এক সদস্য। আহত অবস্থায় গ্রেফতার হয় শফিউল নামে আরেক জঙ্গি। পরে ৫ আগস্ট র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে শফিউল ও তার সহযোগী আবু মোকাতিল নিহত হয়। সূত্র জানায়, গত ২৬ জুলাই কল্যাণপুরের একটি জঙ্গি আস্তানার সংবাদ পায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। সেখানে চলে ‘অপারেশন স্টর্ম’। এতে নিহত হয় ৯ জঙ্গি। যাদের মধ্যে ৮ জনের পরিচয় মিললেও একজনের পরিচয় জানা যায়নি। পরিচয় পাওয়া ৮ জন হলো— দিনাজপুরের আব্দুল্লাহ, টাঙ্গাইলের আবু হাকিম নাইম, ঢাকার ধানমণ্ডির তাজ-উল-হক রাশিক, ঢাকার গুলশানের আকিফুজ্জামান খান, ঢাকার ভাটারার সেজাদ রউফ অর্ক, সাতক্ষীরার মতিউর রহমান, রংপুরের রায়হান কবির ওরফে তারেক এবং নোয়াখালীর জোবায়ের হোসেন। গত ২৭ আগস্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয় নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায়। কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে নিহত হয় নব্য জেএমবির মাস্টারমাইন্ড বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম আহম্মেদ চৌধুরী। এ সময় তামিমের সঙ্গে মারা যায় তার আরও দুই সহযোগী। তাদের একজন ধানমণ্ডির তওসিফ হোসেন ও যশোরের ফজলে রাব্বী। গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট অভিযান চালায় মিরপুরের রূপনগরে। সেখানে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত হয় জাহিদুল ইসলাম নামে অবসরপ্রাপ্ত এক মেজর। এর এক সপ্তাহ পর ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরের একটি বাড়িতে অভিযান চালায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। সেখানে নব্য জেএমবির অন্যতম শীর্ষ নেতা ও আশ্রয়দাতা তানভীর কাদেরী নিহত হয়। সেখান থেকে আটক করা হয় তিন নারী জঙ্গি ও তানভীরের ১৪ বছর বয়সী ছেলেকে। সর্বশেষ গত শনিবার ছিল জঙ্গি দমনের একটি সফল দিন। পুলিশ ও র্যাব গাজীপুর, আশুলিয়া ও টাঙ্গাইলের চার আস্তানায় অভিযান চালায়। সেখানে নিহত হয় ১২ জঙ্গি। এদের মধ্যে আশুলিয়ায় নিহত হয়েছে জঙ্গিদের এক আশ্রয়দাতা।

up-arrow