Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১০ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:২৬
সাঁড়াশি অভিযানে দুদক
সাত মাসে গ্রেফতার তিন শতাধিক । ব্যবসায়ী ১৫০, ব্যাংক কর্মকর্তা ৭৩, জনপ্রতিনিধি ২৬, চিকিৎসক ২১ ভূমি কর্মকর্তা ১২, সরকারি কর্মকর্তা ১৬, রাজউকের ৭, ওয়াসার ৪, সড়ক-জনপথের ৪ কর্মকর্তা
গোলাম রাব্বানী, মোস্তফা কাজল ও আলী রিয়াজ
সাঁড়াশি অভিযানে দুদক

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযানে সাত মাসে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দফতরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, জনপ্রতিনিধিসহ ৩১৯ জনকে গ্রেফতার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক। দুদকের অভিযানে গত সাত মাসেই গ্রেফতার হয়েছেন শতাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা ও ঋণ জালিয়াতির হোতা।

ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায় থেকে ক্যাশ অফিসার পর্যন্ত এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। গ্রেফতারের তালিকায় শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক নয়, বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারাও রয়েছেন। এ তালিকায় আছেন আরও অনেকে। দুর্নীতি মামলার ভয়ে অনেক কর্মকর্তা গাঢাকা দিয়েছেন। ভুয়া বিল ভাউচার, গ্রাহকের টাকা জমা না দেওয়া, এফডিআরের অর্থ, ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে এসব অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তারা। হঠাৎ করে ব্যাংক খাতে দুদকের কার্যক্রমে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কে কখন গ্রেফতার হবেন এই ভয়ে আছেন অনেকে। জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দুদক সঠিক কাজটি সঠিক সময়ে করবে। দুদকের সব মামলার আসামিদের পর্যায়ক্রমে আইনের আওতায় আনা হবে। এ ছাড়া যারা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা বা ঋণ নিয়েছেন, তাদের অবশ্যই ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে হবে। আর ক্ষমতা অপব্যবহারের মাধ্যমে যারা ঋণ দিয়েছেন, তাদেরও টাকা আদায় করে দিতে হবে।

দুদকের অভিযানে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ী ১৫০, ব্যাংক কর্মকর্তা ৭৩, জনপ্রতিনিধি ২৬, চিকিৎসক ২১, ভূমি কর্মকর্তা ১২, সরকারি কর্মকর্তা ১৬। আরও রয়েছেন রাজউক কর্মকর্তা-কর্মচারী ৭, ওয়াসার কর্মকর্তা ৪, সড়ক ও জনপথের কর্মকর্তা ৪ এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ৩ জন। এ ছাড়াও সামনের এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই গ্রেফতার করতে প্রস্তুত করা হচ্ছে আরও দুই শতাধিক ব্যক্তির তালিকা। ইতিমধ্যেই দেশত্যাগে  নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে ৫২ ব্যাংকার, ১৯ ব্যবসায়ীসহ ১৮৯ ব্যক্তির ওপর। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এ অভিযান থেকে বাদ যাবেন না ব্যাংক, বীমাসহ সরকারি-বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত কোনো প্রতিষ্ঠানেরই দুর্নীতিবাজরা। তবে সবার আগে বর্তমানে দায়ের থাকা দুদকের মামলাগুলোর আসামিদের মধ্যে যারা জামিন না নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা আসবেন গ্রেফতারের আওতায়। সেই সঙ্গে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে এতদিন জমে থাকা শত শত অনিষ্পন্ন শাখার মামলা।

দুদক সূত্রের তথ্যানুসারে, চলতি বছরের ২৭ মার্চ রাতভর অভিযান চালিয়ে আলোচিত বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির একাধিক আসামিকে গ্রেফতারের মধ্যেই শুরু হয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান। এর পর থেকে প্রতিদিন ও প্রতি রাতেই চলছে অভিযান। আগামী দুই মাসের মধ্যে গ্রেফতারের আওতায় আনার লক্ষ্যে দুদকের দুই শতাধিক এজাহারভুক্ত আসামির তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এ তালিকায় আছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিনিয়র কর্মকর্তা, ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎকারী ব্যবসায়ী, সেবা সংস্থার প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, এলজিইডি, রাজউকের প্রকৌশলী, বিদ্যুৎ, তিতাস, ওয়াসাসহ সেবা খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা, অর্থ আত্মসাৎকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অন্যরা। এর মধ্যে শুধু বেসিক ব্যাংকেরই ৫৬টি মামলায় ১৪২ জন আসামি আছেন তালিকায়। ৮২ জন ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের মালিক। ১১ জন সার্ভেয়ার। ইতিমধ্যেই তিনজন ঋণগ্রহীতা ও বেসিক ব্যাংকের পাঁচ কর্মকর্তা গ্রেফতার হয়েছেন। বাকি ১৪২ জনকে গ্রেফতারের লক্ষ্যে তাদের গতিবিধি কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এজাহারভুক্ত কোনো আসামি যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন সেজন্য ৫৬টি মামলার আসামিদের নাম-ঠিকানা ও মামলার তথ্য উল্লেখ করে ইমিগ্রেশনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন দুদকের ছয় তদন্ত কর্মকর্তা। আত্মসাৎকারী তালিকায় চিকিৎসকদের মধ্যে রয়েছেন বরিশালের সাবেক সিভিল সার্জন ডা. আফতাব উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে ৯১ লাখ ৬৪ হাজার ৯৬ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেডিকেল অফিসার ডা. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ৪ কোটি ১৪ লাখ ৭৭ হাজার ৭৯০ টাকা জালিয়াতি ও আত্মসাতের অভিযোগে রাজউকের প্রকল্প পরিচালক এ কে এম শফিকুর রহমানকে ১৩ এপ্রিল গ্রেফতার করে দুদক। এ ঘটনার চার দিন পর ১৭ এপ্রিল রাজউকের হিসাবরক্ষক তাহমিদুল হককে ৯৮ লাখ ১৫ হাজার ৪৭ টাকার অবৈধ লেনদেন করার অভিযোগে গ্রেফতার করে দুদক। এ ছাড়া ১২ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১৯ এপ্রিল ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রোকনুজ্জামানকে গ্রেফতার করে দুদক। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী মো. মঈদুল ইসলামকে ১ লাখ ২ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের অবসরপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. রফিকুল ইসলামকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০ এপ্রিল গ্রেফতার করে দুদক। ভুয়া দলিল তৈরির অপরাধে ২৫ মে ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার রুহিতপুর ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. মফিজুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়া রাজধানীর দয়াগঞ্জ সুইপার কলোনির নির্মাণকাজে অনিয়ম ও নকশাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের কারণে ১৩ জুন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মেজবাউল করিমকে গ্রেফতার করে দুদক। আর্থিক লাভবান হওয়ার এবং কারচুপির অভিযোগে পুলিশের টাঙ্গাইল জেলার রেশনিং শাখার ওসি মো. আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ১৩ আগস্ট গ্রেফতার করে দুদক। নগদ ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে ১৭ আগস্ট চট্টগ্রামের বিভাগীয় ফোনস অফিসের ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার প্রবীর দাসকে গ্রেফতার করে দুদক। আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির মামলায় ২১ আগস্ট গ্রেফতার করা হয় ঝিনাইদহের সাব-রেজিস্ট্রার মো. সহিদুর রহমানকে। একই অভিযোগে পরদিন গ্রেফতার করা হয় নোয়াখালী সদর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার আবদুর রশিদ মণ্ডলকে। ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুল মালেককে গ্রেফতার করে দুদক। স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ৫ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয় বাউফল উপজেলা চেয়ারম্যান মজিবর রহমানকে। সরকারি ওষুধ খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগে ২৪ সেপ্টেম্বর দুদক গ্রেফতার করে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. মো. নাজমুল হক সরকারকে। জানতে চাইলে দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তদন্ত কার্যক্রমে দুদক কর্মকর্তারা স্বাধীন। তদন্ত প্রক্রিয়ায় এজাহারভুক্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার প্রয়োজন মনে করলে তদন্ত কর্মকর্তারা তাকে গ্রেফতার করবেন। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি জিরো টলারেন্স।

দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, গতকাল পর্যন্ত টানা সাড়ে ছয় মাসের পৃথক অভিযানে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ৩১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া শাখা রূপালী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মোর্শেদ আলম, ময়মনসিংহের রামভদ্রপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. রোকনুজ্জামান, ধোবাইড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম, ওই জেলার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মঈদুল ইসলাম, জুনিয়র হিসাব সহকারী হোসনে আরা; কুমিল্লার বাসিন্দা মনিরুল হক, রাজউকের সুপারভাইজার ছফির উদ্দিন, যশোর হাউজিং এস্টেটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোক্তার আলী, রাজধানীর আরামবাগের মেসার্স হ্যান্ডি ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার খালেদ সাইফুল, সেগুনবাগিচায় সিজিএ সমবায় ঋণদান সমিতির ক্যাশিয়ার আবদুল কাদের, অগ্রণী কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স মালটিপারপাসের সহ-সভাপতি এম এ সাত্তার, জামালপুর গ্রামীণ ব্যাংকের ছনকান্দা শাখার সাবেক সিনিয়র কেন্দ্র ব্যবস্থাপক আবদুল ওহাব ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ এলাকার পাইকারি ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ী নাঈসুল ইসলাম।

এর আগে ছয় দফায় ৪১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার পৃথক দুর্নীতি মামলায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, বগুড়া ও দিনাজপুর থেকে ১৩ জনকে গ্রেফতার করেছে দুদক। এর আগের দিন গ্রেফতার করা হয় ৮ জন। এরা হলেন শিক্ষা অধিদফতরের সিস্টেম অ্যানালিস্ট আবুল ফজল, ঢাকা সদর রেকর্ডরুমের সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার ভবতোষ ভৌমিক, হবিগঞ্জ হযরত শাহজালাল (রহ.) সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার হারুনুর রশিদ, সোনালী ব্যাংকের ময়মনসিংহের ভালুকা শাখার সাবেক ম্যানেজার আসাদুজ্জামান, একই শাখার কর্মকর্তা একরামুল হক খান, টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা প্রকল্পের সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম, বগুড়ার কাহালুর বেলঘড়িয়া হাইস্কুল ম্যানেজিং কমিটির বিদ্যোৎসাহী সদস্য আল আমিন এবং দিনাজপুরের দাউদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় এসব আসামি পলাতক ছিলেন। দুদক সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে যাচাই-বাছাই শেষে ৪৭৮টি মামলা করে দুদক। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি রয়েছেন ৮০০-এর মতো। এর বাইরেও নতুন-পুরাতন এবং আদালত, থানা ও বিভিন্ন দফতর থেকে তদন্তের জন্য আসা বিভিন্ন ধারায় দায়ের হওয়া প্রায় ২০ হাজার মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুদকের দায়ের করা নিজস্ব মামলা ৩ হাজারের মতো। এসব মামলায় আসামি কয়েক হাজার। যাদের অনেকেই জামিন না নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং তদন্ত প্রক্রিয়াকে নানাভাবে প্রভাবিত করছেন। এ বছরের জানুয়ারি থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত বেসিক ব্যাংক মামলায় ডিএমডি ফজলুস সোবহান, মো. সেলিম, জিএম শিপার আহমেদ, জিএম জয়নাল আবেদীন চৌধুরী, ইকরামুল বারীকে গ্রেফতার করা হয়। ঋণগ্রহীতা হিসেবে ২৮ মার্চ গ্রেফতার করা হয় এমারেল্ড অটো ব্রিকফিল্ডসহ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মালিক সৈয়দ হাসিবুল গনি গালিব, মেসার্স ফারসি ইন্টারন্যাশনালের মালিক ফয়জুন্নবী চৌধুরী, এশিয়ান শিপিং বিডির মালিক আকবর হোসেনকে। জালিয়াতির মামলায় রাজউকের ওয়ার্ক-চার্জড কর্মচারী এম এ কে খন্দকার (আজাদ), বর্তমানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সচিব আবুল বশর, রাজউকের ইমারত পরিদর্শক রুহুল আমিন খাদেমকে এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে দুদকের একটি সূত্র জানায়, এসব আসামির কেউ কেউ ইতিমধ্যেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে রেখেছেন।

আর্থিক খাতে কঠোর দুদক : সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় জনতা ব্যাংকের দুই উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) গ্রেফতার হন। বিসমিল্লাহ গ্রুপের যে মামলায় দুই ডিজিএম গ্রেফতার হয়েছেন সেই একই মামলার অন্যতম আসামি মো. আবদুস সালাম আজাদ বর্তমানে জনতা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে এসব কর্মকর্তা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ব্যাংকের বিভিন্ন ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে অর্থ হাতিয়েছেন। কৃষি ব্যাংকের মাগুরা শাখার মুখ্য কর্মকর্তা ভুয়া শস্যঋণ দেখিয়ে ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন, কমার্স ব্যাংকের বংশাল শাখার চার কর্মকর্তা মিলে ভুয়া এলসি তৈরি করে ১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। গ্রেফতার ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকর্তা পৃথকভাবে প্রায় শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর মধ্যে শুধু ব্যাংক এশিয়ার চট্টগ্রাম ভাটিয়ারী শাখার ম্যানেজার মো. মিজানুর রহমান শাহ আমানত মার্টিন আয়রনের নামে ১৩টি এলসি ঋণ বাবদ ২৬ কোটি ৩৪ লাখ ৭৮ হাজার, ওভার ড্রাফট হিসেবে ৩ কোটি ৯৯ লাখ ৮১ হাজার ১৪৭ এবং আল মদিনা এন্টারপ্রাইজের নামে বৈদেশিক এলসি ঋণ বাবদ ৪৪ কোটি ৪৮ লাখ ৬৭ হাজার ২৪৭— এই মোট ৭৪ কোটি ৮৩ লাখ ২৬ হাজার ৩৯৪ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সোনালী ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ অফিসার মো. মোশারেফ হোসেন ক্ষমতার অপব্যবহার করে রপ্তানির বিপরীতে নগদ সহায়তা খাতে ব্যাংক থেকে ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের অফিসসহায়ক গ্রাহকের চেক জালিয়াতি করে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের গ্রামীণ ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ও সুভাষ সিংহ এক গ্রাহকের স্বাক্ষর জাল করে ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। রাকাবের দিনাজপুর ভোমরাদহ শাখার কর্মকর্তা আরাফাত জামান ও শাহজাহান আলী গ্রাহকদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। অগ্রণী ব্যাংকের বংশাল শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার পে অর্ডার জালিয়াতি করে ২৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। এমনিভাবেই জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এসব দুর্নীতিবাজ। চলতি বছরের মার্চ থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন বেসিক ব্যাংকের প্রধান শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক জয়নাল আবেদীন চৌধুরী, ইকরামুল বারী; সোনালী ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ করপোরেট শাখার সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার মো. নুরুজ্জামান, ব্যাংকের ভালুকা শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মো. একরামুল হক খান ও সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আসাদুজ্জামান; রূপালী ব্যাংকের ঢাকার নবাবগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক ফরিদ আহম্মদ; অগ্রণী ব্যাংকের বংশাল শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার মো. ফারুক আহমেদ; বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চাকরিচ্যুত অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ইফতেখার হোসেন; রূপালী ব্যাংকের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রিন্সিপাল অফিসার নীল কমল মিত্র; রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ফকিরের তকেয়া শাখা ম্যানেজার মো. হাসান আলী; জনতা ব্যাংকের উত্তরখান শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মো. মোজাহার আলী; গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র কেন্দ্র ব্যবস্থাপক আবদুল ওহাব ও সোনালী ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মো. আবদুস সামাদ; কৃষি ব্যাংকের কুমিল্লা শাখার পরিদর্শক আবু ছালেহ, সুন্দর আলী; সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখার এক্সিকিউটিভ অফিসার মো. মোশারেফ হোসেন, দেবিদ্বার শাখার এক্সিকিউটিভ অফিসার জাকির হোসেন; রূপালী ব্যাংকের ফুলবাড়িয়া শাখার মো. মোর্শেদ আলম।

বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সাবেক এভিপি ও বর্তমানে সিলেট শাখার ম্যানেজার মো. হোসেন আহমদ; শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের দোহারের জয়পাড়া শাখার ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান; ইউসিবিএলের নোয়াখালীর মাইজদী কোর্ট শাখার সিনিয়র অফিসার কাজী মাহফুজুর রহমান; ব্যাংক এশিয়ার চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মো. মিজানুর রহমান; এবি ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি ও হেড অব ক্রেডিট, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব ও অডিট) বদরুল হক খান; আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. শওকত ইসলাম ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সাবেক অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. ইনামুল হক। গত এক সপ্তাহে ১৫ জনের বেশি কর্মকর্তা গ্রেফতার হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন পূবালী ব্যাংক বগুড়া শহরের সাতমাথা শাখার সাবেক কর্মকর্তা শহিদুজ্জামান চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম; সোনালী ব্যাংকের নবাবগঞ্জ শাখার কর্মকর্তা হারাধন সরকার; সিটি ব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জিন্দাবাজার শাখার ব্যবস্থাপক মো. মুজিবুর রহমান, ক্যাশ ইনচার্জ মো. গিয়াস উদ্দিন, সাবেক কাস্টমার সার্ভিস অফিসার ও বর্তমানে এক্সিম ব্যাংক সিলেট শাখার এক্সিকিউটিভ অফিসার মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান; জনতা ব্যাংকের ঢাকা লালবাগ রোড শাখার সাবেক এজিএম মো. শামী উল্লাহ। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পুরো ব্যাংক খাতে একটি বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান দরকার। অনেক সময় দেখা যায় চাকরিতে যোগদান করেই দুর্নীতি শুরু করেন। এর কারণ সিনিয়র কর্মকর্তারা তাদের পথ দেখান। তাই এখন এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান হলে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা কমবে। তবে এতে ঢালাওভাবে গ্রেফতার করে আতঙ্ক তৈরি হয় কিনা তাও মাথায় রাখতে হবে। এ অভিযান ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম রোধে ভূমিকা রাখবে। তবে ব্যাংক জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। শীর্ষ ব্যক্তিদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

নাগালের বাইরে যারা : বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের জালিয়াতির ঘটনায় আসামি হয়েছেন শুধু ব্যাংক কর্মকর্তারাই। বেসিক ব্যাংকে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সংশ্লিষ্টতার কথা আলোচিত হলেও গত বছর ৫৬টি মামলা করে দুদক। ওইসব মামলায় ব্যাংকটির বিভিন্ন পর্যায়ের ২৭ কর্মকর্তাকে আসামি করা হলেও পরিচালনা পর্ষদের কাউকে আসামি করা হয়নি। বর্তমানে মামলাগুলোর অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধান পর্যায়ে ৫ ব্যাংক কর্মকর্তাসহ গ্রেফতার হয়েছেন ১১ জন। হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী বাহারুল ইসলামসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের নাম ঘুরেফিরে এলেও তাদের বাদ দিয়েই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। বিসমিল্লাহ গ্রুপের জালিয়াতিতে আসামি হয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তারাই। বড় এই তিন কেলেঙ্কারির ঘটনায় অভিযুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকের এমডিদের মধ্যে দুজন দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আরেকজন জামিনে। সোনালী ব্যাংকের সাবেক এমডি হুমায়ূন কবিরের মেয়াদকালেই ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় এ ঋণ কেলেঙ্কারি ঘটে। ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনায় বেসিক ব্যাংকের সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে ২০১৪ সালের ২৫ মে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৫ সালে দুদকের করা ৫৬ মামলার ৪৮টিতেই তিনি আসামি। অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এমডি সৈয়দ আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলায় ব্যাংকটির শীর্ষ তিন কর্মকর্তা গ্রেফতার হলেও তাকে গ্রেফতার করা যায়নি। সূত্র আরও জানায়, বেসিক ব্যাংক ছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের অর্ধশত এজাহারভুক্ত আসামি রয়েছেন গ্রেফতারের তালিকায়। এর মধ্যে সোনালি ব্যাংকের অবসরে যাওয়া নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী এনামুল হক, মফিজুল ইসলাম ও নারায়ণগঞ্জ করপোরেট শাখার সিনিয়র নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল হোসেন; ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি মামলায় ইউসিবিএল ব্যাংকের সাবেক ৯ কর্মকর্তা; জনতা ব্যাংক থেকে ২৫১ কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলায় শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান ডিএমডি মনজেরুল ইসলাম, এক্সিকিউটিভ অফিসার মসিউর রহমান, এ এস এম জহুরুল ইসলাম, এজিএম শামীম আহমেদ খান; অবৈধ সম্পদ অর্জন মামলায় মিডল্যান্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসানউজ জামান রয়েছেন।

দুদকের হাতে অডিটর মানিক গ্রেফতার : প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে অর্থ নিয়ন্ত্রক (আর্মি) পে-১ এর অডিটর মানিক চন্দ্র মৈত্রকে গ্রেফতার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল অভিযান চালিয়ে তাকে রাজধানীর সেগুনবাগিচা থেকে গ্রেফতার করা হয়। দুদক সূত্র জানায়, মানিক চন্দ্রের বিরুদ্ধে ২ লাখ ৩১ হাজার ৮৩৬ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তিনি ছয়জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার যোগসাজশে ভুয়া বিল পাস করে ওই টাকা আত্মসাৎ করেন। এ ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow