Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৩ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:১৭
ধর্ম চিন্তা
বেহেশতের পথিক? সাধারণরাই
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
বেহেশতের পথিক? সাধারণরাই

মৃত্যুর পর কবরের অবস্থা নিয়ে ভাবতে বসলে দিশাহারা হই। ‘হায়াতুস সাহাবার’ যে কোনো পাতা থেকে শুরু করলেই এমনসব পরিস্থিতি সামনে চলে আসবে যা ভাবলে শিহরিত হতে হয়। অথচ জিন্দেগিকে এতখানি পাকাপোক্ত মনে করি যে এ পাতাগুলো যে মিথ্যা, তা প্রমাণ করার জন্য বইটা তুলে রাখি। হজরত ওমর মৃত্যুভয়ে কাতর নন, কিন্তু মৃত্যুর কথা বিস্মৃত হতেন কমই। রসুল [সা.] তাকে বললেন, হে ওমর, জেনে রেখ দুহাত চওড়া ও চার হাত লম্বা যে জমিন তোমার কবর রচনা করবে, সেখানে মুনকির নাকিরের আসতে বেশি সময় লাগবে না। ওমর জিজ্ঞাসা করলেন, ওরা কারা? উত্তর হলো : ওরা পরীক্ষক। ওরা কবর খুঁড়ে আসবে। তাদের চুল হবে পায়ের সমান, আওয়াজ হবে বজে র মতো এবং চাহনি হবে বিদ্যুতের মতো। তাদের হাতে থাকবে একটি মুগুর, যা পৃথিবীর কোনো শক্তি হেলাতে পারবে না। এমন সময় রসুল [সা.]-এর হাতে একটি ছোট্ট ছড়ি ছিল, যা তিনি নাড়াতে লাগলেন। তারা তোমার ওপরে সেই মুগুরটি যখন চালনা করবে, তখন তুমি পর্যবসিত হবে ছাইয়ে। প্রশ্ন করবে : তোমার রব কে, তোমার নবী কে? একবার ওমরকে জিজ্ঞাসা করা হলো রসুল [সা.] যে এত নরম মেজাজের মানুষ, তাহলে কি তিনি হাসতেন না? ওমর বললেন, হাসতেন। তবে তার ইমান ছিল পাহাড়ের মতো। ওমরকে ও আল্লাহকে যতটা রসুল [সা.] চিনতেন, আর কেউ চিনতেন না। আকস্মিক বিপদের জন্য কিছু বায়তুল মালের সম্পদ রেখে দেওয়ার জন্য কেউ তাকে উপদেশ দিল। বললেন, ওটি শয়তানের উপদেশ। আমার জন্য প্রস্তুত আল্লাহর তাক্ওয়া। [যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে, তার জন্য মুক্তির পথ প্রস্তুত]। মা আয়েশা বলেছেন, হজরত উসায়েদ ইবনে উজায়েরের কথা। তিনি বলছেন : মৃত্যুর আগে তিনটি অবস্থা আমাকে জানিয়ে দেবে আমি বেহেশতের পথিক কিনা? প্রথম: যখন আমি কোরআন তেলাওয়াত করি এবং কোরআন শুনি, দ্বিতীয়: যখন আমি রসুল [সা.]-এর খুতবা শুনি, তৃতীয়: যখন আমি কোনো জানাজায় শরিক হই। এই তিন অবস্থা মৃত্যুকে সামনে রাখে। আর কিছুর প্রয়োজন নেই। কখনো কারও মৃত্যু হলে সেই ভদ্রলোকের জন্য আসুন ভালোটাই চিন্তা করি। সে আল্লাহকে কতখানি চিনেছে তা তারই জানার কথা, তাকে অস্বীকার করেছে কিনা, তাই বা আমি কেমন করে জানব। তাই সঙ্গে সঙ্গে তার জন্য খারাপ চিন্তাটা মনে স্থান না দেওয়াই ভালো। রসুল [সা.]-এর হাদিসে একজন পাপিষ্ঠা রমণীর কথা প্রায়ই পাওয়া যায়। তিনি একটি বিড়াল ছানাকে পানি খাইয়েছিলেন। এইটুকুতেই তার জন্য বেহেশতের ফায়সালা হয়। তাহলে আমরা কেন ছোটখাটো কারণে কারও পিছনে সময় নষ্ট করব?

নামাজ সবচেয়ে দরকারি। অফিসে আদালতে ব্যবসায় বাণিজ্যে নামাজকে কত কম গুরুত্ব দিয়ে থাকি আমরা। সাহাবাদের জীবনী পাঠ করলে বোঝা যায় তাদের জীবনটাই ছিল নামাজ। নামাজই হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে সান্নিধ্য লাভের একমাত্র উপায়। যতক্ষণ ‘হায়াতুস সাহাবা’ আমার হাতে থাকে, ততক্ষণ বেহেশত দেখতে পাই। তা হলে বেহেশত দেখা কত সহজ। এক নামাজের পরে আরেক নামাজ সম্পর্কে ওসিহত করা ছিল রসুল [সা.]-এর সবচেয়ে দরকারি কাজ। তাহলে আমাদের হবে না কেন? অফিসাররা ওই নামাজের সময়টি বিচার না করে আমাদের কাজ দেন কেন? কর্মচারীরা নামাজের দিকে খেয়াল করি না কেন? মনে করতে হবে এটি মালিকের হুকুম। যদি অপর একটি মানুষের নামাজের জন্য কাতর হন, আপনার মর্যাদা ও ইমানী শক্তি বহুগুণে প্রাপ্তি হবে। পীর ফকির হওয়ার প্রয়োজন নেই। নামাজের তাগিদ দিন, দেখবেন আপনি অন্য মানুষ। আল্লাহর বাণীকে যারা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়, আল্লাহর রহমত কোনোদিন তাদের স্পর্শ করবে না এটি নিশ্চিত। আমি যত লোককে আল্লাহর বিরুদ্ধচারী পেয়েছি, তাদের ব্যক্তিগত জীবন ছিল নরকের চেয়েও ভয়াবহ। তাদের ইহ ও পর জীবন অন্ধকার দিয়ে পরিপূর্ণ। কারও কারও কাছে তাদের জীবন সুখপ্রদ মনে হতে পারে, কিন্তু মুনকির নাকির তাদের ছাড়বে না। হাজার হাজার কোটি বছর অনাদরে অবহেলায় এবং চরম দুঃখ কষ্টের মধ্যে অতিবাহিত হবে এই স্বেচ্ছাচারীদের জীবন।

রসুলুল্লাহ [সা.] বলতেন, যেমন করে আমি অজু করছি, তেমন করে কর। তোমার দেহে এতটুকু ময়লা থাকবে না, তেমনি অজু করার পর তুমি হবে একটি পবিত্র মানুষ, যার দিলে থাকবে শুধু পবিত্র আল্লাহর প্রতি প্রণতি। আবু ওসমান বলেন, একবার হজরত সালমানের সঙ্গে গাছের নিচে বসে আছি। তিনি একটি গাছের শুষ্ক ডাল ধরে নাড়াচাড়া করলেন, পাতাগুলো ঝরে গেল। এমনি তিনবার। জিজ্ঞাসিত হলেন, কেন এমনটি করলেন? তিনি বললেন, হে সালমান, যখন একজন মুসলমান অজু করে তখন সে তা করে অতি উত্তম রূপে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে তার সব গুনাহ ঝরে পড়ে যায় যেমন ঝরে পড়ল শুষ্ক ডালের পাতা। কোরআন পাকের আয়াতে আছে এর বর্ণনা : দিনের উভয় প্রান্তে [অর্থাৎ সকাল ও সন্ধ্যায়] এবং রাতের একাংশে নামাজ কায়েম কর। নিঃসন্দেহে নেক কাজসমূহ গুনাহগুলোকে দূর করে দেয়। যারা নসিহত মেনে চলে তাদের জন্য এটি একটি নসিহত। [আহমাদ, নাসায়ী] মসজিদে দেখা যায় সাধারণ মানুষরা অনেকক্ষণ ধরে অজু করছেন। দেশে বিদেশে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতে আমার খুব ভালো লাগে। কারণ সাধারণ লোকরাই বেহেশতের পথিক। গত শুক্রবারে মসজিদ থেকে শুনে এসেছি। রসুল [সা.] আবু মুসাকে বললেন, আমাকে কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাতে পারবে? আবু মুসা অবাক। স্বপ্ন দেখছেন না তো? আল্লাহর রসুল [সা.] তার কাছে তেলাওয়াত শুনতে চাচ্ছেন, অভাবিত আহ্বান। রসুল [সা.] এবার তাকে আরও কাছে টেনে নিলেন এবং ধীর স্বরে বললেন, জানতে চাও, কেন শুনতে চাচ্ছি? আবু মুসা বাকরহিত। রসুল [সা.] বললেন, তাহলে শোন, আল্লাহ স্বয়ং তোমার কণ্ঠে তেলাওয়াত শুনতে চাচ্ছেন। আবু মুসার চোখ এবার অশ্রুতে সয়লাব। আল্লাহ কোরআনের তেলাওয়াত কত ভালোবাসেন এটা তারই প্রমাণ।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow