Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৪০
বিদেশি এলেই নালিশ, গণতন্ত্র বানান জানে কিনা সন্দেহ : প্রধানমন্ত্রী
মন্ত্রী এমপিদের প্রতি হুঁশিয়ারি
নিজস্ব প্রতিবেদক

বিএনপি ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিদেশি কোনো অতিথি এলেই দেখা করে কান্নাকাটি করে বলে দেশে নাকি গণতন্ত্র নেই! বিদেশিদের কাছে নালিশ বা কান্নাকাটি করে কোনো লাভ হবে না। দেশবাসী ওই দলটিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে, যুগ যুগ ধরেই তাদের প্রত্যাখ্যান করে যাবে। গতকাল সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির বৈঠকে সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আশ্চর্য লাগে, কাদের মুখ থেকে এ কথা শুনতে হয়! যারা ৭৫-এর পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছে, জিয়া ক্ষমতায় এসে সংবিধান লঙ্ঘন করেছে, আর্মি রুলস লঙ্ঘন করেছে, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে অবৈধ সংগঠন করেছে, যারা ভোট চুরি করে, জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছে-সেই সংগঠন বিএনপির মুখ থেকে গণতন্ত্রের সবক শুনতে হয়। এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। তারা গণতন্ত্রের সংজ্ঞা বলতে পারে কিনা আমার সন্দেহ। গণতন্ত্র বানান করতে পারবে কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করেছে, যুদ্ধাপরাধীদের মদদ দিয়েছে, এতিমের টাকা মেরে খেয়েছে, মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে, যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে জাতীয় পতাকার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে, তাদের বিচারও বাংলার মাটিতে হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা ভোট চুরি করে ক্ষমতায় এসেছে, জনরোষে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, তাদের মুখ থেকে আজ গণতন্ত্রের কথা শুনতে হয়! এই দলটি কোন গণতন্ত্রের পথে চলে? তারা তো শুধু ধ্বংস ও মানুষকে হত্যা করতে জানে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় কমিটির সভায় প্রারম্ভিক বক্তব্য রাখেন দলটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এরপর রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আগামী ২২-২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক জাতীয় কাউন্সিলের বাজেট এবং দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে আলোচনার পর তা সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়। দীর্ঘ চার বছর পর জাতীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থিত সারা দেশের প্রবীণ নেতারা তাদের নানা অভিযোগ এবং পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তা সমাধানের ব্যাপারে আশ্বাস দেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দায়িত্ব ছেড়ে দিতে চান জানিয়ে বলেন, ৮১ থেকে ২০১৬ সাল। ৩৫ বছর ধরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি, আর কত? আর, কত? নতুন নেতা নির্বাচন করেন। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের যে চারা রোপণ করে গিয়েছিলেন, তা আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এ সময় উপস্থিত নেতারা সবাই একযোগে বলেন ‘না’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যারা যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের হাতে রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছে, তাদেরও বাংলার মাটিতে বিচার হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। যুদ্ধাপরাধীদের মদদদাতা, শত শত জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যাকারী, যারা ক্ষমতায় থাকতে দেশের অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচার করেছে, যারা এতিমের টাকা আত্মসাৎ করেছে- তাদের বিচার অবশ্যই বাংলার মাটিতে হবে। যতই বিদেশিদের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করুক, কোনো লাভ হবে না। জনগণ জানে একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই দেশের উন্নয়ন হবে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগ এখন মহীরুহ সংগঠনে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই আওয়ামী লীগকে এই অবস্থায় আসতে হয়েছে। আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। ভাষা থেকে স্বাধীনতা এবং পরবর্তীতে গণতন্ত্র বাঙালি জাতির যা অর্জন বা যেটুকু পেয়েছে তার সবই আওয়ামী লীগের কাছ থেকেই পেয়েছে। আওয়ামী লীগ জন্মলগ্ন থেকেই দেশের মানুষকে দিয়ে যাচ্ছে। দেশের মানুষের অধিকার আদায় ও কল্যাণে অসংখ্য আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী জীবন দিয়ে গেছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দীর্ঘ ২১টি বছর আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া আওয়ামী লীগের শিকড় অত্যন্ত মজবুত ও গভীরে। দলের নেতা-কর্মীরা নীতি-আদর্শে বিশ্বাস করে বলেই অনেক ঝড়-ঝাপটা মোকাবিলা করেই আওয়ামী লীগ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যে দল স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেয়, সেই দল ক্ষমতায় থাকলে যে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হয় আমরা তা প্রমাণ করেছি। তিনি বলেন, ’৭৫-পরবর্তী সরকারগুলো ক্ষমতায় থেকে শুধু নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন করেছে, দেশের মানুষ হয়েছে শোষিত-বঞ্চিত। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তাদের শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিই হচ্ছে তৃণমূল মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। প্রধানমন্ত্রী তার টানা দুই মেয়াদে সরকারের সফলতা ও অর্জনগুলো তুলে ধরে বলেন, মাত্র এই সোয়া সাত বছরে সারাবিশ্বে বাংলাদেশ এখন অত্যন্ত সম্মানজনক অবস্থায় উঠে এসেছে। আগামী নির্বাচনের আর দুই বছর ২ মাস বাকি, এর মধ্যে দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো আমাদের পূরণ করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা দারিদ্র্যের হার ১১ ভাগে কমিয়ে এনেছি। দেশের অর্থনীতি অত্যন্ত শক্তিশালী ও মজবুত। আগে বাংলাদেশ মানেই ছিল ভিক্ষার ঝুলি, অন্যের করুণা নিয়ে বেঁচে থাকা।

মন্ত্রী-এমপিদের প্রতি হুঁশিয়ারি : সূত্র জানায়, গত রাতে জাতীয় কমিটির রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সভাপতি শেখ হাসিনা বিতর্কিত কিছু এমপি-মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দলের ত্যাগী ও প্রবীণদের উপেক্ষা-অবহেলা ও অসম্মান করলে তার খেসারত দিতে হবে। তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে যদি এ ধরনের অভিযোগ আসে তাহলে তাকে পদপদবিতে রাখা হবে না। তাকে দলের মনোনয়নও দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, দল করতে হলে তৃণমূলে প্রবীণদের সম্মান-শ্রদ্ধা করতেই হবে। বৈঠকসূত্র জানায়, সভায় জাতীয় কমিটির কিছু সদস্য তাদের বক্তৃতায় স্থানীয় এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কর্মীদের অবমূল্যায়ন, নিজ দলের পরিবর্তে জামায়াত-বিএনপির লোকদের সঙ্গে সখ্য গড়ার অভিযোগ তোলেন। তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার কাছে সব তথ্যই আছে। আমরা এত উন্নয়ন করলাম, সেসবের প্রচার নেই। কমিউনিটি ক্লিনিক করেছি, ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্যসেবা চালু করেছি, দেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চলেছে। বিশ্ব আমাদের স্বীকৃতি দিচ্ছে। তৃণমূলে এর প্রচার নেই। আপনারা নিজেদের সমালোচনা না করে সরকারের করা উন্নয়ন কাজগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরুন।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাই সংগঠনের প্রাণ। মনে রাখবেন সংগঠন ছাড়া কেউ এমপি-মন্ত্রী হতে পারবেন না। কাজেই তৃণমূলের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে তা অটুট রাখুন।’ জাতীয় কমিটির এক নেতা আওয়ামী লীগ সভাপতির উদ্দেশে বলেন, ‘নেত্রী! ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর অনেককেই দেখা যায়নি। তারা সরে দাঁড়িয়েছিল। এবারের কাউন্সিলে সেসব মুখ যেন নেতৃত্বে না আসে সে বিষয়টি লক্ষ্য রাখবেন, এটা আমাদের অনুরোধ।’ সূত্র জানায়, বৈঠকে এমপিদের দলীয় চাঁদা ৫০০ টাকার পরিবর্ততে ২ হাজার করার প্রস্তাব উঠলে একজন এমপি বলেন, ‘নেত্রী! এমপিদের তো অফিস খরচ আছে। নেতা-কর্মীদেরও চালাতে হয়।’ তখন সভাপতি সহাস্যে বলেন, ‘দল করতে হলে খরচ তো করতেই হয়। আপনাদের না পোষালে ছেড়ে দিন।’ বৈঠকে আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলনের ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। এ ছাড়া বৈঠকে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে অত্যাধুনিক পার্টি অফিস নির্মাণের জন্য সম্ভাব্য ৫ কোটি, দলীয় অফিস ভাড়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, দলীয় সভা-সমাবেশের খরচসহ প্রায় ১১ কোটি টাকার বাজেট পাস করা হয়েছে। আগে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য চাঁদা ১০ থাকা ছিল। গতকালের বৈঠকে তা বাড়িয়ে ২০ টাকা করা হয়েছে। কাউন্সিলরদের বার্ষিক চাঁদা ১০০ টাকার স্থলে বাড়িয়ে ২০০, দলীয় সংসদ সদস্যদের বার্ষিক চাঁদা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, বৈঠকে দিনাজপুর, পঞ্চগড়, বাগেরহাট, সিলেট ও খুলনা জেলার জাতীয় কমিটির সদস্যরা বক্তব্যে শেখ হাসিনাকে পুনরায় সভাপতি পদে নির্বাচিত করার পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরলে উপস্থিত সব সদস্য এ ব্যাপারে ঐকমত্য প্রকাশ করেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow