Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:২৮
ক্ষমতা হারানোর ১০ বছর পূর্ণ হচ্ছে বিএনপির
শফিউল আলম দোলন

আগামী ২৮ অক্টোবর বিএনপির ক্ষমতার বাইরে থাকার ১০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ২০০৭ সালের আলোচিত ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ পর থেকে অদ্যাবধি আওয়ামী লীগের দুই দফা শাসনামল পর্যন্ত হাজারো ইস্যু হাতে পাওয়ার পরও তার একটিও কাজে লাগাতে পারেনি দলটি।

তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে চাল, ডাল, লবণের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দফায় দফায় অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো ইস্যুকেই কাজে লাগাতে পারছে না তারা। জনগণের অধিকার রক্ষা কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো ইস্যু কাজে লাগাতে না পারার কারণ হিসেবে দলের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সমর্থক বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ একেকজন একেক ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সাংগঠনিকভাবে কিছু ভুল হয়তো আমাদের থাকতে পারে, কিন্তু তার চেয়ে বড় বিষয়গুলো হলো সরকারের কঠোর দমননীতি তথা গুম, খুন, অপহরণ, মিথ্যা মামলা, গ্রেফতার-রিমান্ডের মতো নিপীড়ন। ’ লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান (অব.) জনআন্দোলনে তার দলের নানা ইস্যু হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পেছনে সরকারের দমননীতির পাশাপাশি ‘ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল’ বিষয়গুলোকেও দায়ী করেন। অন্যদিকে দলের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিএনপির এ অবস্থা দেখে এর প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান হয়তো আজ দুঃখে ‘কবরে কান্না করছেন’। পুলিশের অনুমতি না মিললে বেগম খালেদা জিয়ার ডাকেও ঢাকায় আজ কেন্দ্রীয় কোনো নেতা মাঠে নামেন না। আন্দোলনে এর চেয়ে হাস্যকর বিষয় আর কী হতে পারে! আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ইস্যু হাতছাড়ার পেছনের বিভিন্ন কারণের পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক শৈথিল্যকেই বেশি দায়ী করেন। জানা যায়, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সাম্প্রতিক ইস্যুগুলোর মধ্যে প্রতিবেশী ভারতকে প্রায় বিনা শুল্কে দেওয়া ট্রান্সশিপমেন্ট ও বন্দর ব্যবহারের সুবিধার মাধ্যমে দেশের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর ব্যাপারে তেমন কোনো কথা বলেননি বিএনপি নেতারা। সর্বশেষ হম্বিতম্বির পরও রামপাল কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপারেও এখন পর্যন্ত কোনো কর্মসূচি দিতে পারেনি বিএনপি। এর আগে সারা দেশে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ার আহ্বান জানিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন দলীয় চেয়ারপারসন। ২০-দলীয় জোটের বাইরের কোনো রাজনৈতিক দল এতে সাড়া দেয়নি। বরং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা নামক জাতীয় কমিটির নেতা আনু মুহাম্মদ সেই ঐক্যের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, বিএনপির আন্দোলনের সঙ্গে তাদের আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তাদের আন্দোলনের সঙ্গে বিএনপির সম্পৃক্ততা চান না তারা। অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের অনাগ্রহ, অদক্ষতা, সমন্বয়হীনতা, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব আর দলের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা কতিপয় সরকারি এজেন্টের কারণেই এ অবস্থা বলে অভিযোগ দলের অনেক নীতিনির্ধারকের। এ অবস্থার কারণ সম্পর্কে দলীয় ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আসলে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকলে যা হয় আর কি! এক দশক ক্ষমতার বাইরে থাকলে সাংগঠনিক ভিত কিছুটা শিথিল হয়ে পড়াটাই তো স্বাভাবিক। তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে সরকারের দমন-পীড়ন। মামলা-হামলা, গ্রেফতার-রিমান্ড তো আছেই, তার ওপর রয়েছে গুম, খুন ও অপহরণ। সরকারের বাধার কারণেও দলটির গণতান্ত্রিক আন্দোলন ব্যাহত হয়েছে বার বার। তার পরও আমরা আশা করব, আগামী দিনে এ দলটি তার সাংগঠনিক ভিত আরও শক্তিশালী করে দলের ভিতরের ঐক্য আরও সুদৃঢ় করবে; যা পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে অবদান রাখবে। ’ এদিকে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির ক্ষমতা ছাড়ার পর ‘ওয়ান-ইলেভেনে’ উত্থিত সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকারের দুই বছরসহ বর্তমান আওয়ামী লীগ শাসনামলে আগামী ২৮ অক্টোবর টানা ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে অতিক্রম করছে দলটি। দীর্ঘ এক দশকের এই দহন আর সরকারের দমননীতিতে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে অতীতে টানা পাঁচবার সরকারে থাকা এই দল। দলের ভিতরে যোগ্য নেতৃত্ব আর সদিচ্ছার অভাবে আবারও সরকারে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। এমনকি দলের হাইকমান্ড বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশনাও এখন আর আগের মতো কাজ করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ঘোষিত ৫০২ সদস্যের ঢাউস নির্বাহী কমিটি গঠনে নানা অনিয়ম ও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের কারণে প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন বেশির ভাগ নেতা। কি পদবঞ্চিত আর কি পদাসীন, দলের ভিতরে উভয় ধরনের নেতারাই তাদের সক্রিয়তা হারাচ্ছেন। এ অবস্থায় দলের চেইন অব কমান্ডও ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন সিনিয়র নেতারা। জানা গেছে, নতুন নির্বাহী কমিটি ঘোষণার পরই এ অবস্থা শুরু হয়েছে। অতিমাত্রায় পারিবারিকীকরণ আর পদবাণিজ্যও দলের বর্তমান বেহাল অবস্থার অন্যতম কারণ হিসেবে অভিযোগ করেছেন অনেকে। আবার অনেকে মনে করছেন ইচ্ছা করেই মাঠে নামছেন না দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। মন্ত্রী-এমপি না হলেও সরকারে থাকতে উপার্জিত পাহাড়সম ধনসম্পদ নিয়ে ভালোই আছেন তারা। দল, কর্মী-সমর্থক বাদ দিয়ে অবৈধভাবে উপার্জিত এই ‘যক্ষের ধন’ রক্ষায় তারা যেমন ব্যস্ত, ঠিক তেমন দলের বড় বড় পদ ধরে রেখে ত্যাগী নেতাদের পথ আগলে রেখেছেন এসব নেতা। এ ছাড়াও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে সারা দেশ যখন আন্দোলনে উত্তাল এবং রাজধানী যখন দেশ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ করে পাশ্চাত্যের আদলে ঢাকায় ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে জেলা-উপজেলার নেতাদের ঢাকায় ডেকে এনে মাঠে না নামার মতো সিদ্ধান্তটিকেও দলের চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে মনে করেন অনেক নীতিনির্ধারক। এ প্রসঙ্গে বিএনপি ঘরানার আরেক বুদ্ধিজীবী গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশের গণতন্ত্র উদ্ধারের আগে বিএনপির ঘরের ভিতরের গণতন্ত্র উদ্ধার করতে হবে। বিএনপিকে জাগতে হবে। বিএনপির সিনিয়র তথা কেন্দ্রীয় নেতারা ঘুমিয়ে আছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ যদি ইচ্ছা করে না জাগেন তবে তাকে ঘুম থেকে জাগানো খুবই কঠিন কাজ। ১০ বছর ধরে আন্দোলনের ইস্যু হাতছাড়া হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এজন্য বেগম খালেদা জিয়ার চেয়ে বেশি দায়ী হলেন তার দলের সিনিয়র নেতারা। কাজও করবেন না, আবার বড় বড় পদ আগলে ধরে রাখবেন। আর আন্দোলনের জন্য সরকারের দমননীতিকে কোনো বাধা বলেই মনে করেন না বিশিষ্ট এই মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো সরকারই কখনো তার নিজের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সুযোগ করে দেয় না। তারা দমননীতি চালিয়ে তা স্তব্ধ করে দিতে চায়। এসব উপক্ষো করেই আন্দোলন করতে হয়। হাস্যকর লাগে তখন, যখন বিএনপি নেতাদের মুখে শোনা যায় যে, পুলিশ অনুমতি দেয়নি বলে তারা কর্মসূচি পালন করতে পারেননি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির কর্মসূচি দূরের কথা, চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রোগ্রামেও এখন দলের ৮-১০ জন সিনিয়র নেতা একসঙ্গে উপস্থিত থাকেন না। এর মধ্যে গত ৬ আগস্ট কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তার উপস্থিতিতে সে অনুষ্ঠানে নতুন-পুরান মিলে দলের স্থায়ী ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির মাত্র ছয়জন উপস্থিত ছিলেন। এর আগে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলায় আদালত সাত বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়ার পর টানা তিন-চার দিন পর্যন্ত বিএনপি বা কোনো অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে কোনোরকমের প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ দেখা যায়নি। তবে রায় ঘোষণার পর দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের নেতারা মিলে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। এরপর ২২ সেপ্টেম্বর বিকালে বেগম খালেদা জিয়া হজ পালন শেষে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল নোমান ও চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের মতো চার-পাঁচ জন নেতা ছাড়া আর তেমন কাউকেই বিমানবন্দরে দেখা যায়নি। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান (অব.) দলের ইস্যু হাতছাড়ার বিষয়ে আরও বলেন, ‘একই সঙ্গে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতাও এ অবস্থার অন্যতম একটা কারণ। তবে কাউন্সিল হয়েছে। আমরা এখন শক্তি অর্জনের চেষ্টা করছি। ইনশা আল্লাহ গণতন্ত্র একদিন পুনরুদ্ধার করব। ’ তিনি আরও বলেন, এই দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান একদিন ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে এ দেশের জনগণকে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ সারা জীবন গণতন্ত্রের পক্ষে আন্দোলন করে একটি দল দেশের গণতন্ত্রকে হরণ করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল। বিএনপি অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভুল আমাদেরও অনেক আছে। সেগুলো ‘ওভার-কাম’ করেই সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। ’

up-arrow