Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:৫৫
সম্মেলন ঘিরে টানটান উত্তেজনা
প্রস্তাবিত ৮১ পদে ১০ হাজার প্রার্থী, ছিটকে পড়ার আতঙ্কে হাইব্রিড দলবিচ্ছিন্ন বিতর্কিতরা, যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য সৌদির নেতারাও ঢাকায়, পদ পেতে গণভবন কর্মচারী থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতাদের বাড়িতে ধরনা, স্নায়ুচাপে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতারাও
রফিকুল ইসলাম রনি
সম্মেলন ঘিরে টানটান উত্তেজনা

আর মাত্র তিন দিন পর উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন। আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডি কার্যালয় থেকে সম্মেলনস্থল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, দলের প্রভাবশালী নেতাদের অফিস-বাসাবাড়ি সর্বত্রই এখন পদপ্রত্যাশীর ভিড়ে সরগরম। চলছে সালাম বিনিয়ম আর নানাভাবে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা। শুধু দলের হাইকমান্ড বা প্রভাবশালী নেতাদের কাছেই নয়, গণভবনের নিম্নমান কর্মচারীদের কাছে এবং তাদের বাসাবাড়িতেও ধরনা দিচ্ছেন পদপ্রত্যাশীরা। অন্যদিকে ছিটকে পড়ার আতঙ্কে রয়েছেন হাইব্রিড, অতিকথনপ্রিয় ও অতিবদমেজাজি, জামায়াত-শিবিরকে দলে ভেড়ানো ব্যক্তি ও দলবিচ্ছিন্ন নিষ্ক্রিয়রা। আর ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন কিছু আলালের ঘরের দুলাল। উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার ছাপ দেখা গেছে দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মাঠের রাজনীতিতে জনপ্রিয় নেতাদের চোখেমুখেও। ‘তরুণরাও নেতা হোক’ছ— দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন ইঙ্গিতে এখন আরও আশাবাদী হয়ে উঠছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে থাকা বা পদপ্রত্যাশী কিছু নেতার মধ্যে চলছে একে অন্যকে বিতর্কিত করার প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে একই এলাকা বা একই সংগঠনে ছিলেন তাদের মধ্যে ওয়ান-ইলেভেনের সময় কার কী ভূমিকা ছিল সেসব চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে এখন। প্রশ্ন তোলা হচ্ছে বিগত বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে এসব পদপ্রত্যাশীর ভূমিকা নিয়ে। তুলে ধরা হচ্ছে সর্বশেষ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশে তাদের সাহসিক ভূমিকা অথবা নীরবতা। সব মিলে যতই দিন যাচ্ছে ততই সম্মেলন ঘিরে নেতা-কর্মীদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। ধানমন্ডিতে সভাপতির কার্যালয়ে কথা হয় একজন কেন্দ্রীয় ও দুজন পদপ্রত্যাশী নেতার সঙ্গে। ক্ষোভের সঙ্গে তারা জানালেন, সম্মেলন ঘিরে এখন ভিতরে ভিতরে নোংরা রাজনীতি শুরু হয়েছে। বিগত ওয়ান-ইলেভেনে কে কী করেছে, কে নিষ্ক্রিয়, কে সক্রিয় ছিল তা জাহির করার প্রতিযোগিতা চলছে। এতে কতিপয় কেন্দ্রীয় নেতা ও পদপ্রত্যাশীও বিব্রত হচ্ছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা যারা রাজনীতি করি, সম্মেলন তাদের জন্য ছাত্রজীবনের পরীক্ষার মতো। কারণ কাউন্সিলে ভালো কাজের জন্য প্রমোশন হয়। আর দক্ষতা দেখাতে না পারলে ডিমোশন হয়। কাজেই সবার মধ্যেই এক ধরনের স্নায়ুচাপ থাকবে।’ সরেজমিনে আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডি কার্যালয় ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘুরে দেখা গেছে, নেতা-কর্মীর পদভারে মুখরিত থাকছে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। সম্মেলন সফল করতে গঠিত বিভিন্ন উপকমিটির নেতারা যখন কার্যালয় বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসেন তখন উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে দুই থেকে তিনজন প্রভাবশালী নেতা যখন সভাপতির কার্যালয় বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকেন তখন বিশাল বহর নামে পদপ্রত্যাশী নেতাদের। এ পদপ্রত্যাশীর তালিকায় সাবেক ছাত্রনেতা, সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাও রয়েছেন। আছেন গণহারে সহ-সম্পাদকের তালিকায় যুক্ত হওয়া কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহ-সম্পাদক, থানা-উপজেলা বা জেলা কমিটির সদস্য হতে পারেননি এমন ব্যক্তিরাও। কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসতে ন্যূনতম কতটুকু যোগ্যতা থাকা দরকার— এমন আন্দাজ নেই সেসব ব্যক্তিও নেতা হতে মরিয়া। পিছিয়ে নেই সাবেক আমলা, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী কিংবা প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীও। বিশেষ করে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ ও যুব মহিলা লীগের দেড় থেকে দুই ডজন নেতা-নেত্রী কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পেতে নানাভাবে চেষ্টা করছেন। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামের ছবি পোস্ট করে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি গণভবনে দলীয় প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণেরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ছাত্রলীগের বেশকিছু নেতাকে সহযোগী সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু তারা সেখানে কাজ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না দীর্ঘদিন থেকে। এখন তারা কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ প্রত্যাশা করছেন। যে কোনো প্রোগ্রামের আগেই অনুষ্ঠাস্থলে হাজির হচ্ছেন। বিগত দিনে নিজেদের কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি নিয়ে হাজির হচ্ছেন নেতাদের দ্বারে -দ্বারে। কেউবা আবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেরও দ্বারস্থ হচ্ছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসংখ্যা বর্তমানে ৭৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামীতে ৮১ করা হলেও এই পদের বিপরীতে পদপ্রত্যাশী ১০ হাজার। জেলা কমিটির নেতা হতে পারেননি এমন নেতাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়ার ‘ইচ্ছা’ কুঁজোর সোজা হয়ে শোয়ার মতো বলে মনে করছেন কেউ কেউ। এমন কিছু পদপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় কমিটির প্রভাবশালী নেতাদের কাছে গিয়ে ধরনা দিচ্ছেন যা হাস্যরসের সৃষ্টি করছে। বাপ-দাদার বংশপরম্পরায় কেউ কখনই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও এখন কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাদের অনেকেই পদপ্রত্যাশী। পিছিয়ে নেই প্রবাসীরাও। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য থেকে শুরু করে সৌদি আরবের নেতারাও এখন ঢাকায়। গত রবিবার সকালে ভারত যাওয়ার আগে কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন নেতার সঙ্গে দেখা করতে যান এক প্রবাসী নেতা। সালাম বিনিময়ের সময় ওই প্রবাসী নেতাকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তোমরাও চলে এসেছ! ভালোই তো’। দলীয় সূত্রমতে, সবার চোখ এখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের দিকে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল এমনকি দেশের সব রাজনৈতিক দল ও মানুষের মধ্যে কৌতূহল বিরাজ করছে। কেমন নেতৃত্ব বা কী কর্মসূচি আসছে আওয়ামী লীগের সম্মেলন থেকে, পুরনো ও বিতর্কিতরা স্বপদে বহাল থাকছেন কিনা এসব গুঞ্জন চাউর হচ্ছে সর্বত্র। আর অস্থিরতা বিরাজ করছে কেন্দ্রীয় কমিটিতে থাকা ও নতুন করে অন্তর্ভুক্তি হওয়া নিয়ে। এ অস্থিরতার কথা জানা যায় দলটির কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহ-সম্পাদকদের কাছ থেকেও। সহ-সম্পাদকদের অনেকেই প্রায় প্রতিদিন দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আসেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে থাকেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সহ-সম্পাদক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদপ্রত্যাশী হলেও মূলত আগামীতে এই পদে থাকব কিনা তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছি। কারণ শুনলাম এবার সহ-সম্পাদক নির্ধারণ নেত্রী নিজে করবেন।’

 

 

up-arrow