Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:০৫
রাসেলকে স্মরণ করে কাঁদলেন প্রধানমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক

আদরের ছোট ভাই শেখ রাসেলের জন্মদিনে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রাসেল তো আসলে আমার কোলেই মানুষ। ছোট্ট শিশু ভাইটি তো আমাদের একটা খেলার পুতুলের মতো ছিল।

আমরা সব ভাইবোন ব্যস্ত ছিলাম রাসেলকে নিয়ে। এ সময়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বড় বোন শেখ হাসিনা বলেন, মাঝে মাঝে আমি  লিখি। সেই স্মৃতিগুলো লিখে রাখার চেষ্টা করি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ছেলে শহীদ শেখ রাসেলের ৫২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল দুপুরে রাজধানীর কৃষিবিদ মিলনায়তনে শেখ রাসেল শিশু-কিশোর পরিষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা এই স্মৃতিচারণা করেন। এ সময়ে প্রধানমন্ত্রী বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, মাঝে মাঝে মা রাসেলকে সান্ত্বনা দিত— ‘আমিই তোমার বাবা আবার আমিই তোমার মা। ’ এরপর শিশু রাসেল যখন কারাগারে আমাদের সঙ্গে বাবাকে দেখতে যেত, সে একবার বাবাকে আব্বা বলে ডাকত আবার একবার মাকে আব্বা বলে ডেকে হতবিহ্বল হয়ে পড়ত। এভাবেই ছোট্ট রাসেল বেড়ে উঠেছে। এরপর ’৬৮ সালে বাবাকে ক্যান্টনমেন্টে ৬ মাস বন্দী করে রাখল, আমরা তার কোনো খবর পাইনি, তিনি বেঁচে আছেন কিনা, সে খবরও আমাদের কাছে ছিল না। তখন শিশু রাসেল মাঝে মাঝেই রাতে খুব কান্নাকাটি করত। আমরা সবাই তাকে সান্ত্বনা দিতাম। কিন্তু আমরা কি সান্ত্বনা দেব, আমরাও তো বাবার স্নেহবঞ্চিত! মুক্তিযুদ্ধকালীন ধানমণ্ডি ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে বন্দী থাকাবস্থায় সঙ্গীহীন রাসেলের দুঃসহ জীবনের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর কেবল সাড়ে ৩ বছর সময়ই সে পিতৃস্নেহ পেলেও ঘাতকদের নির্মম বুলেটে তাকে শাহাদাতবরণ করতে হয়েছে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ঘাতকরা তাকেও ছাড়েনি। সবার শেষে তাকেও নির্মমভাবে হত্যা করল! কত ছোট্ট একটা জীবন রাসেলের! একটা উদ্দেশ্য হয়তো ঘাতকদের ছিল, বঙ্গবন্ধুর রক্তের কাউকে বাঁচিয়ে না রাখা। সবার শেষে এই অবুঝ শিশুটিকেও কষ্ট দিয়ে তারা হত্যা করেছিল। রাসেলের নামকরণ বিখ্যাত মনীষী বার্টান্ড রাসেলের নামানুসারে রাখা হয়েছিল জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, রাসেলের নামটি আমার মায়েরই রাখা। সে সময় আমাদের বাড়িতে বই পড়ার রেওয়াজ ছিল। বঙ্গবন্ধু সময় পেলেই কবিতা আবৃত্তি করতেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করতেন। বার্টান্ড রাসেলের বইগুলো থেকে তরজমা করে মাকে শোনাতেন। বার্টান্ড রাসেলের ফিলোসফি (দর্শন) আব্বার খুব পছন্দ ছিল। আমার মা খুব জ্ঞানপিপাসু ছিলেন। লেখাপড়ার তেমন সুযোগ না পেলেও আব্বার বাংলা তরজমা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। শুনতে শুনতে তিনিও বার্টান্ড রাসেলের ফিলোসফির অনুরক্ত হয়ে পড়েন এবং নিজের ছোট ছেলের নাম রাখেন রাসেল। ১৫ আগস্টের বিয়োগান্তক অধ্যায় স্মরণ করে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, ওই ধানমণ্ডির বাড়ির সিঁড়িতে পড়ে আছে পিতার লাশ, নিচে পড়ে আছে ভাইয়ের লাশ। মায়ের লাশ। সেখান থেকে নিয়ে রাসেলকেও হত্যা করা হলো। বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটুক আমরা চাই না। কারণ ১৫ আগস্ট যে ঘটনা ঘটেছে একমাত্র কারবালার ঘটনার সঙ্গেই এর তুলনা চলে। এখানে অসহায় নারী, সন্তানসম্ভবা স্ত্রী, শিশু কাউকেই বাদ দেওয়া হয়নি। শিশু-কিশোরদের মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া শিখে নিজেদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলে দেশের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ, মাদকাসক্তি এসব পথ পরিহার করে নিজেকে আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো শিশুই গৃহহারা থাকবে না এবং শিক্ষার আলো থেকেও বঞ্চিত হবে না। প্রতিটি শিশু স্কুলে যাবে, পড়াশোনা করবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। নিজেদের মেধা বিকাশের সুযোগ হবে সেই সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলাটাই আমার লক্ষ্য। সংগঠনের চেয়ারম্যান রাকিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, উপদেষ্টা সিরাজুল ইসলাম মোল্লা এমপি, মহাসচিব মাহমুদুস সামাদ এমপি, মুজাহিদুর রহমান, মজিবুর রহমান হাওলাদার, কে এম শহীদুল্লাহ ও শিশু নাফিস বিন নাদিম।

শেখ রাসেলের জন্মদিন পালিত : গতকাল নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয় শেখ রাসেলের জন্মদিন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সকালে বনানী কবরস্থানে শেখ রাসেলসহ ১৫ আগস্টের শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন,  মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। বিকালে বঙ্গবন্ধু ভবনে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও নিকটাত্মীয় স্বজন ও দলীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। রাজধানীতে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে যৌথভাবে শিশু সমাবেশের আয়োজন করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মো. মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী।

 এ উপলেক্ষ বিকালে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ ইনডোর স্টেডিয়ামে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র আয়োজিত চার দিনব্যাপী ‘শেখ রাসেল স্কুল টেবিল টেনিস’ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। আওয়ামী যুবলীগ শিল্পকলা একাডেমির গ্যালারিতে সংবাদচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। যুবলীগ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের। এ ছাড়াও দিবসটি উপলক্ষে শিশু সমাবেশ, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ আলোচনা সভা ও কেক কাটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow