Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৯ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:১০
রাজশাহীতে কঙ্কাল নিয়ে ভয়ঙ্কর কারবার
কাজী শাহেদ, রাজশাহী
রাজশাহীতে কঙ্কাল নিয়ে ভয়ঙ্কর কারবার

রাজশাহীতে কঙ্কাল নিয়ে ভয়ঙ্কর কারবারে মেতে উঠেছে একটি চক্র। এতে জড়িয়ে পড়েছেন মেডিকেল কলেজের (রামেক) কিছু শিক্ষার্থী, মর্গের ডোম, বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের কয়েকজন অসাধু মালিক আর সীমান্তের কিছু চোরাকারবারি।

কয়েক মাস আগে রাজশাহী মহানগরীর শ্রীরামপুরে জেলা প্রশাসকের বাংলোর সামনে থেকে ১২টি কঙ্কালসহ চারজনকে আটক করেছিল পুলিশ। এর পরও থামেনি কঙ্কালের কারবার। মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মর্গ থেকেই পুলিশ উদ্ধার করেছে ১৫টি মাথার খুলি ও বিভিন্ন হাড়গোড়। মর্গের দোতলার একটি কক্ষ থেকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল কঙ্কালগুলো উদ্ধার করে। এ সময় কঙ্কাল কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মর্গের দুই ডোমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন নগরীর বাকীর মোড় লক্ষ্মীপুর এলাকার বিপন কুমার (৫৫) ও নীরেন রবিদাস (৪২)। নগর ডিবি পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবদুল হান্নান জানান, রামেক মর্গে কঙ্কাল সংরক্ষণ করে কেনাবেচার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে তারা সেখানে অভিযান চালান। অভিযানে মর্গের দোতলার একটি কক্ষ থেকে খণ্ড খণ্ড অবস্থায় ১৫টি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এ সময় কঙ্কাল কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই ডোমকে আটক করা হয়। পরে রাতেই তাদের নামে বিশেষ ক্ষমতা আইনে রাজপাড়া থানায় একটি মামলা করা হয়। সকালে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। ওসি আরও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বিপন ও নীরেন দাবি করেছেন, চোরাকারবারিরা তাদের ভারত থেকে খণ্ড খণ্ড অবস্থায় কঙ্কাল এনে দেয়। তারা তখন হাড়গোড় জোড়া দিয়ে বিক্রির ব্যবস্থা করেন। এ চক্রের সঙ্গে জড়িত আছেন কয়েকজন মেডিকেল শিক্ষার্থী, বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের কয়েকজন মালিক ও সীমান্ত এলাকার কিছু চোরাকারবারি। এদিকে মেডিকেল কলেজের মর্গেই এতগুলো কঙ্কাল পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে তদন্তে মাঠে নেমেছে সরকারি কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা। গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, রাজশাহীতে কঙ্কাল ব্যবসা পরিচালনা করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিভিন্ন ধাপে কাজ করেন। বেশির ভাগ কঙ্কালের জোগান আসছে ভারত থেকে। কিছু কঙ্কাল আসছে কবর থেকে চুরি হয়ে। আর কিছু কঙ্কাল মিলছে মর্গ থেকেই। পূর্ণাঙ্গ একটি কঙ্কাল তৈরিতে যেসব হাড় প্রয়োজন তা কেনা হয় পাঁচ হাজার টাকায়। আর একটি কঙ্কাল বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায়। গতকাল দুপুরে কঙ্কাল ব্যবসার আদ্যোপান্ত নিয়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন রামেক মর্গের এক ডোম। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান কঙ্কাল ব্যবসার নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। বলেন, রামেক মর্গের ডোমেরা বেতন পান মাসে ২০ টাকা। তাদের বাপ-দাদারাও বেতন পেয়েছেন ২০ টাকা। এজন্য তাদের ময়নাতদন্তের পর লাশের স্বজনদের কাছ থেকে জুলুম করে টাকা আদায় করতে হয়। তাই আয়ের পথ সহজ করতে প্রায় সবাই কঙ্কালের কারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু কারবারে তাদের দায়িত্ব খুব কম। তারা শুধু বিভিন্ন স্থান থেকে আসা গলিত লাশ থেকে হাড়গোড় বের করে পরিষ্কারের পর পূর্ণাঙ্গ একটি কঙ্কাল তৈরি করে দেন। কখনো কখনো বেওয়ারিশ গলিত লাশ থেকে বের করে নেওয়া হয় হাড়গোড়। তারপর গলিত মাংসের ভিতর বাঁশের কঞ্চি ভরে সেলাই করে দেওয়া হয়। সেসব লাশ কেউ পরীক্ষা করে দেখে না। গলিত লাশের কোনো স্বজন থাকলেও তারা তা পরীক্ষা করেন না। ফলে এসব লাশ থেকে হাড় চুরি করা তাদের জন্য খুবই সহজ। তিনি আরও জানান, সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে রাজশাহীর বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে কিছু মাদকসেবী লাশ চোর আছে। তারা কবরস্থান থেকে লাশের হাড়গোড় চুরি করে এনে ডোমদের হাতে দেয়। তবে সিংহভাগ কঙ্কাল আসে রাজশাহীর চর মাঝাড়দিয়াড় সীমান্ত পথে ভারত থেকে। এ গ্রামের উজ্জ্বল, সুকচান, আরিফুল, ফজলু, লিটন, মাজান, মুন, মুরোজা, শরিফুলসহ অন্তত ২০ জন চোরাকারবারি আছেন, যাদের কাজ শুধু কঙ্কাল আমদানি করা। এরপর তারাই রামেকের ডোমদের হাতে তা পৌঁছে দেন। মাঝাড়দিয়াড়ের সীমান্ত এলাকার ভারতীয় গ্রামগুলোর চোরাকারবারিরা ওই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষের হাড় সংগ্রহ করে এপারের চোরাকারবারিদের হাতে তুলে দেন। সূত্র আরও জানায়, রামেকের মর্গের ডোমেরা খণ্ড খণ্ড হাড় ও মাথার খুলি দিয়ে একেকটি পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল তৈরি করেন। তারপর চাহিদামতো এসব কঙ্কাল নিয়ে যান নগরীর লক্ষ্মীপুর কাঁচাবাজার এলাকার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক আলমগীর হোসেন, লক্ষ্মীপুর জিপিও এলাকার মামুন ওরফে কানা মামুন, ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী আবদুস সবুর, বারিন্দ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী রায়হান ও ওয়াহেদ এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ নেতা মিনহাজুল। তারা একেকটি কঙ্কাল ৪০-৫০ হাজার টাকায় বিভিন্ন বেসরকারি মেডিকেল কলেজে, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে এবং সায়েন্টিফিক দোকানে বিক্রি করেন। প্রতিটি কঙ্কালের কাজ করে দেওয়ার জন্য ডোমদের দেওয়া হয় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা।

up-arrow