Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২১ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:২৯
নব্য জেএমবির পরিকল্পনায় তাভেলা সিজার খুন : র‌্যাব
নিজস্ব প্রতিবেদক

ইতালির নাগরিক তাভেলা সিজারকে হত্যা করেছে জঙ্গিরা। নব্য জেএমবির প্রধান সমন্বয়ক শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ ওরফে সারোয়ার জাহান ওরফে আবদুর রহমানের  নেতৃত্বে এ  জঙ্গি হামলা পরিচালনা হয়। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের নতুন মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। বলা হয়, গত বছর ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় গুলশান-২ এর ৯০ নম্বর সড়কে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন ইতালির নাগরিক ও নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিসিওবিডির কর্মকর্তা তাবেলা সিজার। এ ঘটনায় করা মামলায় গত ২৫ আগস্ট ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার এম এ কাইয়ুম, তার ভাই আবদুল মতিনসহ সাতজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। চার্জশিটভুক্ত অন্য আসামি হলেন— তামজিদ আহমেদ ওরফে রুবেল ওরফে শুটার রুবেল, রাসেল চৌধুরী ওরফে চাকতি রাসেল, সোহেল ওরফে ভাঙ্গারি সোহেল, মিনহাজুল আরেফিন রাসেল ওরফে ভাগনে রাসেল ও শাখাওয়াত  হোসেন ওরফে শরিফ। এদের মধ্যে এম এ কাইয়ুম এবং সোহেল ওরফে ভাঙ্গারি সোহেল পলাতক রয়েছেন। গ্রেফতারকৃত পাঁচজন আদালতে হত্যার পরিকল্পনা ও হত্যায় সরাসরি অংশ নেওয়ার কথা জানিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এদিকে, ৮ অক্টোবর আশুলিয়ার একটি বাড়িতে র‌্যাবের জঙ্গিবিরোধী অভিযানে আবদুর রহমান পাঁচতলা বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিলে গুরুতর আহত হন। পরে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার বাড়িতে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে ৩০ লাখ টাকা, একটি পিস্তল, ২২ রাউন্ড গুলি, একটি মোবাইল জ্যামার, জিহাদি বই, জঙ্গি হামলার পরিকল্পনার পাঁচটি মানচিত্র ও বেশকিছু আলামত জব্দ করে। এসব আলামত র‌্যাব পরীক্ষা ও তদন্ত করে আবদুর রহমানের নব্য জেএমবির নেটওয়ার্কের সন্ধান পায়। গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী কানাডা প্রবাসী তামিম আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে দীর্ঘক্ষণ কথোপথনের তথ্যও বের করে র‌্যাব। এর আগে গত বছর ২৮ জুলাই নব্য জেএমবির কার্যক্রম চালানোর জন্য তামিম আহমেদ চৌধুরী ও আবদুর রহমানের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে তারা তাগুদি আইনের (মানুষ সৃষ্ট আইন) বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। নব্য জেএমবির প্রায় ৩০০ সক্রিয় সদস্য সারা দেশে টার্গেট কিলিংয়ে মেতে ওঠে। এদের মধ্যে গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর গুলশানে ইতালীয় নাগরিক তাবেলা সিজারকে প্রথম খুন করে। ওই বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ৭ জুলাই শোলাকিয়ায় ঈদগাহ ময়দানে জঙ্গি হামলার মধ্য দিয়ে তারা ২৩টি হামলার ঘটনা ঘটিয়ে প্রায় ৪০ জনকে হত্যা করে। অন্যদিকে, তাবেলা সিজারকে জঙ্গিরা হত্যা করেছে—র‌্যাবের এমন তথ্যের ভিত্তিতে বিএনপির পক্ষ থেকে এই মামলার চার্জশিট দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়েছে। বিএনপির বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন আমরা বারবার বলেছিলাম, বিদেশি নাগরিককে হত্যার সঙ্গে বিএনপি জড়িত নয়। এরপরও আওয়ামী লীগ বিএনপির দিকে আঙ্গুল তুলে অভিযোগ করেছিল। এতে বিদেশিদের কাছে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ জন্য আওয়ামী লীগের উচিত এ বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা। র‌্যাব এখন তদন্ত করে দেখতে পেয়েছে, ইতালীয় এই নাগরিককে জঙ্গিরা হত্যা করেছে। সে ক্ষেত্রে মামলার চার্জশিট থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীকে বাদ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানাচ্ছি।

আশুলিয়ায় নিহত রহমানই : ঢাকার আশুলিয়ায় র‌্যাবের অভিযানে নিহত আবদুর রহমানই ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কথিত বাংলাদেশ-প্রধান শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। র‌্যাব বলছে, এই আবদুর রহমানের প্রকৃত নাম সারোয়ার জাহান। ১৩ বছর ধরে সে জঙ্গি কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। নব্য জেএমবির শূরা সদস্যদের সিদ্ধান্তেই সে সংগঠনের আমিরের দায়িত্ব পালন করছিল। অন্যদিকে, এখনো ২১ জঙ্গি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাথাব্যথার কারণ, যদিও তাদের হাতে কিছু বিস্ফোরক ছাড়া বেশি কিছু নেই। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এলিট ফোর্স র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ এমনই দাবি করেন গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে। গত ৮ অক্টোবর আশুলিয়ার ঘটনার পর আবদুর রহমানের বাসা থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা, অস্ত্র-গোলাবারুদসহ সাংগঠনিক অনেক নথি উদ্ধার করে র‌্যাব। পরে তার পাসপোর্টের সূত্র ধরে র‌্যাব নিশ্চিত হয় আবদুর রহমানের এ পরিচয় ভুয়া। এ ঘটনার ১২ দিন পর র‌্যাব দাবি করল, এই আবদুর রহমানের প্রকৃত নাম সারোয়ার জাহান। তার গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার থুমরিভোজায়। র‌্যাব কর্মকর্তাদের দাবি, আশুলিয়ার বাসা থেকে উদ্ধার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে আবদুর রহমানকেই আইএসের কথিত বাংলাদেশ-প্রধান আবু ইব্রাহিম আল হানিফ বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘২০০৩ সালে এই আবদুর রহমান জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে পুলিশের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষ করেছিল। ওই সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং সে নয় মাস চার দিন কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পায়। এরপর দেড় মাস বাড়িতে থেকে ফের আত্মগোপনে চলে যায়। তার মানে প্রায় ১৩ বছর ধরে সে জঙ্গি কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিল। সারোয়ার ওরফে আবদুর রহমান ১৯৯৮ সালে বাড়ি ছেড়ে নাচোলে একটি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। দাওরা পাস করার পর জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ সে নব্য জেএমবি গঠন করে এবং আবু ইব্রাহিম আল হানিফ নামে এ সংগঠনের আমির হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ বিষয়ে কিছু নথিপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। নিজেকে আমির ঘোষণার একটি কাগজে আবু ইব্রাহিম অর্থাৎ আবদুর রহমান ও তামিম চৌধুরী স্বাক্ষর করে। ‘শেখ আবু’ তামিম চৌধুরীর সাংগঠনিক নাম।’

১৩ এপ্রিল আইএসের কথিত মুখপত্র ‘দাবিক’-এর ১৪তম সংখ্যায় আবু ইব্রাহিম আল হানিফের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সেখানে তাকে বাংলাদেশে আইএসের প্রধান বলে দাবি করা হয়।

র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, ‘এই আবু ইব্রাহিম ওরফে সারোয়ার জাহান ওরফে আবদুর রহমান ১৯৯৮ সালের পর থেকেই জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। সে ইংরেজি, আরবি ও উর্দু ভাষায় কথা বলতে পারদর্শী।’

তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাই ও শায়খ আবদুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার পর জেএমবি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালে নতুন ধারার ধর্মীয় উগ্রবাদের মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে পুরনো জেএমবি নব্য জেএমবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নব্য জেএমবি পরে সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পরিকল্পনা করে এবং একই সঙ্গে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।’

বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘একপর্যায়ে নব্য জেএমবির সাধারণ সদস্যরা আবদুর রহমানকে শূরা সদস্য পদে মনোনীত করে। পরে অন্য শূরা সদস্যরা তাকে নব্য জেএমবির আমির ঘোষণা করে এবং তার সাংগঠনিক নাম দেয় শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ।’

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, তারা আবদুর রহমানের আশুলিয়ার আস্তানা থেকে একাধিক চিঠি, মেইল ও খুদে বার্তা পেয়েছেন। কয়েকটি চিঠিতে আবদুর রহমান নিজেকে শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ নাম ব্যবহার করে স্বাক্ষর করেছে। এ ছাড়া তার কাছ থেকে নব্য জেএমবির আমির হিসেবে জঙ্গিবাদে ব্যবহূত অর্থ লেনদেনের কিছু হিসাবও পাওয়া গেছে। এসব নথিপত্র পর্যালোচনা করেই তারা নিশ্চিত হয়েছেন, আবদুর রহমানই আবু ইব্রাহিম। অভিযানের দুই দিন আগে ৬ অক্টোবরের সারোয়ার জাহানের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৩৩ জন নব্য জেএমবির নাম জানা গেছে। যদিও সেগুলো সাংকেতিক নাম। এ ৩৩ জনের মধ্যে ১২ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছে। বাকি ২১ জনকে আমরা খুঁজছি। এর মধ্যে তিনজন শূরা সদস্য।

সূত্র আরও বলছে, বর্তমানে তাদের কাছে একটি একে-২২ রাইফেল, ৫টি হ্যান্ডগান, ৩৩ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে। সে হিসাবে ৮ তারিখের অভিযানের পর বর্তমানে নব্য জেএমবির কাছে একে-২২ রাইফেল ও কোনো হ্যান্ডগান নেই। কারণ, গাজীপুর থেকে একটি একে-২২ রাইফেল ও ৫টি হ্যান্ডগান উদ্ধার করা হয়েছে।

 

র‌্যাব সূত্র জানায়, আবু ইব্রাহিমের নির্দেশে নব্য জেএমবির সদস্যরা ‘ইনগিমাস বা গুপ্ত হামলা’ শুরু করে। গত বছরের ৩০ আগস্ট চট্টগ্রামে মিরসরাইয়ে আওয়ামী লীগ নেতা ইমরানকে গুলি করে ৬০ লাখ টাকা ছিনতাই করে। ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের বাংলাবাজারে তারা ন্যাংটা বাবা ও তার এক সহযোগীকে হত্যা করে। মূলত এ দুটি অপারেশন সফলভাবে পরিচালিত হওয়ায় আবদুর রহমানকে নব্য জেএমবির শূরা সদস্যরা বাংলাদেশের নব্য জেএমবিতে বাইয়াত দেওয়ার জন্য অনুমতি দেয়।

র‌্যাব সূত্র আরও জানায়, উদ্ধারকৃত নথিপত্রে নব্য জেএমবির সদস্যরা বাংলাদেশে দাওয়াত, ইলম ও তাজকিয়া, ইয়ানত, ইদাদ গ্রুপ, রিবা ও কিসাক/ফিতনা নিরোধন ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করত বলে জানা গেছে।

প্রথম দুই সফল অপারেশনের পর আবদুর রহমানের নির্দেশক্রমে নব্য জেএমবির সদস্যরা বিদেশি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর হামলার পরিকল্পনা করে। বিশেষ করে গুলশান, বনানী, বারিধারায় বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করে। এ ছাড়া মন্দির, হোসনি দালান, শিয়া মসজিদসহ তাদের ভাষায় তাগুতের সৈনিক র‌্যাব, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী ও ব্লগার নাস্তিকদের যেখানে পাওয়া যাবে, সেখানেই আক্রমণের পরিকল্পনা করে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, গত বৃহস্পতিবার আবদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নাফিস আহমেদ নয়ন (২৮) ও হাসিবুল হাসানকে (৪৮) রাজধানীর মতিঝিল থেকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ২৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে ৮ অক্টোবর আবদুর রহমানের আশুলিয়ার আস্তানা থেকে নব্য জেএমবির ৩০ লাখ টাকা, গুলিভর্তি একটি বিদেশি পিস্তল, অত্যাধুনিক মোবাইল জ্যামার, অনেক ধারালো ছুরি, চাপাতি, জিহাদি বই, কম্পিউটার সিপিইউ, ওয়াটারপ্রুফ ক্যামেরা উদ্ধার করা হয়েছে। হাসিবুল হাসান রাজশাহী গণপূর্ত অধিদফতরের একজন প্রকৌশলী। তার বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামে। আর নাফিস আহমেদ নয়নের বাড়ি রাজশাহীর বোয়ালিয়া উপজেলায়। র‌্যাবের দাবি, এরা দুজনই নব্য জেএমবির সদস্য এবং আবদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল। এরা নব্য জেএমবির অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ছিল।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow