Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৬ জানুয়ারি, ২০১৭ ২২:৫৭
থানায় যুবককে উল্টো ঝুলিয়ে রাখা ছবিতে তোলপাড়
নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর
থানায় যুবককে উল্টো ঝুলিয়ে রাখা ছবিতে তোলপাড়

থানা ভবনের ভিতরে উল্টো করে ঝুলানো এক যুবকের ছবি নিয়ে যশোরে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়, পরে কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে এবং দৈনিক পত্রিকায় এ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।

এসব রিপোর্টে বলা হয়, আবু সাঈদ নামের ওই যুবককে প্রথমে আটকের পর তার কাছে দুই লাখ টাকা ঘুষ দাবি করে না পাওয়ায় দুই টেবিলের মাঝে তাকে ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হয়। স্বজনরা ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইলিয়াস হোসেন গতকাল দুপুরে যশোর প্রেসক্লাবে এসে সাংবাদিকদের বলেন, “ছবিটি ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশের পক্ষ থেকে আবু সাঈদের সঙ্গে আমরাও যোগাযোগের চেষ্টা করি। পুলিশ সুপার আনিসুর রহমানও ঘটনাটি সম্পর্কে জেনেছেন। তিনি ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহীদ মো. আবু সরোয়ার এবং এএসপি ‘ক’ সার্কেল নাইমুর রহমানের সমন্বয়ে দুসদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ” ওসি বলেন, ‘পুলিশ সুপার যশোর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সম্পাদককে অনুরোধ করেছেন, অভিযোগটি মিথ্যা প্রমাণিত হলে যে বা যারা ওই ছবিসহ সংবাদ প্রকাশ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ’ এদিকে যার ওপর নির্যাতন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, সেই আবু সাঈদও নির্যাতনের কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে, তিনি আমার চেয়ে মোটা। ওই দিন পুলিশ আমাকে লুঙ্গি পরা অবস্থায় আটক করেছিল। ছবিতে যে জিন্স বা টি-শার্ট পরা দেখা যাচ্ছে, ওই ধরনের পোশাক আমার নেই। ’ তাকে নির্যাতন করা হয়নি—এটা প্রমাণের জন্য তিনি তার হাত ও শরীরের পেছনের অংশ সাংবাদিকদের দেখান। আবু সাঈদ বলেন, ‘বুধবার রাতে আমার নিজ এলাকা তালবাড়িয়া থেকে পুলিশের একটি দল সাদা মাইক্রোবাসে করে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। পরে থানায় নিয়ে আমার কাছে জানতে চায়, আমি দুই নম্বরি ব্যবসা করি কিনা। আমি ওইসব দুই নম্বরি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নই। তাই পরদিন রাত ৮টার দিকে পুলিশ আমাকে ছেড়ে দেয়। আমার ওপর কোনো নির্যাতন করা হয়নি। ’ সাঈদের এলাকার লোকজন জানান, ৪ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে তালবাড়িয়া কলেজপাড়া থেকে সাঈদকে ধরে নিয়ে যায় সাদা পোশাকের পুলিশ। সাঈদের বড়ভাই আতিয়ার রহমান বলেন, ‘বুধবার রাতে আমার ভাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকায় পুলিশ তাকে ছেড়ে দিয়েছে। পুলিশ কোনো টাকা নেয়নি, এমনকি তাকে মারধরও করেনি। ’ সাঈদের স্ত্রী বিলকিস খাতুন দাবি করেন, ‘ফেসবুকে এবং পত্রিকায় উল্টো করে ঝুলানো যে ব্যক্তির ছবি দেখা যাচ্ছে, সেটি তার স্বামীর নয়। ’ একই দাবি করেন সাঈদের ছোটভাই আশিকুর রহমান। স্থানীয় ইউপি সদস্য (নওয়াপাড়া ইউনিয়ন, ৯ নং ওয়ার্ড) আসমত আলী চাকলাদার বলেন, ‘বুধবার রাতে পুলিশ সাঈদকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ৪৯ বা ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে সাঈদ ছাড়া পেয়েছে বলে শুনেছি। ’ আসমত আলী আরও বলেন, ‘সাঈদের বিরুদ্ধে এলাকায় ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। আগে সে ফেনসিডিল ব্যবসা করত বলেও অভিযোগ আছে। ’ আসমত মনে করেন, উল্টো করে ঝুলানো ছবিটি সাঈদেরই। সাঈদ নেশা করে, তবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিনা তা জানেন না বলে বলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজুর রহমান ও কামরুল ইসলাম। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন জানান, ‘শুক্রবার সকালে সাংবাদিকরা সাঈদের গ্রামে পৌঁছার আগেই সেখানে পুলিশ গিয়েছিল। তারা সাঈদের বাড়িতেও গিয়েছিলেন। ভয়ে এখন ওই বাড়ির লোকজন সত্য কথা বলছেন না। ’ এদিকে সাঈদকে আটক ও নির্যাতনের ব্যাপারে যে দুই পুলিশ অফিসারের নাম এসেছে, তাদের একজন এসআই নাজমুল হোসেন বৃহস্পতিবার রাতে সাংবাদিকদের বলেন, গত দুই দিন ধরে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। সাঈদ নামে কাউকে আটক বা চাঁদা আদায়ের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। আরেক পুলিশ অফিসার হাদিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। সাংবাদিকদের ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। কোতোয়ালি থানার ওসিও বলেন, একটি মামলায় সাক্ষ্য দিয়ে সিসি নিয়েই ঢাকায় অবস্থান করছেন এসআই নাজমুল হোসেন। তার বিরুদ্ধে করা এ অভিযোগ সত্য নয়।

ছবিটি তাহলে কার? : দুই টেবিলের মাঝে উল্টো করে ঝুলানো যুবক যদি আবু সাঈদ নাই হন, তাহলে ছবির মানুষটি কে—তা নিয়ে বিভ্রান্তি থেকেই যাচ্ছে। যে ছবিটি ভাইরাল হয়েছে, তাতে ওই নির্যাতিত ব্যক্তির পুরো শরীর দেখা গেলেও চেহারা দেখা যাচ্ছে না। ছবি দেখে এটাও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না যে ছবির ওই ব্যক্তিই আবু সাঈদ। আবার থানায় যাদের নিয়মিত যাতায়াত, তাদের অনেকেই বলছেন, ছবিটি কোতোয়ালি থানার ভেতর থেকেই তোলা বলে মনে হচ্ছে। যদিও কোতোয়ালি থানার ওসি মো. ইলিয়াস হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ‘ভাইরাল হওয়া ছবির সঙ্গে আমার থানার ঘরগুলো মিলিয়ে দেখেছি। কিন্তু ছবির সঙ্গে কোনো ঘরই মিলছে না। ’ এদিকে এ ঘটনার পর গতকাল সকাল থেকে যশোর কোতোয়ালি থানায় সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিকরা। ’

এই পাতার আরো খবর
up-arrow