Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, সোমবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১২ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ জানুয়ারি, ২০১৭ ২২:৫৬
চ্যালেঞ্জ প্রাপ্তি স্বস্তিতে সরকার
রফিকুল ইসলাম রনি

বন্ধুর পথ পাড়ি দিলেও সাফল্য আর উন্নয়নের পতাকা উড়িয়েই আজ (১২ জানুয়ারি) ক্ষমতার তিন বছর পূর্ণ করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। টানা হরতাল আর অবরোধের মতো হিংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আজকের এই দিনে টানা দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করেন শেখ হাসিনা। সরকার পরিচালনায় বিগত দিনগুলোতে নানা প্রতিকূলতা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একের পর এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন। সরকারের গত তিন বছরে তার সাফল্যের পাল্লাই ভারী। তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থতা যে নেই  তা-ও অস্বীকার করা যাবে না। সরকারের তৃতীয় বর্ষপূর্তিতে যে বিষয়টি সর্বাগ্রে উঠে এসেছে তা হলো— দেশের রাজনীতির পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন শেখ হাসিনার হাতে। গত তিন বছরে সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল— নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা, বিদ্যুতের লোডশেডিং ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে নানা প্রকল্প গ্রহণ, খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত করা প্রভৃতি। এ ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানা সূচকের ইতিবাচক অগ্রগতি, জিডিপির প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, নিম্নমধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া, শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়নে নানা পদক্ষেপ গ্রহণও ছিল বিগত সময়ে সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য। রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের এখন একক আধিপত্য। স্থানীয় সরকারেও দলটি নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। সরকার পতনের আন্দোলন থেকে সরে এসে বিএনপির আলোচনার প্রস্তাব, দলীয় প্রতীকে ইউপি, পৌরসভা ও সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলটি অংশগ্রহণ করায় সরকারের জন্য ইতিবাচক হয়েছে।

তবে কিছু মন্ত্রীর অতিকথনে দলে অস্বস্তি আছে। কিছু এলাকায় এমপি-মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় দখলদারিত্বের কারণে নানা মহলে দল ও সরকারের সমালোচনা হয়েছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের একশ্রেণির নেতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই এ জন্য সরকারকে দুর্নামের দায় নিতে হয়েছে। অবশ্য নানা অপরাধের কারণে দলের কেউ কেউ গ্রেফতার হয়েছেন, দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াতকে এখনো নিষিদ্ধ করতে না পারা সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে নানা মহলে। সরকারের তিন বছর সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. এ কে আজাদ চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে রয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীর আগেই আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব। তিনি বলেন, ক্ষুধা-দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনীতি ও সামাজিক অগ্রগতিতে দেশ অনেক বেশি অগ্রসর হয়েছে, যা সারা বিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছে। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি প্রসঙ্গে এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, প্রাপ্তি যখন বেশি হয়, প্রত্যাশাও তখন বেড়ে যায়। অতীতের যেসব ঘাটতি আছে, সেগুলো পূরণ করে আগামীতে আরও বেশি উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হবে সরকার— এমন প্রত্যাশা সবার।    

যোগাযোগ খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন : যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে আশার আলো জাগাচ্ছে ছয় মেগা প্রকল্প। এর মধ্যে পদ্মা সেতুসহ একাধিক প্রকল্পের অগ্রগতি সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক। পদ্মা সেতুর প্রায় ৪০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। এ বছর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ। গত বছরের ২৬ জুন যোগাযোগ খাতের দুটি বড় প্রকল্প মেট্রোরেল ও বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ছয় ফেজের মেট্রো রেলের কাজের মধ্যে দুটির টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে কাজও শুরু হয়ে গেছে। বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক। নির্মাণ কাজের উদ্বোধনের অপেক্ষা কর্ণফুলী টানেলের। ২০১৮ সালের মধ্যেই রাজধানীতে উড়ালসড়ক (এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) দিয়ে গাড়ি চলাচল সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের মহাসড়কের পাশে আরেকটি এক্সপ্রেসওয়ে বা নতুন সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ এক্সপ্রেসওয়েতে প্রতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চলবে। ফলে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছানো সম্ভব।

যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি : সরকারের গর্ব করার মতো সাফল্যের পুরোভাগে রয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির রায় কার্যকর করা। দেশি-বিদেশি সব চক্রান্ত ব্যর্থ করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা চৌধুরী), কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মীর কাসেম আলী, আবদুল কাদের মোল্লা, মতিউর রহমান নিজামীর মতো যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

জঙ্গি দমনে সফলতা ও হলি আর্টিজান ট্র্যাজেডি : গত বছরের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা ঢুকে ২০ জিম্মিকে হত্যা করে। পরে সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’-এ ছয় জঙ্গি নিহত হয়। এ ঘটনায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। এর কয়েক দিন পর কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদগাহ ময়দানে জঙ্গি হামলায় এক পুলিশ সদস্য মারা যান। পরপর দুটি ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় মেজর জাহিদ, তামিম, মারজান, সাদ্দামসহ জেএমবির শীর্ষ নেতারা নিহত হন। এ ছাড়া অনেক জঙ্গির পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে।

কূটনৈতিক অঙ্গনে শেখ হাসিনার সাফল্য : গত তিন বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কূটনৈতিক তৎপরতায় একে একে ঢাকা সফর করেছেন প্রভাবশালী বিদেশি রাষ্ট্র নেতারা। গত বছর ঐতিহাসিক সফরে এসেছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ সফরে এসে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে গেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। এর আগে ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর ছিল তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। নরেন্দ্র মোদির সফরের মধ্য দিয়ে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হওয়ায় ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানে নতুন মাইলফলক তৈরি করেছে। ফলে ৬৮ বছর পর ছিটমহল বিনিময়ে দুই দেশের আবদ্ধ মানুষের দুঃসহ যন্ত্রণা শেষ হয়। তবে তিস্তা চুক্তি না হওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কের বিষফোঁড়ার যন্ত্রণা থেকেই গেছে। প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল নেতৃত্বে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বেড়েছে। নির্বাচন, গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে মতভেদ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। ভারত ও চীনের সঙ্গে সখ্য বেড়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক জোট সমর্থন দেওয়ায় সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় কার্যকরের পর বিবৃতি, জাল মুদ্রা পাচার ও জঙ্গি অর্থায়ন নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে শীতল সম্পর্কের বিষয়টি সবাই সমর্থন করেছেন। শেখ হাসিনা বেশ কিছু আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়ে দেশকে সম্মানিত করেছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক সাময়িকী ফরেন পলিসির বিশ্বের ১০০ চিন্তাবিদের তালিকায় নাম আসে শেখ হাসিনার। তিনি ওই তালিকায় সিদ্ধান্ত প্রণেতা ক্যাটাগরিতে শীর্ষ ১৩ জনের মধ্যে ছিলেন।

মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে যত অভিযোগ : কয়েকজন এমপির দখল-বাণিজ্যসহ কয়েকটি ঘটনা বিতর্কের জন্ম দেয়। এ ক্ষেত্রে একাধিক মন্ত্রীর নামও আসে। ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয় তার অফিসের একজন কর্মকর্তার কক্ষ ভাঙচুর করে আলোচনার শিরোনাম হয়েছেন। এমপি পিনু খানের ছেলে রনির বিরুদ্ধে দুজনকে খুন করার অভিযোগ উঠেছে। অবশ্য দ্রুততম সময়ে ওই জোড়া খুনের চার্জশিট দিয়ে প্রশংসিত হয়েছে সরকার। টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হত্যায় জেলে রয়েছেন সরকারদলীয় এমপি আমানুর রহমান রানা। অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে গত বছর জেলে যেতে হয়েছিল সরকারদলীয় আরেক এমপি আবদুর রহমান বদিকে। এ ছাড়া বিচার বিভাগ নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্যে আদালতের নির্দেশে জরিমানা গুনতে হয়েছে দুই মন্ত্রীকে।

স্বস্তিতে সংগঠন : রাজপথে বিরোধী দলবিহীন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে স্বস্তিতে ছিল আওয়ামী লীগ। ফলে তৃণমূল আওয়ামী লীগ এখন অনেক বেশি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ। তবে গত বছরের শেষ দিন অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর গাইবান্ধা-১ আসনের সরকারদলীয় এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow