Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০
স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় লড়েছিল অনেক বাংলাদেশি
শিমুল মাহমুদ, বৈরুত (লেবানন) থেকে

কিংবদন্তির ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত যখন ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন আবাসভূমি গড়ার সংগ্রামে লিপ্ত তখন সেই সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশি অনেক যুবক। তারা লেবাননে অবস্থান নিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিনের পক্ষে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধে অংশ নেন। মারা যান শতাধিক। কয়েকজনের কবর রয়েছে লেবাননে। জীবিতদের অনেকেই পরে পাড়ি জমিয়েছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। যুদ্ধে অংশ নেওয়া কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে তাদের অসীম সাহসিকতার কথা জানা যায়।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন ইসমাইল চৌধুরী আকরাম (৬২)। বাড়ি সিলেটের জকিগঞ্জে। ১৯৭৮ সালের শেষদিকে বাংলাদেশ থেকে এসে লেবাননে ইরান দূতাবাসে ওঠেন তিনি। সেখান থেকে যোগাযোগ হয় ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) সঙ্গে। পরের বছরই যোগ দেন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। এ সময় তার বাংলাদেশি সহযোদ্ধা ছিলেন আরও পাঁচ শতাধিক যুবক। লেবাননের বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাসে কমিউনিটি সমাবেশে স্বাধীন ফিলিস্তিনের জন্য যুদ্ধ করা তিন যোদ্ধাকে খবর দেওয়া হয়েছিল। আকরাম ছাড়াও তাদের মধ্যে অন্য দুজন হলেন, ফেনীর দাগনভূঁঞার মোহাম্মদ উল্লাহ দুলাল (৫৮) ও সিলেটের দুরা মিয়া (৫৭)। ইসমাইল চৌধুরী আকরাম বললেন, বাংলাদেশের পাঁচ শতাধিক যোদ্ধার মধ্যে শতাধিক মারা গেছেন যুদ্ধে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবেই তাদের মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, যুদ্ধে আত্মরক্ষার কৌশল জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভালো ট্রেনিং থাকলে আমাদের এত লোক মারা যেত না।

পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে দেখা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে আকরাম গর্বের সঙ্গে বলেন, অনেকবার দেখা হয়েছিল। নিজের হাতে কফি বানিয়ে উনাকে খাওয়াইছি। একবার একসঙ্গে বসে কফি খেয়েছি। উনি বাংলাদেশের মানুষকে অনেক ভালোবাসতেন। লেবাননে আকরামের কেউ নেই। বিয়ে করে সংসার শুরু করারও সময় পাননি। আকরাম বলেন, জীবন নিয়ে যে ফিরে আসতে পারব সেটা কল্পনাও করিনি। যুদ্ধ করে কী লাভ হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মুসলমানদের জন্য স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধে গিয়েছিলাম সেটা তো হয়েছে। দেশে যেতে ইচ্ছা করলেও যাওয়া হয় না তার। সিলেটে ভাই ও বোন আছেন। মাঝে মধ্যে যোগাযোগ হয়। বর্তমানে কাজ করছেন লেবাননের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেহরক্ষী হিসেবে, আরও তিনজনের সঙ্গে।

১৯৮২ সালে লেবাননে জাতিসংঘের বাহিনী মোতায়েনের পর ইসরায়েল লেবানন ছাড়তে শুরু করে। বাংলাদেশি যোদ্ধাদের অনেকেই শহীদ হন যুদ্ধে, অনেকেই ইসরায়েলের হাতে আটক হয়ে দীর্ঘদিন পর ছাড়া পান। তাদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন লেবাননেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছেন। এখনো খুঁজলে বৈরুতের কোনো গলিতে যুদ্ধের স্মৃতি ধারণ করা কোনো না কোনো বাংলাদেশি বৃদ্ধকে পাওয়া যেতে পারে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখে। পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাতকে বাংলাদেশের মানুষ মহান বন্ধুর মর্যাদা দিয়েছে। বাংলাদেশের স্থপতি রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছিল তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক। পরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার শাসনামলে ফিলিস্তিনিদের নেতা ইয়াসির আরাফাতকে অকুণ্ঠ সমর্থন অব্যাহত রাখেন। তিনি একাধিকবার রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় গিয়েছেন। অসংখ্যবার যাত্রা বিরতি করেছেন শাহজালাল বিমানবন্দরে। ইয়াসির আরাফাত ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে ঢাকায় যান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি স্তম্ভের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।

লেবাননের রাস্তায় ভিক্ষা করছে সিরীয় উদ্বাস্তুরা : লেবাননের রাস্তায় ভিক্ষা করছে প্রতিবেশী যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র সিরিয়ার উদ্বাস্তুরা। কেউ জুতা পালিশ করছে। কেউ ফুল বিক্রির নামে সাহায্য চাইছে। শীতের দুর্যোগপূর্ণ রাত কাটাচ্ছে লেবাননের রাস্তার পাশে। লেবানিজরা এটিকে বলে প্রকৃতির প্রতিশোধ। তাদের আশ্রয় দিলেও সাধারণ লেবানিজদের সহানুভূতি কম তাদের প্রতি। লেবানিজরা মনে করেন তাদের জনপ্রিয় নেতা রফিক হারিরিকে হত্যা করেছে সিরীয়রা।

২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি লেবাননের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি এক গাড়িবোমায় নিহত হন। তিনি ছিলেন পশ্চিমা সমর্থিত ১৪ অ্যালায়েন্সের নেতা। তার হত্যাকাণ্ডের জন্য কেউ সিরিয়াকে দায়ী করে। কারণ, তখনো লেবাননে সিরিয়ার কয়েক হাজার সৈন্য ও গোয়েন্দা অবস্থান করছিল। পরে এর জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, সিরিয়া ও লেবাননের কয়েকজন উচ্চপদস্থ নেতা এর সঙ্গে জড়িত। তখন পশ্চিমা বিশ্বের চাপে সিরিয়া লেবানন থেকে তার ১৫ হাজার সৈন্য সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরিকে বলা হয় আধুনিক লেবাননের স্বপ্নদ্রষ্টা। তার দূরদর্শী কর্মতত্পরতার অনেক চিহ্ন লেবানন জুড়ে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow