Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:০৮
ক্ষোভে উত্তাল শাহজাদপুর
সাংবাদিক শিমুলের দাফন
আবদুস সামাদ সায়েম, সিরাজগঞ্জ
ক্ষোভে উত্তাল শাহজাদপুর

পুলিশের সামনে গুলি করে সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুলের হত্যাকারী পৌর মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা হালিমুল হক মিরু ও তার সহযোগীদের

ফাঁসির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে শাহজাদপুর। আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী, নিহতের স্বজনরাসহ হাজারও জনতা শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র মিরুর ফাঁসির দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।

গতকাল জানাজার আগে বিভিন্ন এলাকা থেকে আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতা-কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মিছিল করেছে। এ ছাড়া শাহজাদপুরবাসী দোকানপাট-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে গতকাল শান্তিপূর্ণভাবে অর্ধদিবস হরতাল পালন করেছেন। অন্যদিকে বিক্ষোভ মিছিল করে অবিলম্বে মেয়র মিরুকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, টেন্ডার হলেও পৌরসভার একটি রাস্তার কাজ মেয়রের লোকজন শুরু না করায় শাহজাদপুর কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বিজয় মাহমুদ প্রতিবাদ করেন। এর জের ধরে পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরু তার ছোট ভাই পিন্টু-মিন্টুর সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে বিজয়কে মেয়রের বাড়িতে তুলে এনে মারধর করে হাত-পা ভেঙে দেন। এ ঘটনার জের ধরে ছাত্রলীগ ও স্থানীয়রা মেয়রের বাড়িতে মিছিল নিয়ে গেলে মেয়র ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী মিছিলের ওপর ককটেল ও গুলি ছোড়ে। এ ঘটনার ছবি তোলার সময় মেয়র হালিমুল হক মিরু সাংবাদিক শিমুলকে লক্ষ্য করে শটগানের গুলি ছুড়লে তা তার চোখ ভেদ করে মাথায় ঢুকে যায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে বগুড়া ও পরে ঢাকায় নেওয়ার পথে শিমুল মারা যান। তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়েন শাহজাদপুরবাসী।

পুলিশের সামনেই গুলি চালান মেয়র : ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার ছাত্রলীগ নেতা বিজয়ের সহকর্মীরা মিছিল নিয়ে যখন মেয়রের বাড়ির সামনে যান, তখন পুলিশ সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অবস্থান করছিল। এ সময় পুলিশ মেয়রকে গুলি করতে বাধা দেয়। কিন্তু পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে মেয়র মিরু গুলি চালালে সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুলের মাথায় তা বিদ্ধ হয়। পরে মেয়র গুলির কথা অস্বীকার করেন। কিন্তু যখন তার বাসা থেকে শটগান ও ৪৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয় তখন মেয়র মিরু গুলি চালানোর বিষয়টি স্বীকার করেন। গতকাল সকালে সাংবাদিক শিমুলের জানাজার আগে উপস্থিত জনতার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শাহজাদপুর সার্কেল) আবুল হাসনাত এ কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ স্লোগান দিয়ে মেয়রকে ধিক্কার জানান। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল হাসনাত বলেন, মেয়র পলাতক রয়েছেন। তবে তাকে গ্রেফতারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে গ্রেফতার করা হবে বলে তিনি উপস্থিত জনতাকে আশ্বস্ত করেন।

দ্রুত বিচার আইনে মামলা গ্রহণের দাবি : কর্তব্যরত সাংবাদিকের মৃত্যু এবং শোকে তার নানির মৃত্যুকে হত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে মামলাটি দ্রুত বিচার আইনে গ্রহণের দাবি জানান স্থানীয় সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন। একই সঙ্গে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে দ্রুত হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন তিনি। এমপি বলেন, পৌর মেয়র মিরু ও তার ভাইয়েরা বিভিন্ন সময় শাহজাদপুরে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন। শাহজাদপুরে তারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চেয়েছেন। তাদের ভয়ে শাহজাদপুরবাসী মুখ খোলেননি। জনপ্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকের ওপর গুলির ঘটনাকে ন্যক্কারজনক উল্লেখ করে মিরুকে দল থেকে বহিষ্কারে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন এই সংসদ সদস্য। সাংবাদিক শিমুল হত্যার ন্যায়বিচারে প্রয়োজনে তার পরিবারকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করানোর ঘোষণা দেন তিনি। একই সময় সাবেক এমপি চয়ন ইসলামও পৌর মেয়র মিরু ও তার সহযোগীদের শাস্তি দাবি করেন।

হত্যাকারীর ফাঁসি চাইলেন দুই শিশুসন্তান : বাবার লাশের পাশে শিমুলের দুই সন্তান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। আর বড়দের মতো বারবার বলছিল, আমার বাবার হত্যাকারীর ফাঁসির চাই। তাদের আবেগভরা কণ্ঠ শুনে উপস্থিত সবার চোখে পানি এসে যায়। সেখান অবতারণা হয় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের।

অর্ধদিবস হরতাল পালিত: সাংবাদিক শিমুল হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে অর্ধদিবস হরতাল পালন করেছেন শাহজাদপুরবাসী। সকাল থেকেই পৌর শহরের বিভিন্ন মোড়ে টায়ার জ্বালিয়ে সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ছাত্রলীগ ও সাধারণ মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ব্যবসায়ীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতালে সাড়া দেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, একজন সৎ সাংবাদিককে মেয়র মিরু গুলি করে হত্যা করেছেন। জঘন্যতম এ ঘটনা শাহজাদপুরের কেউ মেনে নিতে পারছে না। তাই শাহজাদপুরের প্রত্যেক ব্যবসায়ী নিজ উদ্যোগে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে হরতাল পালন করছেন।

ক্ষোভ-বিক্ষোভ: সাংবাদিক শিমুলের হত্যার ঘটনা যেন শাহজাদপুরে কেউ মেনে নিতে পারছে না। জানাজা শুরুর এক ঘণ্টা আগেই বিভিন্ন মহল্লা থেকে ‘মেয়র মিরুর ফাঁসি চাই’ স্লোগানে জানাজা মাঠে উপস্থিত হতে থাকে সাধারণ মানুষ। শাহজাদপুর উপজেলা ছাত্রলীগও পৃথকভাবে বিক্ষোভ মিছিল করে। জানাজা শেষে সাংবাদিকরা কালো ব্যাজ ধারণ করে শাহজাদপুর পৌর শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেন। মিছিল শেষে শাহজাদপুর প্রেস ক্লাবের সামনে বক্তব্য রাখেন সিরাজগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফজল-এ-খোদা লিটন, সাবেক সভাপতি হারুন-অর-রশিদ খান হাসান, শাহজাদপুর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শফিকুজ্জামান শফি। এ সময় সাংবাদিক নেতারা দ্রুত আসামিকে গ্রেফতারের দাবি জানান। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা  করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তারা।

ছয় আসামি আটক : সাংবাদিক শিমুল হত্যার ঘটনায় স্ত্রী নুরুন্নাহার খাতুন বাদী হয়ে পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরুকে প্রধান আসামি করে ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এ মামলায় ইতিমধ্যে মেয়রের দুই ভাই পিন্টু-মিন্টু এবং তার প্রধান সহযোগী থানা আওয়ামী লীগের সদস্য কে এম নাসিরসহ ছয়জনকে আটক করেছে পুলিশ।

পোষ্যদের ভরণপোষণের দায়ভার নেবে কে: সাংবাদিক শিমুল ছিলেন সংসারের একমাত্র ভরসা। দুই সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে তার ছিল ছোট্ট সুখের সংসার। কিন্তু শিমুল মারা যাওয়ার পর তার দুই শিশুসন্তান ও স্ত্রীর ভরণপোষণ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন স্বজনরা। শিশু দুটিকে কে লেখাপড়া করাবে? কীভাবেইবা সংসার চলবে তাদের? এ অবস্থায় স্বজনরা সাংবাদিক শিমুলের অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।

শিমুলের মাথার মধ্যে গুলি ছিল: সাংবাদিক শিমুলের মাথার মধ্যে গোলাকৃতির একটি গুলি পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্ত শেষে  সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার আকরামুজ্জামান এ কথা জানিয়েছেন। আর গুলি মাথার মধ্যে থাকায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

দাফন সম্পন্ন: পৌর মেয়রের গুলিতে নিহত সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুলের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে তার নানি রোকেয়া বেগমের দাফনও সম্পন্ন হয়। গতকাল বেলা সাড়ে ১২টায় মাদলা-কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে মাদলা-কালিকাপুর কবরস্থানে শিমুলের লাশ দাফন করা হয়। এর আগে শাহজাদপুর পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন, সাবেক সংসদ সদস্য চয়ন ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল হাসনাত, উপজেলা চেয়ারম্যান আজাদ রহমান, নির্বাহী অফিসার মামুন আল রাজি, থানার ওসি রেজাউল হক, সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম, সমকালের যুগ্ম-বার্তা সম্পাদক তপন দাস, সিরাজগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফজল-এ-খোদা লিটন ও শিমুলের ছোট ভাই আজাদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। দুটি জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক নেতা ও সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে।

বিভিন্নস্থানে মানববন্ধন : দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর অনুযায়ী, সাংবাদিক শিমুল হত্যার প্রতিবাদে গতকাল টাঙ্গাইল, পঞ্চগড়, বাগেরহাট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নাটোর, দিনাজপুর, কিশোরগঞ্জ, নওগাঁ, ময়মনসিংহের ভালুকা, রাঙামাটি, সিলেট, রংপুর, বান্দরবান, বরিশালে মানববন্ধন করা হয়। সাংবাদিক, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এসব মানববন্ধন থেকে সাংবাদিক হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করা হয়।

up-arrow