Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:১১

আ-মরি বাংলা ভাষা

ছাড় দেওয়া যাবে না

শামীম আজাদ

ছাড় দেওয়া যাবে না

যে কোনো আন্দোলন, যুদ্ধ, সংগ্রাম, সাধনা বা অধ্যবসায়ের ফলের অনুষঙ্গেই গোপনে এগিয়ে আসতে থাকে নানান আশঙ্কাও। সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী ছাড়া অন্যরা জয়ের ধারা ও সমঝোতার উপসর্গ পর্যালোচনা করে তখনই বিজয়ানন্দ উপভোগ করার সময়, থিতু হয়ে বসবার আগেই সেসব জানান দিতে থাকে। যেমন পাকিস্তান হওয়ার সূচনাকালেই রাষ্ট্রভাষা সিদ্ধান্তে রাজনীতিকদের জন্য একটি সংকট প্রশ্ন এগিয়ে আসছে তা নিয়ে লিখেছিলেন সাংবাদিক আবদুল হক, মাহবুব জামাল জাহেদী প্রমুখ। তখন এমন একটি রাষ্ট্র হচ্ছে যেখানে ধর্মীয়ভাবে সামঞ্জস্য থাকলেও ভাষাগত নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা ও রাজনৈতিক এলিট নেতাদের ভাষা এক নয়। এক নয় বলেই পাকিস্তান নামে যে ধর্মভিত্তিক নতুন রাষ্ট্র হচ্ছে তার ভাষা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলা হওয়া উচিত এবং তা নিয়ে নেতাদের ভাবা উচিত। তো সেসব আশঙ্কা নিয়েই দেশ হলো এবং সে দেশে জিন্না গংরা বিজয়ীর আনন্দ উপভোগ করার আগেই পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো তাদের জন্য এক উপদ্রব। যে কোনো লড়াই হোক, বিজয়ের পরপরই কিছু মৌলিক সিদ্ধান্তে জনমনের প্রধান প্রধান আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন না থাকলে শাসক শ্রেণির কৌশলে পাল্টা পিঠেই গজাতে থাকে নিগৃহীতের আন্দোলনের বীজ। তার উত্থানের উৎস। এটাই স্বাভাবিক। এটাই হয়েছিল এবং পাকিস্তান হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যেই ভাষার জন্য প্রাণ দিল ছাত্র-জনতা, হলো ভাষা আন্দোলন।

ভাষা আন্দোলন যখন দানা বেঁধে উঠছে তখন ১৯৫১ সালে কবি জীবনানন্দ দাশ দেশ পত্রিকায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। পূর্ব বাংলার বরিশালের কবির সেই প্রবন্ধের বিষয় ছিল সেই ভূখণ্ডের প্রান্তজনের ভাষা। আশঙ্কাভরা মনে তিনি দুটি দিক তুলে ধরেছিলেন। সে দুটি দিক পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার মানুষের বাংলা ভাষা নিয়ে। কারণ দুই ভূখণ্ডে উপভাষা বাংলাই প্রধান ভাষা থাকলেও একটি ক্রমে হিন্দি এবং অন্যটি উর্দু দ্বারা তাড়িত হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে ভারতে তার সে আশঙ্কা অনেক আগেই বাস্তব হয়েছে। আর পূর্ববঙ্গে? এখানে পাকিস্তানই আর থাকেনি। ভাষিক অনুপ্রেরণাই রক্তত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছে সেখানের মানুষকে এবং বাংলাদেশ নামে নতুন এক দেশের জন্ম হয়েছে। তারও হয়ে গেছে প্রায় পঞ্চাশ বছর। এই সময়ের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় আদান-প্রদানে ভারতের অনমনীয় মনোভাবের কারণে এখানে বাজার হারিয়ে সেখানেই বরং বাংলা সাহিত্যের প্রসার বেগ পেতে লাগল; যা টিকে থাকল তা বাংলাদেশেরই কারণে। এখানে নানান সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আয়োজন ও অনুষ্ঠানে ভারতের বাংলা ভাষার কবি-সাহিত্যিকদের ব্যাপক আগমন হতেই থাকল। ক্রমে ক্রমে হিন্দি সংস্কৃতি ও ভাষার আগ্রাসন হতেই থাকল; কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের টিভি, বই, সিনেমার প্রবেশ হলো না। ফলে যা ঘটেছে তা আমরা সবাই এখন প্রত্যক্ষ করছি। বিশেষ করে বাংলাদেশের বিবাহ অনুষ্ঠান থেকে শাড়ি উঠে গেছে। বাংলা গান উবে গেছে। দ্বিতীয় ভাষা হয়ে উঠেছে হিন্দি। অন্যদিকে যে ধর্মের ধুয়া তুলে পাকিস্তান হয়েছিল, সেই শক্তিই বিশ্বরাজনীতির সুযোগে আচার-আচরণে, শিক্ষা কার্যক্রমে, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দেশটিকে পেছনে নিয়ে যেতে থাকল। বিশেষ করে ব্যাহত করতে থাকল বাঙালি বোধকেন্দ্রিক চিন্তা-চেতনাকে। ফলে বাংলা ভাষা, আমাদের জাতীয় ভাষা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। আইন করে কোনো মোক্ষলাভ হয় না যতক্ষণ না তা প্রয়োগ হচ্ছে। ভাষার ক্ষেত্রে প্রয়োগব্যবস্থার আওতায় পড়ে কিছু সংগঠন, প্রচারমাধ্যম, পড়াশোনা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা কারিকুলাম ও তার সহায়তা। এখন বোধকরি সহায়তার ব্যাপারটি এবং সহায়কের নিজস্ব এজেন্ডাই প্রধান হয়ে পড়েছে। এমনকি রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যাপারেও একই কথা। তাই এত বিশাল বাংলা ভাষাভাষীর ভাষায়ও বিকৃতি ধরছে। শুধু সতর্কতা নয়, দৃঢ় পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই সে আলামত পচন হয়ে গা খুলে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তাই ছাড় দেওয়া চলবে না কিছুতেই।

লেখক : লন্ডনপ্রবাসী কবি ও কথাসাহিত্যিক।


আপনার মন্তব্য