Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:১৬
আ-মরি বাংলা ভাষা
মানুষের ‘ভাষামুক্তি’ হোক
টোকন ঠাকুর
মানুষের ‘ভাষামুক্তি’ হোক

মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, মানুষ বসে আছে, মানুষ শুয়ে আছে, কিন্তু কেউ কারোর সঙ্গে কথা বলছে না— আজকের মানুষ এই দৃশ্য কল্পনা করতে পারবে? মানুষকে নির্বাক ভাবা যাবে আজকের পৃথিবীতে? ভাবা যাবে, মানুষ বচনবিহীন? বচনই তো ভাষা। অনেক মানুষের পৃথিবীতে ভাষাও অনেক।

জনপদের বৈচিত্র্যের সঙ্গে জনপদের মানুষের ভাষাও বৈচিত্র্যপূর্ণ। সেসব মিলেই পৃথিবী বহুল ভাষাময় এক গ্রহ। আদি থেকে এই গ্রহে কত ভাষা জন্মেছে আর কত ভাষা মরে গেছে বা কত ভাষাকে হত্যা করা হয়েছে, তার কোনো সঠিক হিসাব যে নেই— এ কথা অনুমান করতে ব্যাপক জ্ঞান লাগে না। মানুষই তার প্রয়োজনে ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করা শিখেছে। ভাষা দ্বারা মানুষকে শাসন করতেও সুবিধা হয়েছে শাসকবর্গের বা হচ্ছে এখনো বলে শাসনের চাকায় বহু ভাষা পিষ্ট হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক মানুষকে অর্থনৈতিক শাসনের জাঁতাকলে বেঁধে ফেলার মধ্য দিয়ে ভাষার মানীগুণী ব্রাহ্মণ্যবাদিতা চালু আছে। আর সম্পূর্ণ সে কারণেই নদীপাড়ের বাঙালিও ইংরেজি পড়তে চায়, ইংরেজি বলতে চায়। একটা গাধাও যখন ইংরেজি ভাষায় কথা বলে, মনে করা হয়— গাধাটা অনেক জ্ঞানী, বহুৎ জানে। কী এক ধারণা। ধর্মে ভাষার ব্যবহার বিশেষভাবেই লক্ষ্যযোগ্য। মোটা দাগে যদি হিবরু, আরবি বা সংস্কৃত ভাষার দিকে তাকাই, কী দেখব আমরা? সবই শাসনের প্রশ্ন, অর্থনৈতিক মুনাফার প্রশ্ন। ফলে কোনো না কোনোভাবে তা চাপিয়ে দেওয়ারও প্রশ্ন বটে! ব্যাপারটা চমস্কির ভাষায় ‘সম্মতি আদায়পূর্বক ধর্ষণের’ মতো। চলছে। সাধারণ মানুষ তার শিকার। কারণ, মুনাফা দেবে তো কোটি কোটি কনজুমার ওই সাধারণ মানুষই। যাদের ওপরে চেপে বসেছে রাষ্ট্র, পতাকা, মানচিত্র, মুদ্রা, কাঁটাতার, নানারকম গ্রন্থ, সংস্কৃতি। পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষের এই এক নিয়তি যে, তাদের খুব অল্প কিছু মানুষ শাসন-শোষণ করে যাচ্ছে। ভাষা সেখানে বড় কয়েকটি উপাদানের একটি তো অবশ্যই।

সম্মিলিত মানুষ তবু মুক্তির স্বপ্ন দেখে। মানুষ তার নিজের জন্মভাষাকে শাসকের ভাষার ডাস্টার থেকে রক্ষায় একদিন রুখে দাঁড়ায়। রক্তপ্রাণ যায়। ভাষার জন্য ইতিহাস তৈরি হয়। আগ্রাসী ভাষার ছোবল থেকে নিজের ভাষাকে রক্ষায় লড়াই করে যেতে হয়। একদিন বাংলা ভাষা রক্ষার দাবিটিও রক্ষাক্ত হয়েছিল ঢাকায় বা বরাক উপত্যকায়। বাংলা প্রতিষ্ঠা পেল। তারপর আজ, আজকের প্রশ্ন : বাংলা ভাষাও কি কোনো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষাকে খেয়ে ফেলছে? বাংলা ভাষাও কি শাসনের ভাষা হয়ে উঠছে? যে বাংলা রক্তপ্রাণ দিয়ে উর্দু ভাষার বিপরীতে প্রতিষ্ঠিত পৃথিবীতে, সেই বাংলাও ইংরেজির শিকার নয়? হিন্দির শিকার নয়? বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের রায় ও সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতনদের কাছে কি বাংলা গৃহীত হয়েছে? কোনো কিছুই যেন খুব মীমাংসিত নয়। মীমাংসা হবে না?

প্রতিটি মানুষের ভাষামুক্তি হোক অর্থাৎ অর্থনৈতিক মুক্তি হোক— যদি হতো!

লেখক : কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow