Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:১৮
ওরা ভয়ঙ্কর কিলার গ্রুপ
শিশু অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় । না পেলে হত্যা, লাশ গুম । অর্ধশতাধিক রোমহর্ষক অপরাধ । লাশের সন্ধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
সাখাওয়াত কাওসার
ওরা ভয়ঙ্কর কিলার গ্রুপ

নিষ্ঠুর, নৃশংস। রীতিমতো গা শিউরে ওঠা কাহিনী।

নিষ্পাপ শিশুদের পেট কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিতেও এতটুকু হাত কাঁপে না তাদের। কোমলমতি শিশুদের অপহরণের পর চাহিদা অনুযায়ী মুক্তিপণ না পেলে বিদেশে পাচার করে দেয় ওরা। দেশময় ছড়িয়ে আছে ভয়ঙ্কর শিশু অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা। বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার আন্তর্জাতিক অপহরণকারী চক্রের ছয় সদস্যের জবানিতে বেরিয়ে আসছে রোমহর্ষক, হৃদয়বিদারক এসব কাহিনী। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন নারী সদস্যও। দুই বছর ধরে অন্তত ২০ শিশুকে অপহরণের কথা স্বীকার করেছেন তারা। তবে র‌্যাব কর্মকর্তাদের ধারণা, চক্রটি অর্ধশতাধিক শিশুকে অপহরণ ও খুনের সঙ্গে জড়িত।

তদন্ত সূত্র বলছে, গ্রেফতারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, তারা সংঘবদ্ধ শিশু অপহরণ ও পাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্য। শিশু অপহরণের উদ্দেশ্যে যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, নারায়ণগঞ্জ, চিটাগং রোডের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, কমলাপুর রেলস্টেশন এবং ঢাকা সদরঘাট এলাকায় এরা ছদ্মবেশে মাইক্রোবাসে ঘুরে বেড়ান। সুযোগ বুঝে জনসমাগম এলাকায় কোনো শিশু পরিবার থেকে সামান্য বিচ্ছিন্ন হতে দেখলেই সেই শিশুকে ছো মেরে মাইক্রোবাসে তুলে নেন। মুহূর্তেই ওই শিশুর শরীরে চেতনানাশক ওষুধ প্রয়োগ করেন। অজ্ঞান হয়ে পড়ে শিশুটি। পরে তাদের আস্তানায় নিয়ে ওই শিশুকে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করেন। আবার অনেক শিশুর পাসপোর্ট করে অসুস্থতার কাগজপত্র সংগ্রহ করে বিদেশে চিকিৎসার কারণ দেখিয়ে নিয়ে যান কিংবা শিশুকে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্রেনওয়াশ করে পাচারের জন্য বিদেশে নিয়ে যান। প্রতি শিশুর জন্য তারা ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পেয়ে থাকেন। র‌্যাব সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২৭ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায়  বাড়ির সামনের রাস্তায় সকাল ৯টার দিকে হাঁটাহাঁটি করছিল আট বছরের ছেলে মো. বায়েজিদ। ওই রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিল অপহরণকারীদের মাইক্রোবাস। বায়েজিদের মুখে চেতনানাশক দ্রব্যমিশ্রিত রুমাল চেপে ধরে ছো মেরে গাড়িতে উঠিয়ে নেন তারা। পরে বায়েজিদকে নিয়ে যান গ্রেফতারকৃত জাকিরের সিদ্ধিরগঞ্জ নিমাই কাশারীর বাড়িতে। এরপর অপহরণকারীরা তার পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে বলেন, মুক্তিপণ না দিলে ওই শিশুকে মেরে ফেলবেন। একপর‌্যায়ে ৮ জানুয়ারি তার বাবা মো. ডালিম বন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। নম্বর-৩৭১। একই সঙ্গে এ বিষয়টি র‌্যাব-১১-কে জানান তিনি। সর্বশেষ ৭ ফেব্রুয়ারি র‌্যাবের একাধিক টিম রাজধানীর সায়েদাবাদ, চিটাগং রোড এবং নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে অপহরণকারী চক্রের দলনেতা জাকির হোসেনসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করে তিন রাউন্ড গুলি, একটি ম্যাগাজিনসহ একটি পিস্তল, দুটি চাকু, একটি চাপাতি, ১ হাজার ২০ পিস ইয়াবা, অপহূত শিশুদের অজ্ঞান করার জন্য ব্যবহূত ২৫টি চেতনানাশক ইনজেকশন, ১৪টি সিরিঞ্জ ও ১৭টি মোবাইল ফোন সেট। গ্রেফতার অন্যরা হলেন জাকিরের স্ত্রী মর্জিনা বেগম ওরফে বানেছা, মোহাম্মদ হোসেন সাগর ওরফে বেলু ওরফে দেলু, টিটু, জেসমিন বেগম ও আসলাম আল আমিন। উদ্ধার হওয়ার আগ পর্যন্ত বায়েজিদকে জাকিরের বাড়িতেই চেতনানাশক ওষুধ দিয়ে রাখা হতো। র‌্যাব-১১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল কামরুল হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এরা সত্যিই পাষণ্ড। এ চক্রের ২০ থেকে ২৫ জন সদস্য রয়েছেন। গত দুই বছরে ১৭ জনকে অপহরণ করেছেন বলে তারা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন। এর মধ্যে দুই শিশুকে খুন করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন। মুক্তিপণ নিয়ে আট শিশুকে ছেড়ে দিয়েছেন। ছয়জনকে বিদেশে পাচার করেছেন। তিনি বলেন, ‘এ মামলাটির তদন্তভার নেওয়ার জন্য আমরা আবেদন করেছি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। পরে রিমান্ডে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আমরা মনে করছি। ’ তিনি জানান, অপহরণের কাজে ব্যবহূত মাইক্রোবাসের চালক কবীরও এই সিন্ডিকেটের সদস্য। তাকে গ্রেফতার কিংবা মাইক্রোবাসটিও জব্দ করা সম্ভব হয়নি।

জানা গেছে, অপহরণের পর কখনো কখনো মুক্তিপণ দেওয়ার পরও ভিকটিমকে হস্তান্তরের সময় ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে তারা শিশুদের হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলতেন। সাইনবোর্ড থেকে অপহূত শিশু আকাশ এবং নারায়ণগঞ্জের ভুলতা থেকে অপহূত শিশু নাজমুলকে পেট কেটে ইটের বস্তায় করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা ইতিমধ্যেই স্বীকার করেছেন গ্রেফতারকৃতরা। তারা বলেছেন, ওই দুই শিশুর শরীরে অতিরিক্ত মাত্রায় চেতনানাশক ওষুধ প্রয়োগের কারণে তাদের জ্ঞান ফিরছিল না। ধরা পড়ার ভয়ে তারা শিশু দুটির পেট কেটে কাঁচপুর ব্রিজসংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেন।

র‌্যাব সূত্র বলছে, এ চক্রটি অপহূত শিশুদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রির ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত রয়েছে বলে তাদের কাছে তথ্য এসেছে। সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য ওমানে অবস্থানকারী শাহাবুদ্দিনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে তারা শিশু পাচার করেন। এজন্য শাহাবুদ্দিনের বিশ্বস্ত মনির, জহির ও জেসমিনের কাছে শিশুদের হস্তান্তর করা হয়। এ চক্রের সদস্যরা সাধারণত নিজেদের পরিচিত ও আত্মীয়স্বজনকেই দলে ভেড়ান। তারা জল-স্থলসহ বিভিন্ন রুটে যাত্রীবেশে শিশুদের অপহরণ করেন।

জানা গেছে, মেহেদী হাসান (১১) নামের এক শিশুকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার জালকুড়ি থেকে অপহরণ করেন এ চক্রের সদস্যরা। মেহেদীর বাবা একজন ফেরিওয়ালা। তার কাছ থেকেও ১৫ হাজার টাকা নেন বলে এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন মেহেদীর বাবা মো. আলম।

৪ জানুয়ারি ঝালকাঠির ভাতকাঠি থেকে রাকিব হোসেন ইরান (৮) নামের এক শিশুকে অপহরণ করেন এ চক্রের সদস্যরা। পরে ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। তবে দরিদ্র গাড়িচালক বাবা আবদুল জলিল ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে মোটা অঙ্কের টাকা তাদের দিতে বাধ্য হন। মুক্তিপণ পেয়ে দুই দিন পর রাকিবকে তারা ছেড়ে দেন বলে জানিয়েছেন জলিল।

র‌্যাব বলছে, মুক্তিপণ নিয়ে যাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে আট শিশুর নাম জানা গেছে। তারা হলো বরিশালের মো. ইমন (১৩), ঝালকাঠির রাকিব হোসেন ইরান (৮), ভোলার আবু সুফিয়ান নিলয় (১৩), ফরিদপুরের রিয়াজুল কবির (১২), যাত্রাবাড়ীর অটিস্টিক শিশু সানি (৬), গাজীপুরের জুবায়ের ইসলাম (১৪), নাজমুল (১০) ও বরিশালের মেহেদী (১০)। বিদেশে পাচার করা হয়েছে এমন শিশুদের নাম পাওয়া গেলেও তাদের পুরো ঠিকানা গতকাল পর্যন্ত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-১১-এর অধিনায়ক। এরা হলো হৃদয় (৮), সুমন (৬), আনন্দ (৭), আল আমিন (৮), শুভ (৭) ও ইমন (১৪)।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow