Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : রবিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:১৯
নির্বাচনী জটিল অঙ্কে বিএনপি
শেখ হাসিনার অধীনেও যেতে চায় এক পক্ষ, অন্য অংশ বলছে ভরাডুবি নিশ্চিত, ভোট বর্জন করলে নিবন্ধন বাতিলের ঝুঁকি, খালেদার সাজা হলে কী হবে, আছে দল ভাঙা-গড়ার শঙ্কা
মাহমুদ আজহার
নির্বাচনী জটিল অঙ্কে বিএনপি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জটিল অঙ্কে বিএনপি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়ার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে দলটিতে।

দলের একাংশ মনে করছে, সুষ্ঠু ভোটের নিশ্চয়তা পেলে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনে যাওয়া উচিত। কোনো কারণে জয়ী না হলেও অন্ততপক্ষে শক্তিশালী বিরোধী দলে থাকা বর্তমান অবস্থানের চেয়ে ভালো। তবে দলের বড় অংশ বলছে, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ভরাডুবির চেয়ে না যাওয়াই ভালো।

এদিকে দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাজা হলে কী হবে, তা নিয়েও চিন্তার শেষ নেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের। লন্ডনে অবস্থান নেওয়া দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। তার বিরুদ্ধে ২১ আগস্টসহ অর্ধশত মামলা বিচারাধীন। আগামী নির্বাচনে তার অংশগ্রহণ অনিশ্চিত। জিয়া পরিবারের অনুপস্থিতিতে দল ভাঙা-গড়ার শঙ্কাও আছে।

সংসদ নির্বাচন বর্জন করলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিলের ঝুঁকি তো আছেই। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়া এটাই নতুন নয়। তিনি এর আগেও জেলে গেছেন। কিন্তু দুর্নীতির যে দুই মামলা তড়িঘড়ি করে চলছে, তা একটি মিথ্যা অভিযোগের মামলা। যে টাকার কথা বলা হচ্ছে তা খরচও হয়নি। ন্যায়বিচার পেলে ওই মামলা টিকবেই না। রাজনৈতিকভাবে চাইলে শাস্তি দিতেই পারে। এটা নতুন কিছু নয়। তাকে অন্যায়ভাবে সাজা দেওয়া হলে পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে আমরা করণীয় নির্ধারণ করব। যে সময় যা দরকার তা করার মতো সাংগঠনিক ও জনভিত্তি বিএনপির আছে। ’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ বলেন, ‘প্রতিপক্ষ যত দুর্বল হবে, আমার জন্য তত সুবিধা— বাংলাদেশে এখন এ রাজনীতিই চলছে। তবে দেশটাকে গড়ে তুলতে সরকারের পাশাপাশি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা জরুরি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কথাই ভাবা হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে বিএনপির প্রতি এ ধরনের আচরণ করছে। আবার বিএনপি ক্ষমতায় গেলে হয়তো একই আচরণ আওয়ামী লীগের প্রতি করা হবে। এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসাই রাজনৈতিক দলগুলোর চ্যালেঞ্জ। ’

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, জিয়া পরিবারকে নির্বাচন ও রাজনীতি থেকে ‘মাইনাস’ করতেই তড়িঘড়ি করে সাজা দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। খালেদা জিয়াকে প্রতি সপ্তাহে আদালতের দ্বারস্থ করা হচ্ছে। দুর্নীতির দুই মামলায় বিচার প্রক্রিয়া শেষ হতে দু-তিন মাস লাগতে পারে। মামলার গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে, সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বিএনপিপ্রধানকে ‘সাজা’ দেওয়া হতে পারে। এ অবস্থায় দলের কী করণীয়, তা নিয়েও নীতিনির্ধারক পর্যায়ের বৈঠক চলছে। সর্বশেষ স্থায়ী কমিটিতে খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে আলোচনা হয়। ভবিষ্যতে দলের করণীয় নিয়েও স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মতামত নেন বিএনপিপ্রধান। একই সঙ্গে নতুন নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারসহ পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও খোলামেলা কথা হয় দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে।

বিএনপি নেতা-কর্মীদের শঙ্কা, খালেদা জিয়া জেলে গেলে দল নেতৃত্ব সংকটে পড়তে পারে। দলের একটি অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে। ক্ষুদ্র একটি অংশ বিএনপির বাইরে নতুন চিন্তাভাবনা করতে পারে। কথিত সংস্কারপন্থি অংশের গুটিকয় নেতাকে নিয়েও সন্দেহ শীর্ষ নেতৃত্বের। তাই এ বিষয়ে আগে থেকেই সাবধান করে দিচ্ছেন বিএনপিপ্রধান। দলের সঙ্গে এবার কেউ বেইমানি করলে তাকে আর ঘরে ফেরানো হবে না বলেও তিনি একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তৃণমূল নেতৃত্ব বলছে, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে সরকার বিএনপিকে দুর্বল করতে নানা উদ্যোগ নিতে পারে। কিছু নেতাকে নিয়ে নতুন পরিকল্পনাও করতে পারে।

জানা যায়, দুই মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন বিএনপির হাইকমান্ড। সিনিয়র নেতাদের মামলাসহ আগামী নির্বাচনের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আগামী কয়েক দিন সিরিজ বৈঠক করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। কেন্দ্রীয় নেতাদের মতামতের পাশাপাশি দল সমর্থিত বুদ্ধিজীবী ও আইনজীবীদের মতামত নেবেন তিনি। গতকাল রাতেও এ নিয়ে দলের ভাইস চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। আজ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর দলের যুগ্ম-মহাসচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদক পর্যায়ের নেতাদেরও মতামত নিতে পারেন তিনি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘বিএনপিকে নির্মূল করার ষড়যন্ত্র তো আছেই সরকারের। সর্বস্তরের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধেই মামলার খড়্গ ঝুলছে। সরকার যাই করুক, আমরা আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে সব পরিস্থিতি মোকাবিলা করব। ’ রাজপথে নামার মতো সাংগঠনিক সেই শক্তি আছে কিনা— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ পেলে দল এখন যে অবস্থায় আছে, তাতেও রাজনৈতিকভাবে এসব মোকাবিলা করা সম্ভব। ’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, ‘রাজনীতিতে কূটকৌশল থাকবেই। তা মোকাবিলা করাও রাজনৈতিক দক্ষতা। আমার মনে হয়, সামনে বিএনপির একটা সংকট আসছে। এ নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের এখনই একটা জরুরি তলবি সভা ডাকা উচিত। খালেদা জিয়ার মামলার ভাবগতি দেখলে মনে হয়, তার সাজা হয়ে যেতে পারে। তিনি জেলে গেলে দলের কী হবে, নির্বাচনে সরকারবিরোধী অন্য দলগুলোর সঙ্গে যুক্তফ্রন্টে যাবে, না এককভাবে যাবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। তবে তার জেলে গেলেও লাভ। কিন্তু বিএনপি যাই করুক, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে করতে হবে। ’

সারা দেশে জনসভা করার চিন্তা : খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার অভিযোগ, ‘বিতর্কিত’ নির্বাচন কমিশন বাতিল এবং নির্দলীয় সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ নানা দাবিতে ঢাকাসহ সারা দেশে জনসভা করার চিন্তাভাবনা করছে বিএনপি। শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সব জনসভায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা মহানগরীর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে ঢাকাসহ সারা দেশে জনসভা করাসহ বেশকিছু প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এগুলো দলের প্রধান বেগম জিয়ার সঙ্গে কথা বলে দু-এক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত করা হবে। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলতি মাসেই জনসভার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। বৈঠকে ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মহানগর নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ, কাজী আবুল বাশার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ভাইস চেয়ারম্যানদের সঙ্গে খালেদার বৈঠক : গতকাল রাতে দলের ভাইস চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করেন বেগম খালেদা জিয়া। নির্বাচন কমিশন, সহায়ক সরকার, শীর্ষ নেতাদের মামলাসহ চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নেতাদের মতামত নেন বেগম জিয়া। রাত সোয়া ৯টায় চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক চলে প্রায় দেড় ঘণ্টা। বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নিয়োগের বিরোধিতা করা হয়। তার বিরুদ্ধে জনমত গড়তেও নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বৈঠকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, সেলিমা রহমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, অধ্যাপক এম এ মান্নান, মো. শাহজাহান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, আবদুল আউয়াল মিন্টু, শামসুজ্জামান দুদু, আহমেদ আজম খান, রুহুল আলম, আবদুল মান্নান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। আজ রাতে একই স্থানে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন খালেদা জিয়া।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow