Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৩২
লেখকের অন্য চোখ
মনে হবে না ওটা ওর মাতৃভাষা নয়
সমরেশ মজুমদার
মনে হবে না ওটা ওর মাতৃভাষা নয়

আপনি মুম্বাইতে গিয়ে ১০ বছর থাকুন, মারাঠি ভাষা না শিখে দিব্যি চালিয়ে দিতে পারবেন। আমার এক পরিচিত চেন্নাইতে ৩০ বছর আছেন।

ভদ্রলোক তামিল বা তেলেগু বলতে পারেন না, কিছু শব্দের অর্থ বুঝতে পারেন। কিন্তু কলকাতায় অবাংলা ভাষী যারা কয়েক বছর বাস করেন তাদের অনেকেই ভাঙা বাংলায় কথা বলতে পারেন। ওরা দুই পুরুষ এই শহরে থাকলে এবং বাংলা বললে মনে হবে না ওটা ওর মাতৃভাষা নয়। অথচ কলকাতা এমন একটা শহর যেখানে বাংলা না শিখলেও চলে। আইএএস, আইপিএস অফিসাররা এই রাজ্যে চাকরি করলে বোধহয় বাংলা বলাটা বাধ্যতামূলক। নইলে তাদের বেশির ভাগই কথা বলার সময় কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে বাংলা বলেন কেন? আমি জানি না, হয়তো চাকরি বাঁচানোর জন্য ওদের ওই কুকর্মটি করতে হয়। কিন্তু যাদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয় তারা দিব্যি ইংরেজি এবং হিন্দি বলে গড়িয়া থেকে বেলঘরিয়া ঘুরে বেড়াতে পারেন। কিন্তু তবু তাদের মুখে বাংলা শুনছি। সেদিন বিকালে লেকভিউ রোডে গিয়েছিলাম। কয়েকটি ছেলে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারছিল। তাদের একজন আচমকা গান ধরল, ‘আমি বাংলায় কথা বলি, আমি বাংলায় গান গাই, আমি বিলিতি না পেলে কখনো সখনো একটু বাংলা খাই। ’ অবাক হয়েছিলাম। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের অনবদ্য গানটির সুরে এবং কাছাকাছি কথা রেখে আচমকা কী গাইল ছেলেটি? আমাকে দাঁড়াতে দেখে ছেলেটি বলল, ‘মজা করছিলাম, রাগ করবেন না দাদা। ’ ‘এরকম মজা করলে যিনি এই গানের স্রষ্টা তাকে অসম্মান করা হয়। ’ দলের একজন ক্ষমা চাইলে আমার সন্দেহ হলো। আমি ওদের নাম জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম ওরা চারজনই কেরল-এর ছেলে। কলকাতায় জন্মেছে। এখানকার স্কুলে পড়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে। তখন ভালো লাগল। এরা নিজেদের মধ্যে মজা করতে প্রায় প্যারোডি ধরনের গান গাইছিল। সেটা মাতৃভাষাতেও গাইতে পারত। ওই বয়সের বাঙালি ছেলের অর্ধেকাংশ রকে বসে চার এবং দুই অক্ষরের শব্দ অসারে উচ্চারণ করে যায়, যা শুনলে কানের ভিতর গরম বাতাস ঢোকে। এরা তো সেটা করেনি। কলকাতায় এক পুরুষের বেশি বাস করছেন এমন মানুষের সংখ্যা কত তার কোনো হিসাব কাগজে পড়িনি। ভোটার লিস্ট দেখে একটা ধারণা করা যেতে পারে। কিন্তু যে লিস্টে বহু পুরুষ ধরে বাস করা বাঙালিদের নাম পাওয়া যায় না সেখানে ওই ধারণা সত্যের অনেক দূরে থেকে যাবে। যেমন ধরুন, উত্তর কলকাতায় যে লোকটি জল এনে বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দেয়, যার বাড়ি কটক অথবা বালেশ্বরে, তার কোনো ভোটার আইডেন্টিটি কার্ড নেই, সে চমৎকার বাংলা বলে বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে। পাড়ায় পাড়ায় পান-সিগারেটের দোকান চালান যিনি, তিনি দেশে দুবারে মাসখানেক থেকে এলেও বাংলা বলেন অনায়াসে। আমার পাড়ার ঠাকুর একদিন বেশ বিনয়ের সঙ্গে জানাল, যদি তাকে একটা বই দিই তা হলে পড়েই ফেরত দেবে। শুনে খুশি হলাম। গোটা আটেক উপন্যাস ওড়িয়া ভাষায় অনুবাদ করেছেন কটকের এক অধ্যাপক। তার একটা ঠাকুরকে দিতেই সে প্রবলভাবে মাথা নাড়তে লাগল, ‘না না। আপনার বাংলায় লেখা বই আমাকে দিন। ’ বললাম, ‘ওড়িয়া ভাষায় পড়তে তো সুবিধে হবে তোমার। ’ সে বলল, ‘উনি তো আপনার বাংলা থেকে ওড়িয়াতে অনুবাদ করেছেন। তাতে কি সব মজা ঠিক থাকে?’ আমি অবাক হয়েছিলাম। তাকে বাংলা বই দিয়ে আর একটা সমস্যা বাড়ালাম। শেষ করেই সে আর একটা পড়তে চায়। এতদিনে আমার লেখা অর্ধেক বই তার পড়া হয়ে গেছে। অবিভক্ত বাংলায় অন্য রাজ্য থেকে এসে বসবাস শুরু করেন রাজস্থানের মানুষ। মূলত ব্যবসার প্রয়োজনে তারা এসেছিলেন। কিন্তু প্রথমদিকে তাদের ধর্মাচরণ, বৈবাহিক সম্পর্ক ইত্যাদির ব্যাপারে দেশের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইতিহাস বলছে, সেই পাল বংশের রাজত্বের সময় কনৌজ থেকে ভাড়াতে লেঠেলদের আনা হয়েছিল সুশিক্ষিত সৈন্যবাহিনী তৈরি করতে। এদেশে এসে তারা নিশ্চয়ই নিজেদের ভাষার সঙ্গে সদ্য শেখা টুকরো টুকরো বাংলা শব্দ বলা শুরু করেন। দুই-তিন প্রজন্মের মধ্যে তারা সৈন্যবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদ, এমনকি সেনাপতিও হয়ে যান কেউ কেউ। তারপর পালদের হটিয়ে সিংহাসন দখল করেন। এই মানুষদের পদবি ছিল সেন। থাকতে থাকতে তারা এক সময় বাঙালি হয়ে গেলেন। লক্ষ্মণ সেনকে বাঙালি না ভাবার কারণ নেই। যারা চর্চা করেন তারা বলতে পারবেন লক্ষ্মণ-বল্লাল সেনদের পূর্বপুরুষরাই প্রথম অন্য রাজ্য থেকে আসা মানুষ কিনা। রাজস্থানের মানুষের কথা বাংলার ইতিহাসে প্রচুর দেখা যায়। এরা শুধু এলেন না, পরের প্রজন্মের মানুষরাও এদের অনুসরণ করলেন। এরা শুধু বাংলাই শিখলেন না, এদেশীয় রাজনীতিতে অংশও নিলেন। কিন্তু এই মানুষেরা উঠতে-বসতে বাঙালির সঙ্গে কাজে-অকাজে সময় কাটিয়েও নিজেদের মহল্লা আলাদা করে নিলেন। এই ১০ বছর আগে পর্যন্ত বড়বাজার শুধু কলকাতায় ছিল না, পশ্চিমবাংলার প্রায় প্রতিটি শহরে তার মিনিসংস্করণ দেখা যেত। এই একই প্রবণতা অবাঙালি মুসলমানদের মধ্যে দেখা গেছে। খিদিরপুর, গার্ডেনরিচ, পার্কসার্কাস, রাজাবাজার এখন তাদের এলাকা। কোনো বঙ্গসন্তানকে যদি ফ্ল্যাট খুঁজতে বলা হয়, তিনি চেষ্টা করবেন রাজাবাজারকে এড়িয়ে যেতে। এই যে অবাঙালি মানুষ এই বাংলায় এসেছেন, বাংলা ভাষা শিখেছেন, এসে আর ফিরে যাননি, তাদের মধ্যে তো আসার আগে আলাপ-পরিচয় ছিল না। যেন একটি চুম্বকশক্তি তাদের টেনে এক মহল্লায় নিয়ে যায়। এই মহল্লা তৈরি করে থাকার প্রবণতা ওড়িয়াবাসীদেরও আছে। তবে তারা ছড়িয়ে আছেন শহরের সর্বত্র। বিহারিদের মধ্যে, বিশেষ করে বিহারি হিন্দুদের মধ্যে এই প্রবণতা তেমন নেই। তারা একটি বাড়ির কয়েকটি ঘর ভাড়া নিয়ে মিলেমিশে থাকেন। এদের বেশির ভাগের আয় সামান্য। একটি ঘরে সাত-আটজন রাতযাপন করেন। রাস্তার কলের জল আর গণশৌচাগার ব্যবহার করেন। গঙ্গা কাছাকাছি থাকলে সব সমস্যার সমাধান। বছর ১৫ আগে রাসবিহারী অ্যাভিনিউর দুই পাশ দক্ষিণীরা দখল করেছিলেন। এককথায় যাদের দক্ষিণী বললাম, তাদের মধ্যে তামিল, তেলেগু, কর্নাটকি ভাষাভাষী মানুষও আছেন। কিন্তু সল্টলেক হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে সব ব্যবধান ঘুচে গেল। কলকাতায় বাস করতে আসা অবাঙালি সম্পন্ন পরিবারগুলো সল্টলেকের বিভিন্ন সেক্টরে ছড়িয়ে পড়ল। একই বাড়ির বিভিন্ন ফ্ল্যাটে বাঙালি, ম্যাড্রাসি, মারাঠি, গুজরাটি থেকে শুরু করে পাঞ্জাবি পরিবারকেও থাকতে দেখা যাচ্ছে। কলকাতা নয়, সল্টলেক এবং এখন রাজারহাটও মিনি ভারতবর্ষ হয়ে উঠেছে।

up-arrow