Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, রবিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:২৫
লেখকের অন্য চোখ
কিছুতেই দ্বিতীয় লাইনটা মনে পড়ছে না
সমরেশ মজুমদার
কিছুতেই দ্বিতীয় লাইনটা মনে পড়ছে না

সাধারণত বিশেষ একটা বয়সে পৌঁছলে স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করে। তখন আচমকা নাম মনে পড়ে না।

কারও কথা বলতে গিয়ে থমকে দাঁড়াতে হয়। তখন তার সবকিছু মনে আসে, শুধু নামটাই জিভে আসে না। এই বিশেষ বয়সটা মানুষের জীবনে কখন আসে? ষাট থেকে সত্তর? নাকি তারও পরে? অথচ কেউ কেউ ব্যতিক্রম হন। আমার মায়ের দিদিমাকে কলেজে পড়ার সময়েও দেখেছি। ছোটখাটো চেহারার মানুষ ছিলেন। বিশেষ বিশেষ কারণের দিন না হলে সেমিজ পরতেন না। একটু ঝুঁকে কোমরে হাত দিয়ে হাঁটতেন। তার নাতনির ছেলে বলে আমাকে একটু অতিরিক্ত স্নেহ করতেন। আর সময়সুযোগ পেলেই কাছে বসিয়ে গল্প করতেন। সে কত গল্প। একদিন সাহস করে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘তোমার বিয়ে হয়েছিল কত বছর বয়সে?’ সঙ্গে সঙ্গে আঁচলটা শরীরে চড়িয়ে বললেন, ‘তা কী ছাই মনে আছে? তা ধর আমি তখন সবে ভাত নামাতে শিখেছি। ’ ‘কবে সেটা?’ বুড়ি চোখ বন্ধ করলেন। তারপর বললেন, ‘তখন কোম্পানির আমল থেকে রানীর রাজত্ব শুরু হয়ে গিয়েছে। সেই বছরই আমাদের গাঁয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু হয়। ’ সেই বিকালে ছুটে গিয়েছিলাম গ্রামের স্কুলে। সেটি তখন প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে। স্কুলের গায়ে আদ্যিকাল থেকে লেখা রয়েছে, স্থাপিত ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দ। ফিরে এসে বুড়িকে বললাম, ‘১৮৭৮ সালে তোমার বয়স কত ছিল?’ ‘আ মোলো! অত হিসেব কি জানি?’ বলে ফিক করে হেসে বলেছিলেন, ‘কাউকে বলিস না, মেয়েমানুষের যে শরীর খারাপ হয়, আমার তখনো হয়নি। গাছে উঠতাম। ওহো, মনে পড়েছে, আমার তখন আট বছর বয়স। ঠাকুরদা বলেছিলেন, মেয়েটার আট হয়ে গেল। এবার বিয়ে দিতে হয়। ’ বুড়ি হেসে বলেছিলেন, ‘তা বিয়ে হলো। তোর বড়দাদুর মতো হাঁদাগঙ্গারাম মানুষ বোধহয় ভূভারতে আর কেউ ছিল না। বিয়ের রাত্রে আমাকে বলেছিল, আই লাভ ইউ। সবে শিখেছিল স্কুলে। কিন্তু আমি চেঁচিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম। সবাই ছুটে এলে নালিশ জানিয়েছিলাম, এম্মা, এই বরটা কীরকম? ভাষা বুঝতে পারছি না। ’ সেই বুড়ি, যিনি আমার মায়ের দিদিমা, নব্বই বছর বয়সে জীবনের কখন কী ঘটেছিল তা পরিষ্কার বলে দিতে পারতেন। আর বলার সময় ভাবতেন না, যে শুনছে তার ভালো লাগছে কিনা। যেমন, ‘তোর দিদিমা, ওই যাকে দেখছিস, এই মুখ তো আগে ছিল না। বিয়ের সম্বন্ধ এলো। তোর বড়দাদু বললেন, পাত্র ভালো, রেলে চাকরি করে। মেয়ে আমার দেশ দেখতে পাবে। জামাই পাস দিলে আমরাও বেড়াতে যাব। কিন্তু মেয়ের কী কান্না! সে আমাদের ছেড়ে যাবে না! আর দ্যাখ সেই মেয়ের গলা শুনে কাক-চিল এই পাড়ায় ঢোকে না। ’ যার উদ্দেশে বলা তিনি গ্রাহ্য করতেন না। বিধবা মায়ের রান্না স্নান সেরে শুদ্ধ হয়ে করে দিতেন। বুড়ি বলতেন, ‘তবে কিনা, মিথ্যে বলব না, তোর মায়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি সুন্দরী ছিল আমার মেয়ে। ’

‘তোমার মেয়ে আমার কী হয়?’ “যাই হোক। আমি না থাকলে তুইও পৃথিবীতে আসতিস না। তবে হ্যাঁ, তোর মা শান্ত, ধীর, স্থির। আমার তো ভয় হতো হাবাগোবা ভেবে তোর বাবা ওকে না ঠকায়। তোর বড়দাদু চলে গেল শ্রাবণের আঠারো তারিখ, রাত তিনটে দশ মিনিটে। যাওয়ার সময় বলে গেল, ‘টুনির মা, এসো, আমি তোমার জন্যে থাকব। ’ তা এসো বললেই কি যাওয়া যায়? তুই তখন সদ্য হয়েছিস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। যে গেল সে গেল, আমি তোর সঙ্গে প্রেম না করে যাই কী করে বল?” এসব কথার ফাঁকে ফাঁকে, তোর মামাতো ভাইয়ের শ্বশুরের বোনের ভাই, শ্রীনাথ রে, বুঝতে পারছিস, ইত্যাদি কথাও ছিল। নব্বই বছরের বুড়ি অজস্র নাম, ঘটনা বুকে নিয়ে বসে থাকতেন। তাকে একবার প্রশ্ন করলেই হলো! তখনকার আতপ চালে বোধহয় কিছু গুণ থাকত।

অর্থাৎ কেউ কেউ স্মৃতির ঝাঁপি খুলে পরপর সব সাজিয়ে বলতে পারেন, কেউ কেউ একেবারে ভুলে গিয়ে অতীত আঁকড়ে বেঁচে থাকেন। আর মাঝখানের অনেক মানুষ হোঁচট খেতে খেতে মনে করতে পারেন কারও নাম, কোনো ঘটনা অথবা কোনো কবিতা বা গানের লাইন। গানের লাইন মনে রাখতে সাহায্য করে তার সুর। কিন্তু হঠাৎ কোনো কোনো কথা কিছুতেই মনে আসে না, একটি বা দুটি শব্দ, অথচ তার সুর মনে আসছে। সেটা যে কতখানি যন্ত্রণার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তা যার হয় সে-ই জানে। কয়েক দিন আগে রাত দুটোর সময় বাথরুম থেকে ফিরে একবার আকাশের দিকে তাকাতেই মনে গান এলো। সন্ধ্যা মুখার্জির গান। কিন্তু অন্তরায় পৌঁছে আটকে গেলাম। কিছুতেই দ্বিতীয় লাইনটা মনে পড়ছে না। সুরের সাহায্য নিয়েও নয়। আবার ঘুমাতে গেলাম, কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। দাঁতের যন্ত্রণার মতো না মনে পড়া শব্দটা খচখচ করছিল। উঠে বসলাম। চেঁচিয়ে গানটা গাইতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঠিক দ্বিতীয় লাইনটায় এসে আটকালাম। আমার ঘরে রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় গান রয়েছে। রেকর্ড, ক্যাসেট, সিডি ছাড়াও গীতবিতান উলটালে আমি যে কোনো লাইন শব্দ পেয়ে যাব। আধুনিক গানের সিডি আজকাল কেনা হয় না। ক্যাসেটগুলো বের করে সন্ধ্যা মুখার্জির গানগুলোকে বের করলাম। অদ্ভুত ব্যাপার। তার অনেক গান আমার কাছে রাখা ক্যাসেটে রয়েছে, কিন্তু বিশেষ গানটাই নেই। এরকমটাই হয়। একটা বিশেষ কাগজ খুঁজতে গিয়ে হাজারটা পাবেন যা আপনার তখনই দরকার নেই, বিশেষটাই নেই। এই গানটা বাইশ বছর বয়সে অনায়াসে গাইতে পারতাম! একটা শব্দ দূরের কথা, তার কণ্ঠের অভিব্যক্তি কোথায় কীরকম ছিল তাও মুখস্থ ছিল। অথচ এখন আমি স্মৃতির বিশ্বাসঘাতকতায় কাতর হয়েছি। পরিচিত মুখগুলোর কথা ভাবলাম। সবাই এখন গভীর ঘুমে রয়েছেন। ভোর যখন হব হব তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। ইদানীং মর্নিং ওয়াক করি না। ঠাণ্ডা বাতাস শরীর স্নিগ্ধ করলেও অস্থিরতা দূর করতে পারেনি। হঠাৎ দেশবন্ধু পার্কের দরজায় এসে গাছটার দিকে চোখ গেল। যেতেই লাইনটা হুড়মুড়িয়ে চলে এলো আমার কাছে। সমস্ত শরীরে কাঁটা ফুটল। মাথার ওপর থেকে যেন দশ মণ ওজন আচমকা কমে গেল। কী হালকা লাগল তখন। সোজা দেশবন্ধু পার্কের মাঝখানে চলে গিয়ে গানটা গাইতে লাগলাম। আশেপাশে যারা হাঁটছেন তাদের কেউ কেউ আমার দিকে অবাক হয়ে দেখছেন। দেখুক। আমি তখন ওয়াটারলু জিতে গিয়েছি!

এই পাতার আরো খবর
up-arrow