Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, শনিবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : রবিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:০৬
ওরা আটকে আছে পাকিস্তানে
জুলকার নাইন

পরিবারের অভাব ঘোচানো ও ভাগ্য পরিবর্তনের প্রত্যাশায় উন্নত কোনো দেশে কাজ করতে যেতে চেয়েছিলেন লক্ষ্মীপুর সদরের চরমন্ডল গ্রামের হুমায়ুন কবির। গ্রামের এক দালাল প্রলোভন দেখালেন অল্প খরচে গ্রিসে যাওয়ার।

পরিবারের সর্বশেষ জমি বিক্রি করে অর্ধেক টাকায় বোনের বিয়ে দিয়ে হুয়ায়ুন কবির বাকি টাকা তুলে দিলেন দালালের হাতে। দালালের সঙ্গে গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশে বের হলেন বাড়ি থেকে। প্রতারক দালাল তাকে বেনাপোল দিয়ে ভারতে নিয়ে পালিয়ে যান। কাগজপত্র ও টাকা-পয়সা সবই ছিল দালালের কাছে। ছয়জনের ভাগ্যান্বেষী দলটির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। সেখানে ঘোরাফেরার সময় আটক হন ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। পরে থানা থেকে দেশে ফিরে যাওয়ার শর্তে ছাড়া পান তারা। কিন্তু কবিরের বাড়ি ফিরে আর করার কিছুই নেই। পরিবারের শেষ সম্বলটিও বিক্রি করা হয়েছে। তাই ভারতেই দিনমজুরের কাজ করে খাবার জোগাড়ের চেষ্টা শুরু করেন তিনি। ১০ টাকা আয় হলে পাঁচ টাকা জমিয়ে রাখতেন। কারণ ‘ভালো দেশে’ যাওয়ার আশা তিনি ছাড়েননি। মাস ছয়েক পরই ভারতে আরেক দালালের খপ্পরে পড়েন কবির। জমানো টাকা তুলে দিয়ে রওনা দেন দালালের সঙ্গে। এবারের দালাল তাকে ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তান নিয়ে ছেড়ে দেন। আবার একই পরিস্থিতি। কিন্তু এবার প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন কবির। ভাগ্যক্রমে তাকে রাস্তায় খুঁজে পান এক বাংলাভাষী। তিনি অসুস্থ কবিরকে করাচিতে নিয়ে চিকিৎসা করিয়ে জীবন বাঁচান। এ সবই ১৯৮৪ সালের ঘটনা। সেই থেকে ৩২ বছর হুমায়ুন কবির পাকিস্তানে। কিন্তু দুই যুগ ধরে চেষ্টায় আছেন দেশে ফেরার। কবির গতকাল টেলিফোনে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সরকারের কাছে বারবার আকুল আবেদন জানিয়েও কিছু হচ্ছে না। বাংলাদেশ হাইকমিশনও দেশে ফেরার জন্য আউটপাস দিচ্ছে না। বছরের পর বছর এ অবস্থা। অসুস্থ মাকেও দেখতে পারিনি। কথা হতো কিন্তু চোখের দেখা দেখতে পারিনি। এর মধ্যেই ২০১৪ সালে মা মারা যান। মাটিও দিতে পারিনি জন্মদাত্রী মাকে। ’ কবির বলেন, ‘আমি আমার স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাংলাদেশে ফিরতে চাই। আমার এত দিনের উপার্জনও বাংলাদেশেই ব্যয় হয়েছে। এখন জীবনের শেষ সময়টা দেশে কাটাতে চাই। সরকার যেন আমাদের এই মানসিক পীড়া থেকে বাঁচিয়ে দেশে ফেরার সুযোগ দেন। ’

হুমায়ুন কবির জানালেন, ‘করাচিতে অবৈধ উপায়ে পাকিস্তানি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বাংলাদেশে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু যে ভুল আমি জীবনে একবার করেছি, সেই ভুল আর করতে চাই না। আর কোনো অবৈধ পথে যেতে চাই না। তাই করাচিতে বাংলাদেশ মিশনে দেশে পাঠানোর সুযোগের জন্য আবেদন করেছি বেশ কয়েক বছর আগে। সে সময় আমার বাংলাদেশের বাড়ির পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা নিয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশন করার কথা বলা হয়। সেই ভেরিফিকেশনও সফলভাবে শেষ হয়। পুলিশের পজেটিভ সেই রিপোর্টের ফটোকপিও আছে আমার কাছে। কিন্তু এরপর বছরের পর বছর চলে গেলেও দেশে ফেরার আউটপাস পাইনি। হাইকমিশন থেকেও এর কোনো জবাব পাওয়া যায় না। বিভিন্ন মাধ্যমে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেও কিছুই হয়নি। ’ তিনি বলেন, ‘শুধু আমি নই, আমার মতো আরও অনেক প্রতারিত ভাগ্যান্বেষী বাংলাদেশি করাচিসহ পাকিস্তানের রাস্তায় ঘোরাফেরা করছে। আমি এখানেই কিছু পড়াশোনা করে পেট চালানোর মতো কাজ করতে পারলেও গত কয়েক বছরে প্রতারিত হয়ে আসা অনেক বাংলাদেশিই রাস্তায় ঘুমাচ্ছেন। ’ করাচিতে তেমন অন্তত অর্ধশত বাংলাদেশিকে চেনেন বলে দাবি করেন হুমায়ুন কবির।

জানা গেল, স্ত্রী আমিলা বেগম, মেয়ে আরফিন ও ছেলে আরফলানকে নিয়ে করাচি শহরেই কবির বসবাস করছেন। তাদের নিয়েই ফিরতে চান বাংলাদেশে। করাচিতে তিনি এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের সহযোগীর কাজ করছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘শোনা যায় পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে যাওয়ার ভিসা না দেওয়ার একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশ নিশ্চয়ই তার নাগরিকদের জন্য অমানবিক কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কিছু ক্ষতিকর মানুষের জন্য অন্য শত শত বাংলাদেশিকে নিশ্চয়ই পাকিস্তানের মতো দেশে ফেলে রাখা যায় না। এখন আমাদের একটাই আশা, বাংলাদেশ সরকার যেন পুলিশ ভেরিফিকেশন হোক বা অন্য কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা, দেশে ফিরতে চাওয়াদের একটি সুযোগ দেয়। আমরা আমাদের জীবনের শেষ সময়টা দেশে কাটাতে চাই। সেই সঙ্গে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে প্রবাসের মানসিক যাতনা থেকে মুক্ত করতে চাই। ’

up-arrow