Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : সোমবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০
চা শ্রমিকদের যত দুঃখ
চা পাতা ভাজা, শুকনো রুটি খেয়ে জীবন
জিন্নাতুন নূর, শ্রীমঙ্গল থেকে ফিরে
চা শ্রমিকদের যত দুঃখ
রান্না ঘরে বিষণ্ন শ্রমিক —জয়ীতা রায়

দিনে আট ঘণ্টা টানা কাজ করেও সকালে চা-পাতা ভাজা, দুপুরে শুকনা রুটি এবং রাতে মরিচ দিয়ে ভাত খেয়ে জীবন কাটাচ্ছেন সিলেটের শ্রীমঙ্গলের চা শ্রমিকরা। টানা আট ঘণ্টার প্রচণ্ড পরিশ্রম শেষে প্রতিদিন একজন শ্রমিক ২৩ কেজি চা-পাতা সংগ্রহের পরেও মজুরি হিসেবে পাচ্ছেন মাত্র ৮৫ টাকা।

এই টাকায় শ্রমিকরা না নিজে ভালোভাবে খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারছেন, না তাদের সন্তানরা ভালোভাবে বেড়ে উঠছে। আর পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে চা শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও অপুষ্টিতে ভুগছেন। বিট্রিশ আমলে চা শ্রমিকদের মজুরি ছিল সর্বপ্রথম দৈনিক ২১ টাকা, পরবর্তীতে তা ২৮ টাকা, ৪৮ টাকা ও ৬৯ টাকা ও সর্বশেষ এসে এই মজুরি দাঁড়ায় ৮৫ টাকায়। চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির জন্য চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা ও চা শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে নানা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাম ভজন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, চা শ্রমিকদের বেতন কাঠামো অত্যন্ত অমানবিক। এই বেতন দিয়ে তারা ধুঁকছে কিন্তু একে বেঁচে থাকা বলে না। তবে আমরা এ নিয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে দরকষাকষিতে যাচ্ছি। শিগগিরই সর্বনিম্ন ৪ জন সদস্যের একটি পরিবারের জীবনের ব্যয়ভারের কথা চিন্তা করে ২৩০ টাকা মজুরি ধরে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানাতে যাচ্ছি। সিলেটের গান্ধিছড়া চা বাগান সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চা বাগানের কাজের পাশাপাশি বাড়তি রোজগারের জন্য শ্রমিকদের অন্য কাজও করতে হচ্ছে। শ্রমিকরা জানান, শুধু চা বাগানে কাজ করে তাদের চলে না। বেঁচে থাকার তাগিদে চা শ্রমিকরা রাবার বাগানের কাঠ সংগ্রহ করে তা বিক্রি করছেন। এক আঁটি রাবার কাঠ বিক্রি করে তারা মাত্র ২০ টাকা পান। কিন্তু নির্দিষ্ট কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিকরা কাঠ সংগ্রহের সুযোগ পান না। এ ছাড়া টাকা জমিয়ে এখন কেউ কেউ গরু-ছাগলও পালন করেন। জানা যায়, গান্ধিছড়া গ্রামে মোট ৩৭৪ জন শ্রমিক আছেন। আট বাই আটের একটি  ঘরে দুটি করে রুম। এর এক কোনে রান্নাঘর। এর মধ্যেই গাদাগাদি করে থাকছেন সাত-আট সদস্যের এক-একটি পরিবার। এই শ্রমিকরা জানান, তারা সকালে শুকনা মরিচ দিয়ে, চা-পাতা ভাজা খেয়ে কাজে যান। দুপুরে খান শুকনা রুটি। আর দিন-রাতে মাত্র একবেলা ভাত খাওয়ার সুযোগ পান। কখনো টাকা না থাকলে ভাতও খেতে পারেন না। দিন শেষে একজন চা শ্রমিক ৮৫ টাকার মধ্যে ৩৫ টাকা দিয়ে দুই কেজি চাল, ১০ টাকা দিয়ে ১০০ গ্রাম মসুর ডাল, ১০ টাকার হলুদ-মরিচ ক্রয় করেন। বাকি ৩০ টাকা তেল, নুন বা অন্য কিছুতে খরচ হয়। শ্রমিকরা জানান, তারা দুই সপ্তাহে একবার বাজারের সবচেয়ে কম দামি সিলভারকার্প মাছ কিনে খাওয়ার সুযোগ পান। মাসে একবার বাসায় মেহমান আসলে চা শ্রমিকরা তাদের ঘরের মোরগ-মুরগি খাওয়ান। কিন্তু এটিও তাদের জন্য বিলাসিতা। শ্রমিকরা বলেন, ‘কষ্টের জীবন হলেও আমরা চুরি করি না। সত্ভাবে জীবন কাটাই। ’ শ্রমিকরা জানান, এই বাগানগুলোতে তারা সকাল ৮টা থেকে শুরু করে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা কাজ করেন। আর আট ঘণ্টা কাজ করার পর প্রতিদিন একজন শ্রমিককে ২৩ কেজি চা-পাতা সংগ্রহ করতে হয়। এর পরেই তাকে ৮৫ টাকা মজুরি দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২৩ কেজির ওপর প্রতি কেজি বাড়তি চা পাতার জন্য একজন শ্রমিক সাড়ে তিন টাকা করে পান। আর যদি পাতা ২০ কেজির কম হয় তাহলে আশি টাকার কম করে মজুরি দেওয়া হয়। আবার কিছু বাগানে দিনে ২৩ কেজি করে চা-পাতা সংগ্রহের কথা থাকলেও শ্রমিকদের দিয়ে ২৪ কেজি করে পাতা সংগ্রহের বিনিময়ে মজুরি দেওয়া হচ্ছে। সন্ধ্যা রানী নামে এক শ্রমিক বলেন, আমাদের টানা আট ঘণ্টা কাজ করে যেতে হয়। এর মধ্যে একদিন পানি খেয়ে আমার আরেক বোন একটু সুপারি খাওয়ার অনুমতি চাইতেই সার্দার তাকে নেতিবাচক কথা বলেন। বিনতী দাস নামের সেই চা শ্রমিককে সুরেন্দ্র সর্দার সুপারি খাওয়ার অপরাধে অশ্রাব্য কথা বলেন।

up-arrow