Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:১৯
এমপি হওয়ার জন্য এমপি খুন
লিটন হত্যা নিয়ে দাবি পুলিশের, কাদের খান ১০ দিনের রিমান্ডে
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও গাইবান্ধা প্রতিনিধি
এমপি হওয়ার জন্য এমপি খুন
কাদের খান

জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খান সরকারি দল আওয়ামী লীগের এমপি মনজুুরুল ইসলাম লিটন হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী। গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে আবার এমপি হতেই তিনি ক্ষমতাসীন দলের এই এমপি খুনের পরিকল্পনা আঁটেন।

এমপি লিটন হত্যার তদন্তে গাইবান্ধা জেলা পুলিশ এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কিলার গ্রুপকে কাদের খান অর্থ ও অস্ত্র দেন। বাসায় রেখে দীর্ঘ ছয় মাস তাদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণও দেন তিনি নিজেই। কাজ চালানোর মতো দক্ষ করে তিনি কিলারদের ছেড়ে দেন মাঠে। এক বছর ধরে এমপি লিটনকে কিলাররা অনুসরণ করলেও কোনোভাবেই সফল হচ্ছিল না। অবশেষে গত ৩১ ডিসেম্বর এমপি লিটনের বাসায় ঢুকে তাকে হত্যা করতে সমর্থ হন তারা।

কাদের খান এমপি হতে এতটাই মরিয়া ছিলেন যে, আসন্ন উপনির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকেও তিনি হত্যার চেষ্টা করেন। তাকে হত্যার একটি চেষ্টা এ মাসেই ব্যর্থ হয়। একজন চিকিৎসক তার রাজনৈতিক লালসা মেটাতে কতটুকু ভয়ঙ্কর হতে পারেন তা এমপি লিটন হত্যার রহস্য উদঘাটনের পর জানা গেল।

কিলার গ্রুপকে দিনের পর দিন প্রশিক্ষণ দেওয়া থেকে শুরু করে মিশন সাকসেস করতে বারবার তাদের নানা তত্পরতায় পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা রীতিমতো হতবাক। পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদ করতে কাদের খানকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তার ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো উদ্ধারে পুলিশ গতকাল সন্ধায় তার বাড়ির চারটি পুকুরে তল্লাশি চালিয়েছে। এর আগে তার বগুড়ার বাসায় দুই দফা তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ ল্যাপটপ, তার মোবাইল ফোন এবং ব্যবহৃত মাইক্রোবাস জব্দ করে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) এ কে এম শহীদুল হক গতকাল চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, আওয়ামী লীগের এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটন খুনের মূল পরিকল্পনাকারী জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) আবদুল কাদের খান। দেড় মাস তদন্ত শেষে খুনি ও খুনের পরিকল্পনাকারীকে আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। এ ব্যাপারে আমাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক গতকাল এমপি লিটন হত্যার নানাদিক তুলে ধরেন। তার বর্ণনায় বেরিয়ে আসে খুনের চাঞ্চল্যকর যত তথ্য।

ডিআইজি বলেন, এমপি লিটন হত্যার এক মাস ২০ দিন পর পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছেন। কাদের খান এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থ জোগানদাতা। সাবেক এমপি কাদের পুনরায় সুন্দরগঞ্জের এমপি হওয়ার লোভে লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। এমনকি তার নির্বাচিত হওয়ার পথ পরিষ্কার করতে উপনির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে হত্যার পরিকল্পনাও ছিল বলে জানা গেছে। তবে সে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

ডিআইজি আরও বলেন, গত এক বছর ধরে এমপি লিটনকে হত্যার জন্য বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে কাদের খান যোগাযোগ করে ব্যর্থ হন। পরে মেহেদী, শাহীন, রানা  ও হান্নানকে অর্থ দিয়ে ও নিজে এমপি নির্বাচিত হলে অর্থ ও সম্পদ করে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে এই কাজে তাদের রাজি করান। কাদের খান নিজে তাদের গত ছয় মাস ধরে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলেন। কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া তিনজন গ্রেফতার হলেও রানা নামের অপর যুবক এখনো পলাতক। তবে সে পুলিশের নজরদারিতে আছে। তাকে যে কোনো সময় গ্রেফতার করা হবে। কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া মেহেদী, শাহীন, রানা ও হান্নানের বিষয়ে ডিআইজি বলেন, তারা কোনো পেশাদার খুনি নয়। কাদের খান তাদের দরিদ্রতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ দিয়ে লালন-পালন করে আসছিলেন। তাদের সে রকম কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততারও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কাদের খানের গাড়ির চালক ছিল হান্নান। সে কিলারদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করে। সংবাদ সম্মেলনে এমপি লিটনের স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি ও লিটনের ছোট বোন ফাহমিদা বুলবুল কাকলী উপস্থিত থেকে সাংবাদিকদের বলেন, লিটন হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীকে শনাক্ত করতে পারায় তাদের পরিবার পুলিশ ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ। তবে হত্যা পরিকল্পনায় আরও কেউ জড়িত কিনা তা তদন্ত করা এবং প্রকৃত খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন তারা।

লিটন হত্যা মিশন : এমপি লিটন হত্যায় তদন্তকারী সূত্র জানায়, গত ৩১ ডিসেম্বর লিটন হত্যা মিশনে চারজন অংশ নেয়। তারা হলো মেহেদী হাসান, শাহীন, রানা ও হান্নান। ইতিপূর্বে গত অক্টোবর মাসে ঢাকা থেকে গাইবান্ধা আসার পথে এমপি লিটনকে হত্যা পরিকল্পনায় তারা ব্যর্থ হয়। এই পরিকল্পনা ছিল রাস্তায় প্রথমে তার গাড়িতে পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়া হবে। এতে গাড়ি থামিয়ে লিটন বের হয়ে আসা মাত্রই তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে।   সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় এমপি লিটনের নিজ বাড়িতে তাকে গুলি করে হত্যা করতে সক্ষম হয় কিলাররা। পাঁচ রাউন্ড গুলি ছুড়ে হত্যা নিশ্চিত করে মেহেদী হাসান। প্রথমে তিন খুনি লিটনের সঙ্গে জরুরি কথা আছে বলে তার সঙ্গে বৈঠকখানায় ঢোকে। সেখানে ঢুকেই তাকে সালাম দিয়ে এক রাউন্ড গুলি ছুড়ে মেহেদী, যা লিটন হাত দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করেন। ফলে সে গুলিটি হাতে লাগে। যেহেতু এই খুনিরা পেশাদার কিলার ছিল না, সে জন্য প্রথম গুলিটি ব্যর্থ হলে খুনি মেহেদী ঘাবড়ে যায় এবং এলোপাতাড়িভাবে পরবর্তী চার রাউন্ড গুলি ছুড়ে। গুলি শেষে রানার ১০০ সিসির কালো রঙের মোটরসাইকেলটিতে চড়ে দ্রুত পালিয়ে যায় তারা। খুনে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি কাদের খানের নামে রেজিস্ট্রেশনকৃত এবং রেজি. বাবদ প্রদত্ত ফি জমা করা হয়েছে এমডি আলী নামে। মোটরসাইকেলটি পুলিশ জব্দ করেছে। এরপর রাস্তায় অপেক্ষমাণ কাদের খানের গাড়িতে কিলাররা বগুড়ায় তার বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে খুনিদের একজন বাসে করে ঢাকায় চলে যায়।   সেখানে কাদের খানের সহযোগিতায় সে আত্মগোপন করে থাকে।

যেভাবে কিলাররা শনাক্ত হয় : এমপি লিটনের কিলাররা গত ২ জানুয়ারি গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কে ধোপাডাঙ্গায় পিস্তল দেখিয়ে ফাইম নামে এক যুবকের কাছ থেকে মোবাইল ও টাকা ছিনতাই করে। ছিনতাই শেষে তাড়াহুড়া করে পালাতে গিয়ে পিস্তলের ছয় রাউন্ড বুলেটের ম্যাগাজিনটি তাদের অগোচরে রাস্তায় পড়ে যায়। স্থানীয় জনগণের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ এটি উদ্ধার করে। এই পিস্তলের বুলেট পরীক্ষা করে দেখা যায়, এমপি লিটনের শরীর থেকে অপারেশন করে বের করা এবং তার বাড়িতে হত্যার পর প্রাপ্ত বুলেটের খোসার সঙ্গে ওই ম্যাগাজিনের বুলেটের মিল রয়েছে। পরে এই সূত্র ধরে খুনিদের আটক করা হয় এবং পিস্তলটির ব্যালাস্টিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।

খুনিদের স্বীকারোক্তি : গ্রেফতারকৃত তিন খুনি গত মঙ্গলবার ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে খুনের ঘটনা স্বীকার করে এবং এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থ জোগানদাতা ও প্রশিক্ষণদাতা হিসেবে আবদুল কাদের খানের নাম উল্লেখ করে।   খুনিরা কাদের খানের পিস্তলটিই ব্যবহার করেছিল বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। তবে ঢাকা থেকে প্রাপ্ত ব্যালাস্টিক পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন। সুন্দরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মুহাম্মদ আতিয়ার রহমান খুনিদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী কাদের খানের পিস্তল এবং বুলেট জব্দ করেন। কিন্তু ৪০ রাউন্ড বুলেট ক্রয় করলেও কাদের খান পুলিশকে মাত্র ১০ রাউন্ড বুলেট জমা দিতে সক্ষম হয়েছেন। বাকি ৩০ রাউন্ড বুলেটের হিসাব তিনি দিতে পারেননি। পুলিশের ধারণা, অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণে সেই গুলি খরচ হয়ে যায়। কাদের খানের বাসার ভিতর গুলির বেশ কয়েকটি চিহ্ন পাওয়া গেছে।

১০ দিনের রিমান্ড : লিটন হত্যা মামলায় গ্রেফতার জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খানকে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল দুপুর সোয়া ১টার দিকে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের (সুন্দরগঞ্জ) বিচারক মো. মইনুল হাসান ইউসুব তার রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে মঙ্গলবার বিকালে বগুড়া জেলা শহরের কাদের খানের পরিচালিত গরিব শাহ ক্লিনিক থেকে তাকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রাতেই তাকে পুলিশ ভ্যানে করে গাইবান্ধায় জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে নেওয়া হয়। রাতে তিনি সেখানেই ছিলেন। বুধবার দুপুরে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে কড়া নিরাপত্তায় তাকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় কাদের খানকে হেলমেট পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow