Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২২:৫০
বিমানের কালো অধ্যায়
মির্জা মেহেদী তমাল
বিমানের কালো অধ্যায়

চরম নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশ বিমানের তরুণ কেবিন ক্রুরা চাকরি ছাড়তে শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন ক্রু বিদেশি এয়ারলাইনসে চাকরি নিয়ে চলে গেছেন।

আরও অনেকেই চাকরি ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তরুণ স্মার্ট এই ত্রুদ্ধরা চাকরি ছাড়তে শুরু করায় বিমানের যাত্রীসেবা হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ‘জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বিমানকে দিলেও আমরা নিগৃহীত হচ্ছি চরমভাবে। ছুটি নেই, বিশ্রাম নেই, ডিউটি করানো হচ্ছে পারিশ্রমিক ছাড়াই। খাবার থেকে শুরু করে পোশাক সবকিছুতেই আমরা বৈষম্যের শিকার। নিত্যদিনই শুনতে হচ্ছে অশ্রাব্য গালাগাল, চাকরি খাওয়ার হুমকি-ধমকি, আরও কত কি। বছরের পর বছর এমন চলতে থাকলেও দেখার কেউ নেই। আবেদন করলেও আমাদের কথা শোনেনি কেউ। ’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে যে আশা নিয়ে রোমাঞ্চকর ও চ্যালেঞ্জিং ‘কেবিন ক্রু’ পেশা বেছে নিয়েছিলেন একঝাঁক তরুণ-তরুণী, তা আজ হতাশাপূর্ণ।

তাদের কাছে এটি এখন দাসত্বের জীবন ছাড়া আর কিছুই নয়। চাকরি আছে কি নেই, এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেই থাকতে হচ্ছে তাদের প্রতিনিয়ত। বিমানে এমনই অজানা এক অধ্যায় রয়েছে, যেখানে মানুষকে খেলার পুতুলে পরিণত করা হয়েছে। নানাভাবে তাদের নির্যাতন করা হলেও মুখ বুজে সহ্য করতে হচ্ছে তাদের। ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের জবান বন্ধ করে রাখা হয়, যে কারণে বিমানের এ অধ্যায়টি কখনো প্রকাশ পায় না। অজানা থেকে যায়। এ অধ্যায়কে বিমানের অনেকেই ‘ব্ল্যাক স্পট’ বলে নাম দিয়েছেন। ভুক্তভোগী এসব কেবিন ক্রু বলেন, ‘আমরা অনেক আশা নিয়ে চাকরি নিয়েছিলাম। কিন্তু এটি এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক ফ্লাইটে ডিউটি শেষে বিশ্রাম না দিয়েই তুলে দেওয়া হচ্ছে আরেক লম্বা ফ্লাইটে। কোনো পারিশ্রমিক নেই। সাপ্তাহিক ছুটির দিনও নেই নিস্তার। দিনরাত খাটুনিতে অনেকে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকলেও তাদের বেতন কেটে রাখা হয়। ছুটি চাইলে অশ্রাব্য গালাগাল। চাকরি খাওয়ার হুমকি। শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত করা হয়। ছুটি নেই বলে অবিবাহিতরা বিয়ে করতে পারছেন না। যারা বিয়ে করছেন, তারা পারছেন না সন্তান নিতে। খাবার থেকে শুরু করে পোশাক সবকিছুতেই আমরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। ’ তারা বলেন, ‘বিমানের জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় উৎসর্গ করলেও আমরা হচ্ছি নিগৃহীত। বছরের পর বছর এমন চলতে থাকলেও দেখার কেউ নেই। আবেদন করলেও আমাদের কথা শোনেনি কেউ। ’ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিমানের ফ্লাইট সার্ভিস উপবিভাগে কেবিন ক্রু স্বল্পতার জন্য যোগ্য লোক নিয়োগে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আবেদন চাওয়া হয়। উদ্যমী ও উচ্চশিক্ষিত ১৬৮ তরুণ-তরুণী ওই পদে অস্থায়ী হিসেবে নিয়োগ পান। পরে তাদের বিমান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর তারা দেশি-বিদেশি ফ্লাইটে নিয়মানুবর্তিতা, কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। ওই ১৬৮ জনের সঙ্গে মাত্র ৮৯ দিনের অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগের চুক্তি করা হয়েছিল। কিন্তু চাকরি স্থায়ী না করে বারবার বাড়ানো হয়েছে চুক্তির মেয়াদ। তারা শুরু করেছিলেন মাত্র ১৫ হাজার টাকা বেতনে। প্রায় আড়াই বছরেও তাদের চাকরি স্থায়ী হয়নি। একাধিকবার চুক্তির মেয়াদ বেড়েছে; বেতন বাড়েনি এক টাকাও! একই পদে স্থায়ীভাবে নিয়োগকৃতদের সঙ্গে তারা সমানতালে কাজ করছেন। কিন্তু বেতন তাদের চেয়ে তিন ভাগের এক ভাগ। পান না অতিরিক্ত কাজের টাকা। বিমানের কয়েকজন অস্থায়ী কেবিন ক্রু জানান, তাদের অনেকের সরকারি চাকরির বয়স শেষ হয়েছে। স্থায়ী না হওয়ায় যে কোনো মুহূর্তে চাকরি হারানোর শঙ্কা রয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ক্যাপ্টেন (অব.) এম. মোসাদ্দেক আহমেদ বলেন, বিমানে শুধু এরাই নন, আরো অনেক বিভাগেই এমন ক্যাজুয়াল এমপ্লয়ার রয়েছে। কেবিন ক্রুদের বিষয়ে আমরা খুবই আন্তরিক। তবে তাদের স্থায়ীকরণের বিষয়টি এখন পর্যন্ত অফিসিয়ালি কোনো সিদ্ধান্ত নেই। এর জন্য আগে অর্গ্রানোগ্রাম তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, ক্যাজুয়াল কেবিন ক্রুদের কাছ থেকে কোনো আবেদন বা অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অস্থায়ী কেবিন ক্রুদের অভিযোগ, চুক্তি শেষে তাদের চাকরি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই স্থায়ী হওয়ার কথা। কিন্তু প্রায় আড়াই বছর ধরেই তারা অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরি করছেন। প্রতিবারই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবার তা নবায়ন করতে হয়। অনিশ্চয়তা ও বিড়ম্বনা থাকায় প্রতিনিয়ত অজানা আশঙ্কা নিয়ে ফ্লাইটে যেতে হয়। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে কয়েকজন বলেন, ‘চাকরি আদৌ স্থায়ী করা হবে কি না তা নিয়েই আমরা শঙ্কিত। তাই অভিজ্ঞতা দেখিয়ে অন্য এয়ারলাইনসে চাকরির জোর চেষ্টা চালাচ্ছি। ’

জানা যায়, বিমানে কেবিন ক্রু পদে যারা স্থায়ীভাবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের সর্বনিম্ন বেতন ৪৫ হাজার টাকা। এরপর বছর বছর তাদের বেতনের সঙ্গে ইনক্রিমেন্ট যোগ হয়। সেই হিসাবে কারও কারও বেতন অনেক বেশি। তবে শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না অস্থায়ীরা। তাদের ক্ষেত্রে নৈমিত্তিক, বার্ষিক, অসুস্থতাজনিত ও মাতৃত্বকালীন ছুটিও নেই। কোনো কারণে দায়িত্ব পালন না করলে অনুপস্থিত দেখিয়ে দৈনিক ৭০০ টাকা বেতন কাটা হয়। অতিরিক্ত সময় বা বাড়তি কাজ করলেও তার পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। বিশেষত হজ মৌসুমে তাদের সাপ্তাহিক ছুটিও বন্ধ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানায়, স্থায়ী কর্মীরা ৬৫ ঘণ্টা টানা ফ্লাইটে থাকলেই খাবারের বিল পান ১২০০ ডলার। অতিরিক্ত হলে প্রতি ঘণ্টার জন্য আরও ১৮ ডলার সম্মানী পান। কিন্তু অস্থায়ীদের ক্ষেত্রে এসব সুবিধা মেলে না। তাদের শুধু নির্ধারিত ৮০০ ডলার দেওয়া হয়। পান না যাতায়াত ও স্বাস্থ্য ভাতা। স্থায়ী কর্মীদের পোশাক ভাতা বাবদ প্রায় ৩০ হাজার টাকা (পুরুষ) ও নারীদের ছয়টি শাড়ির মূল্য হিসেবে ৪৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। অস্থায়ী পুরুষ ক্রুদের দেওয়া হয় মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ও নারীদের ১৫ হাজার টাকা। ডিউটি রোস্টারে অস্থায়ীদের সাপ্তাহিক ছুটির দিন লেখা থাকলেও তাদের স্ট্যান্ডবাই হিসেবে রাখা হয়। প্রয়োজনে তাদের ফ্লাইটে হাজির থাকতে হয়। এর জন্য ভাতা দেওয়া হয় না।

up-arrow