Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৩৪
দিনভর তাণ্ডব নৈরাজ্য
গাবতলীতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, নিহত ১, সারা দেশে সীমাহীন ভোগান্তি
নিজস্ব প্রতিবেদক
দিনভর তাণ্ডব নৈরাজ্য
গাবতলীতে পুলিশ বক্স ভেঙে তাণ্ডব চালান পরিবহন শ্রমিকরা। দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকাল চলে এরকম নৈরাজ্য। গাড়ি না পেয়ে ভ্যানে গন্তব্যের লক্ষ্যে যাত্রীরা —রোহেত রাজীব

রাজধানীর গাবতলী এলাকায় র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার রাত থেকে দফায় দফায় চলা এ সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

নিহত হয়েছেন শাহ আলম (৩৪) নামের এক পরিবহন শ্রমিক। মঙ্গলবার রাত থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে রীতিমতো তাণ্ডব চালিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মঙ্গলবার রাত থেকে অন্তত ২০ জন শ্রমিককে আটক করেছে পুলিশ। সকালে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং বিকালে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের সঙ্গে বৈঠকের পর অবরোধ প্রত্যাহার করেন শ্রমিকরা। স্বাভাবিক হয়ে ওঠে যান চলাচল। সারা দেশে বাসচালক-শ্রমিকদের টানা ৩৩ ঘণ্টা ধর্মঘটের চরম ভোগান্তির অবসান ঘটে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা বলছেন, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন পরিবহন শ্রমিকরা। মানুষের ভোগান্তি উঠেছিল চরমে। একপর্যায়ে পরিবহন শ্রমিকরা র‌্যাব-পুলিশের ওপর চড়াও হন। আগুন ধরিয়ে দেন পুলিশ বক্স ও পুলিশের গাড়িতে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই পুলিশ রাবার বুলেট নিক্ষেপসহ অভিযান চালাতে বাধ্য হয়। তবে শ্রমিকরা দাবি করেছেন, টার্গেট করেই র‌্যাব-পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয়েছে। বৈশাখী পরিবহনের চালক শাহ আলম পুলিশের হামলায় মারা গেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আহমেদ বলেন, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের গাবতলী ও টেকনিক্যাল মোড়ে রাস্তায় প্র্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে শ্রমিকরা যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন। পুলিশ সকালের দিকেই তাদের রাস্তা থেকে তুলে দেয়। রাস্তায় চলাচলরত যানবাহনে বাধার সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযান চালিয়ে সাতজনকে আটক করে। এ সময় বিক্ষোভকারীদের হামলায় তিন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তিনি জানান, যদি কেউ ধর্মঘট করে তা তাদের ব্যাপার। রাস্তায় অন্যদের চলাচলে বাধা কেউ দিতে পারে না। যারা সাধারণ মানুষ ও পরিবহন চলাচলে বাধা দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মানিকগঞ্জের জোকা এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হন। ওই মামলায় চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের বাসচালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে চুয়াডাঙ্গায়, পরে খুলনা বিভাগে, সর্বশেষ মঙ্গলবার থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেন বাসশ্রমিকরা। গতকাল সকাল থেকে গাবতলী ও আশপাশ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সকাল ৯টা থেকেই আচমকা পরিবহন শ্রমিকরা র‌্যাব-পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করেন। রাস্তার পাশে থাকা অস্থায়ী দোকানগুলো মাঝখানে এনে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন শ্রমিকরা। রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে সব ধরনের যানবাহন চলাচলে বাধা দেন তারা। র‌্যাব-পুলিশও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরিবহন শ্রমিকদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করা শুরু করে। রীতিমতো রণক্ষেত্র হয়ে পড়ে টেকনিক্যাল থেকে গাবতলী বাস টার্মিনাল পর্যন্ত এলাকা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আতঙ্কে দোকানপাট বন্ধ করে দেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। সংঘর্ষের পর আমিনবাজার থেকে টেকনিক্যাল পর্যন্ত রাস্তার পশ্চিম পাশে অসংখ্য ইটের টুকরা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে দেখা যায়, বিচ্ছিন্ন অবস্থায় শ্রমিকরা গোপনে অবস্থান করছেন। দফায় দফায় চলা সংঘর্ষের মোকাবিলা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেলা ১২টা ২০ মিনিটের দিকে পুলিশের বেশ কিছু সদস্য সুসজ্জিত হয়ে গাবতলী বাস টার্মিনালের প্রধান সড়ক ঘুরে আমিনবাজার সেতু পর্যন্ত সড়ক টহল দিয়ে আসেন। বেলা ১টার দিকে র‌্যাব সদস্যরা পুরো সড়ক টহল দিতে শুরু করেন। বেলা  ২টার দিকে র‌্যাব-৪-এর ২০টি গাড়ি আর দুই শতাধিক সদস্যকে রাস্তায় মহড়া দিতে দেখা যায়। এ সময় তারা রাস্তায় থাকা জনসাধারণকে সরিয়ে দেন। বেলা ৩টা পর্যন্ত ওই এলাকাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে। এর আগে মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে গাবতলী বাস টার্মিনালের সামনের সড়ক দিয়ে যান চলাচলে বাধা দেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় তারা কিছু গাড়িও ভাঙচুর করেন। পুলিশ বাধা দিলে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। গাবতলী বালুর মাঠের পাশের পুলিশ বক্স ও একটি রেকারে আগুন ধরিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। মঙ্গলবার শ্রমিকদের অবস্থান ছিল গাবতলী গরুর হাটের ক্রসিংয়ের সামনে। গতকাল সকাল থেকেই তারা গাবতলীর আন্ডারপাস পেরিয়ে মসজিদের কাছাকাছি স্থানে অবস্থান নেন। পর্যায়ক্রমে মাজার রোড পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত করেন তারা। এদিকে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বাসচালক শাহ আলম আহত হন। প্রথমে তাকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। বেলা ১১টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই শাহ আলম মারা যান বলে তারা জানান। ঢামেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক খাজা আবদুল গফুর বলেন, সকালে শাহ আলমকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিছু সময় পরই তিনি মারা যান। বেলা ১২টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী আড়তের সামনের সড়কে টায়ার, বিটুমিনের পুরনো ড্রাম ফেলে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। এ সময় একটি অটোরিকশা ভাঙচুর করা হয়। তাদের সরাতে পুলিশ গেলে পরিবহন শ্রমিকরা ঢিল ছুড়তে শুরু করেন। পরে আরও পুলিশ সেখানে গেলে শ্রমিকরা সরে যান। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের ডেমরা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমাদের টিম মাঠে আছে। কোথাও অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। ’

তবে বেলা ১২টার দিকে আন্দোলনের ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ আন্তজেলা ট্রাকচালক ইউনিয়নের সভাপতি তাজুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনে শ্রমিকরা কতটুকু ছাড় দেবেন তা নির্ভর করছে সরকারের আচরণের ওপর।

চরম দুর্ভোগ-ভোগান্তি : সারা দেশে পরিবহন ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন গতকাল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে ওঠে। বিক্ষুব্ধ পরিবহন শ্রমিকদের থাবা থেকে রেহাই পাননি নারী-শিশু কিংবা রোগী পরিবহনের বাহন অ্যাম্বুলেন্সও। গাবতলী, কল্যাণপুর, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভরত শ্রমিকরা রিকশা ও অটোরিকশা থেকেও যাত্রীদের নামিয়ে দেন। সব ধরনের পণ্য ও যাত্রীবাহী যান চলাচল বন্ধ রাখার পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে ব্যক্তিগত যানবাহন ঢুকতেও বাধা দেওয়া হয়। গতকাল বেলা ১১টার দিকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা থেকে মতিঝিল যাওয়ার জন্য রিকশায় উঠতে চাইলে দুই নারীকে বাধা দেন শ্রমিকরা। এক নারী যাত্রী এ সময় উত্তেজিত হয়ে শ্রমিকদের কাছে জানতে চান, তার রিকশা কেন আটকানো হলো। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে একজন পুলিশ সদস্য এসে পরিস্থিতি সামাল দেন। যাত্রাবাড়ী, গাবতলী, কল্যাণপুর, আমিনবাজার এলাকায় বিক্ষোভরত শ্রমিকরা বেশ কিছু রিকশা, অটোরিকশার চাকার হাওয়া ছেড়ে দেন। এসব অনেক ঘটনার আশপাশে পুলিশ থাকলেও তাদের নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশের টহলের মধ্যেই বেলা ১টার দিকে কয়েকজন শ্রমিক কল্যাণপুর মোড়ে একটি প্রাইভেট সিএনজিচালিত অটোরিকশা থামাতে যান। এ সময় সেখানে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের বাধা দেন। পরে তারা দৌড়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এলাকায় শাহ আলম নামের এক শ্রমিকনেতা বলেন, ‘আমি ড্রাইভার, তারাও ড্রাইভার। আমাগো দাবি হেগোও দাবি। আমরা গাড়ি না চালাইলে হেরাও গাড়ি চালাইতে পারব না। ’ ডেমরা থেকে যাত্রাবাড়ী সড়কে সকালে কিছু হিউম্যান হলার চলাচল করলেও সকাল ৯টার পর মাতুয়াইলে মৃধাবাড়ী এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন পরিবহন শ্রমিকরা। সব হিউম্যান হলারকে তারা ঘুরিয়ে দেন।

দূরপাল্লার বাস না চলায় রাজধানীর পাশের জেলাগুলো থেকে অটোরিকশা, হিউম্যান হলার ও পিকআপে করে ঢাকায় ঢোকার চেষ্টা করেন অনেকে। কিন্তু সেসব বাহন কাঁচপুর এলাকায় পরিবহন শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে।

কাঁচপুর, চিটাগাং রোড, সাইনবোর্ড, মাতুয়াইল, রায়ের বাগ, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, সায়েদাবাদ ব্রিজ, গোলাপবাগ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিয়ে আছেন ধর্মঘটী শ্রমিকরা। আর সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে হেঁটে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অসুস্থ মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছিলেন যাত্রাবাড়ীর বিবিরবাগিচা এলাকার মেজবাহ উদ্দিন। গাড়ি না পেয়ে হেঁটেই রওনা হন তারা। রাজধানী ঢাকায় প্রবেশের একটি অন্যতম পথ আমিনবাজার। ঢাকার বাইরে এবং সাভার, মানিকগঞ্জ এলাকা থেকে আসা সব মানুষই আমিনবাজার দিয়ে ঢাকায় ঢোকেন। কিন্তু ধর্মঘটের কারণে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েন সাধারণ মানুষ।

চট্টগ্রাম : ধর্মঘট চলার সময় গতকাল মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। দু-একটি গাড়ি চলাচলের চেষ্টা করলে সেগুলো থেকে আন্দোলনরত শ্রমিকরা যাত্রীদের নামিয়ে দেন। এ সময় লালখানবাজারে এক চালক শ্রমিকদের হাতে লাঞ্ছিতের শিকারও হন। নগরীর বাদুরতলা এলাকায় একটি সিএনজি অটোরিকশা ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। তারা এক সিএনজি চালককেও মারধর করেন। দুর্ভোগে পড়া যাত্রীরা জানান, আইন এবং বিচারের রায়কে অমান্য করে এভাবে যারা ধর্মঘটের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে, তাদেরও বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।

রাজশাহী : টানা পরিবহন ধর্মঘটের কারণে রাজশাহীর সাধারণ মানুষ নিদারুণ ভোগান্তিতে পড়েন। শুধু বাসের জন্য ধর্মঘট ডাকা হলেও গতকাল সকাল থেকে নগরীর শিরোইল পুরাতন বাস পরিবহন শ্রমিকরা শহরের ভিতরে রিকশা, অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস চলাচলে বাধা দিয়েছেন। যাত্রীদের রিকশা ও অটোরিকশা থেকে নামিয়ে দিতেও দেখা গেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে গতকাল পরিবহন শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পুলিশের রাবার বুলেটে অন্তত ১০ পরিবহন শ্রমিক আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ১১টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ট্রাক ও ট্যাংক লরি শ্রমিকরা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের গোলচত্বর এলাকায় অবস্থান নিয়ে গাড়ি চলাচলে বাধা দিতে গেলে পুলিশ লাঠিপেটা করে। তখন দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকরা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে, আর পুলিশ প্রায় অর্ধশত রাউন্ড রাবার বুলেট  ছোড়ে।

কুমিল্লা : ধর্মঘটের কারণে কুমিল্লা জেলার ৩২টি রুটের বাস চলাচল গতকাল বিকাল পর্যন্ত বন্ধ ছিল। এতে জনজীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। হাইওয়ে কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম বলেন, দুই-এক স্থানে শ্রমিকরা পরিবহন চলাচলে বাধা দিতে চেয়েছিল, আমরা বুঝিয়ে তাদেরকে সরিয়ে দেই। কুমিল্লায় কোথাও অপ্রীতিকর কিছু হয়নি।

দিনাজপুর : গতকাল ২য় দিনের মতো দিনাজপুরে মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন পরিবহন ধর্মঘট পালন করেছে। দিনাজপুর থেকে ১৬টি রুটের লোকাল যাত্রিবাহী বাসসহ ঢাকাগামী দূরপাল্লার সব বাস, কোচ চলাচল বন্ধ ছিল। এর ফলে হিলি স্থলবন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহন ও পাসপোর্টধারীরা গন্তব্যে যেতে সমস্যায় পড়েন। স্থানীয় ও দূরপাল্লার যাত্রীরাও ভোগান্তিতে পড়েন। বাস বন্ধ থাকায় অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ছোট যান মহাসড়কে চলাচল করে।

সিদ্ধিরগঞ্জ : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইল মোড় থেকে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত কয়েকটি পয়েন্টে টায়ার জ্বালিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন গণপরিবহন শ্রমিকরা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাঁচপুর সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে ও শিমরাইল মোড়, মৌচাক, সানারপাড়া ও সাইনবোর্ড মোড়সহ বিভিন্ন পয়েন্টে লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান নেন তারা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ে মারেন। পুলিশও শ্রমিকদের লাঠি পেটা করে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এ সময় গণপরিবহন শ্রমিকরা অ্যাম্বুলেন্স চলাচলেও বাধা দিয়েছেন। ধর্মঘটকারীদের হাতে আটকা পড়েন কুমিল্লা-১ আসনের সংসদ সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) সুবেদ আলী ভূইয়াও। সকাল ১০টা ২০ মিনিটের সময় সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড় এলাকায় তিনি আটকা পড়েন। খবর পেয়ে নারায়ণগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশের কয়েকটি টিম তাকে এসকর্ট করে সাইনবোর্ড পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।

সিলেট : পরিবহন ধর্মঘটে সিলেটে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। নজিরবিহীন এ ধর্মঘটে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে সিলেট। মহানগরী থেকে সব ধরনের যানবাহনকেই বাইরে যেতে বাধা প্রদান করেন পরিবহন শ্রমিকরা। বাইরে থেকে কোনো যানবাহনকেও নগরীতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ধর্মঘটের কারণে বাস, সিএনজি অটোরিকশা, মাইক্রোবাস চলাচল না করায় চাপ পড়ে ট্রেনের ওপর। কিন্তু আসন সংকটের কারণে ট্রেনের টিকিটও পাননি অনেকেই। জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বেরিয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে অনেককেই। অনেকেই এমন ধর্মঘটে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

গাবতলীতে তাণ্ডবকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা : দুই চালকের সাজার প্রতিবাদে পরিবহন ধর্মঘট চলাকালে রাজধানীর গাবতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সংঘটিত ঘটনার জন্য দায়ী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। গতকাল সকালে রাজধানীর মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজ কনভেনশন হলে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকরা পুলিশের গাড়ি ও পুলিশ বক্স ভেঙে ফেলেছে। আজকে (বুধবার) একটা জিপের ওপর আক্রমণ করতে গিয়েছিল, এ সময় একজন শ্রমিক আহত হয়েছেন। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী চরম ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘট অহেতুক। তাদের আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার সুযোগ ছিল, তারা তা করেনি। বরং তারা ধর্মঘটের নামে জনদুর্ভোগ তৈরি করছেন।

নৌপরিবহনমন্ত্রীর অভিযোগ : নৌপরিবহনমন্ত্রী মো. শাজাহান খান বলেছেন, ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনালে পুলিশ বক্সে আগুন কিংবা পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় কোনো মালিক-শ্রমিক জড়িত নয়। শ্রমিকদের নামে কিছু লোক এ ঘটনা ঘটিয়েছে। শ্রমিকদের কর্মবিরতিকে পুঁজি করে নাশকতার চেষ্টা করেছিল বিএনপি-জামায়াত। এমনকি ওই রাতে গাবতলী বাস টার্মিনালে বাসেও আগুন দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল তারা। তিনি গত রাতে শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ডা. মিলন হত্যাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছিল। গাবতলীর ঘটনা নিয়েও অনেকে সেই চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা তা পারেনি। পরিবহন সেক্টরে কোনো অরাজকতা-নাশকতা কেউ করতে পারবে না। পরিবহন সেক্টরকে সত্যিকারের সেবামূলক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি জনগণের সহায়তা কামনা করেন। মন্ত্রী এ বিষয়ে তাদের ওপর ভরসা রাখার, আস্থা রাখার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের তিনি জনগণের বিপক্ষে মনে করেন না। জনগণের অংশ মনে করেন। পরিবহন সেক্টর আরও বিশৃঙ্খল থাকত, যদি তিনি নিজে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা না করতেন। তাকে (নৌপরিবহনমন্ত্রী) দায়ী করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিস্থিতিকে অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করেছেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow