Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : রবিবার, ৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৪ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৩৫
বিজয়ের আনন্দের দিনও আমাদের যুদ্ধ করতে হয়েছে
মোস্তফা মহসীন মন্টু
বিজয়ের আনন্দের দিনও আমাদের যুদ্ধ করতে হয়েছে

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে পাকিস্তানি বাহিনী নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে আর বিজয়ের আনন্দে ভাসতে থাকে বাঙালি জাতি। কিন্তু সেই বিজয়ের দিনও আমাদের যুদ্ধ করতে হয়েছে।

সেদিন চকবাজার থেকে ঢাকা মেডিকেল পর্যন্ত পৌঁছতে আমাদের ৯ ঘণ্টা লেগেছিল। সামনে এগোতে গিয়ে প্রতি পদে পদে আমাদের যুদ্ধ করতে করতে এগোতে হয়েছে। ফলে ঢাকায় থেকেও আমরা ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে থাকতে পারিনি। দীর্ঘ নয় মাস কারাভোগের পর একাত্তরের ১ মার্চ আমরা জেল ভেঙে বের হই। তখন আমার বয়স ২৫। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে এম এ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। মাতৃভূমিকে ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত করার জন্য বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত হয়েছিলাম। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতাসংগ্রামীদের একটি মিছিলে আমিও ছিলাম। ওই মিছিলে সামরিক বাহিনী বাধা দিলে সংঘর্ষ বেধে যায়। এতে এক ক্যাপ্টেন নিহত হন। এ ঘটনায় সামরিক সরকার মামলা করল। আমাকে ও ছাত্রনেতা কামরুল আলম খান খসরু এবং আমার ভাই সেলিম জাহানসহ অজ্ঞাত ৪০০ জনকে আসামি করে মামলা দেওয়া হয়। জুনে ইকবাল হল থেকে আমি গ্রেফতার হয়েছিলাম। জেল থেকে বের হয়েই শুনলাম দুঃসংবাদ। ’৭১-এর ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছেন। এর প্রতিবাদে সারা বাংলার মানুষ গর্জে ওঠে। আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার দিকনির্দেশনা দিলেন। বলে দিলেন যুদ্ধের সময় কী করতে হবে। এ ভাষণে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেনারেল ইয়াহিয়া খান আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। ২৩ মার্চ আমরা ঢাকায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করলাম। শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, কামরুল আলম খান খসরু, আমি এবং ছাত্রলীগের কয়েকজনকে বঙ্গবন্ধু ডেকে বললেন, পরিস্থিতি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে। এর আগেই ছয় দফা থেকে ধীরে ধীরে আন্দোলনকে এক দফার দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তারই পরিণতিতে ১৯৭০-এ জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। বাঙালির এ বিজয় পাকিস্তানিরা মেনে নিতে পারেনি। তাই তারা ষড়যন্ত্র করতে থাকে এবং গণহত্যার মাধ্যমে বাঙালিদের দমন করতে চায়। কিন্তু এসব বিষয়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সতর্ক। যাই হোক, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ৩ মার্চ থেকে আমরা অস্ত্র সংগ্রহ করছিলাম। ২৫ মার্চ রাত ৯টায়ও আমরা ধানমন্ডি-৩২ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর কাছেই ছিলাম। বঙ্গবন্ধু আমাদের বললেন, তোমরা নিরাপদ এলাকায় চলে যাও। আমরা তাকে আমাদের সঙ্গে যেতে বলি। আমাদের সঙ্গে চলুন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমাকে না পেলে আর্মি সবাইকে মেরে ফেলবে, তোমরা যাও। ’ বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে বের হয়ে ইকবাল হলে আসি, সেখানে কিছু অস্ত্র ছিল, দুটি গাড়িতে সেগুলো তুলি। রাত ১১টায় এস এম হলের সামনে ট্যাংকসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অবস্থান নেয়। জানতে পেরে আমি গাড়ি নিয়ে আজিমপুর, হাজারীবাগ হয়ে কামরাঙ্গীর চর পৌঁছাই। নৌকায় করে অস্ত্র কেরানীগঞ্জে নিয়ে যাই। রাত দেড়টায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরু করে। আমরা ২৬ মার্চ কেরানীগঞ্জ থানা ঘেরাও করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করি। থানায় কয়েকজন বাঙালি পুলিশ ছিল, তাদের সঙ্গে নিয়ে আসি। ঢাকা থেকে শেখ ফজলুল হক মণি, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, আবদুল মালেক উকিল, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী কেরানীগঞ্জে আসেন। পরে কেন্দ্রীয় নেতারা চলে গেলেন ফরিদপুর হয়ে মুজিবনগরে। সেখানে গঠিত অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের তত্ত্বাবধানেই পরে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। ২৬ মার্চেই কেরানীগঞ্জে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করি। লাখ লাখ মানুষ ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জে আসতে থাকে। ২ এপ্রিল ফজরের আজানের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কেরানীগঞ্জে হামলা চালায়। ভোর থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রায় সাত ঘণ্টার অপারেশনে তারা স্থানীয় বাসিন্দা আর ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা আশ্রিত সাড়ে চার হাজার নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে। এর কয়েক দিন পরে আমি মুজিবনগরে চলে যাই। সেখানে ভবেরপাড়া আমবাগান ক্যাম্পের দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়। মণি ভাই ও সিরাজ ভাইয়ের নির্দেশে আমি বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্প থেকে সারা দেশ থেকে আসা ছাত্রলীগ নেতাদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণের জন্য দেরাদুন ও হাফলং পাঠানোর ব্যববস্থা করি। পরে আমাকে কলকাতা হয়ে শিলিগুড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর দেরাদুনে দুই মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে আমি আবার কেরানীগঞ্জে ফিরে আসি। ফিরে এসে কেরানীগঞ্জে গড়ে তুললাম ১২টি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। প্রশিক্ষণের সময় যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা থেকে আমাদের বিকল্প প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলাসহ স্থানীয়ভাবে রাজস্ব সংগ্রহ, বিচার-শালিস করা ও স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণের যে দীক্ষা দেওয়া হয়েছিল, আমরা সেভাবে স্বাধীনতার পক্ষে নারী-পুরুষ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করি ও প্রশিক্ষণ দিই। পরে আমি কেরানীগঞ্জসহ ঢাকা দক্ষিণে ও খসরু আড়াইহাজারসহ ঢাকার উত্তর— এ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করি। দেরাদুন থেকে ফিরে মহিউদ্দীন মুন্সীগঞ্জের দায়িত্ব নেয়। আমি তখন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) যা ‘মুজিববাহিনী’ নামে পরিচিত তার ঢাকা জেলা কমান্ডার। ২৭ নভেম্বর কেরানীগঞ্জে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী হামলা চালায়। শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সামনাসামনি যুদ্ধ। ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত তিন দিনের এ যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনী স্যাবর জেট বিমান ও হেলিকপ্টার থেকে গোলাবর্ষণ করে। এ যুদ্ধে কমান্ডার ওমর শহীদ হন এবং চার-পাঁচ জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। তবে এ যুদ্ধে ১২ পাকিস্তানি সেনা নিহত হন। পরে জেনেছি এ যুদ্ধে প্রায় ১৪০০ পাকিস্তানি সেনা আমাদের ওপর হামলা করেছিল। দুই রাত এক দিন যুদ্ধের পর আমরা কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ও সাভারের ঝালচরে সরে যাই। এ সময় লিফলেট বিলি করে ঢাকা থেকে বাঙালিদের অন্যত্র চলে যেতে বলি। এরপর ঢাকায় খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিই। কয়েক দিন পর জিঞ্জিরা থানা ঘেরাও করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করি। এরপর যাত্রাবাড়ী, রাজউক, মতিঝিলসহ বিভিন্ন স্থানে হানাদার বাহিনীর ওপর বিচ্ছিন্ন গেরিলা হামলা শুরু করি। এর মধ্যে যুদ্ধ নতুন রূপ পায়। মিত্রবাহিনী যুদ্ধে অংশ নেয়। ডিসেম্বরে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে শুরু করে। পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে ১৫ ডিসেম্বর রাতে কেরানীগঞ্জ থেকে আমরা ঢাকায় ঢুকলাম। রাতেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দেয়াল ভেঙে আমার ভাই সেলিম জাহান ও অন্যান্য রাজবন্দীকে মুক্ত করি।

up-arrow