Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৯ মার্চ, ২০১৭ ২৩:২৬
মাদকের ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্ক
অস্ত্রবাজ সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক কর্মীরা জড়িয়ে পড়ছে ব্যবসায়
মির্জা মেহেদী তমাল

দেশজুড়ে মাদকের ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। অবৈধ অস্ত্র, অর্থ আর রাজনৈতিক প্রভাবে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে এই মাদক মাফিয়ারা।

দেশের ৩২ জেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো শাসন করছে এখন তারাই। এসব সীমান্ত এলাকার ৫১ পয়েন্ট দিয়েই পাচার করে আনছে হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের মাদক দ্রব্য। সিন্ডিকেটের ছড়িয়ে থাকা শক্তিশালী জালের মাধ্যমে সহজেই তা ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এখন তাদের সঙ্গে পেরে উঠতে পারছে না। মাদকের ডেরায় অভিযান চালালেই মাদক মাফিয়ারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধ্বংস করার মাদক ব্যবসার প্রসার ঘটছে দ্রুতগতিতে।

গত বুধবার ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্তবর্তী বদরপুর এলাকায় মাদকবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালতে হামলা চালিয়েছে মাদক ব্যবসায়ীরা। এতে একজন আনসার সদস্য নিহত এবং ম্যাজিস্ট্রেটসহ দুজন আহত হয়েছেন। মাদক ব্যবসায়ীরা আনসার সদস্যের অস্ত্রটিও লুটে নিয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অগাধ অর্থের মালিক বনে যাওয়া মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যদের সহযোগিতা করছে রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতারা। বিকিকিনিতেও রাজনৈতিক কর্মীরা জড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য রয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ব্যবসায়ীদের নানাভাবে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছেন। মাদকবিরোধী অভিযান শিথিলতার সুযোগে ব্যবসায়ীরা অর্থ ও অস্ত্রে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। যে কারণে হঠাত্ অভিযান চালালেই তারা পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। তাদের কাছে এখন অত্যাধুনিক সব আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মাঠপর্যায়ের লোকজন ধরা পড়লেও মূল হোতারা সব সময় রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। যারা ধরা পড়ছে, তারাও আবার আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছেন।

মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জানান, মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের জামিনযোগ্য সব ধারা পরিবর্তন করে অজামিনযোগ্য করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে এ অপরাধ কমবে না, ভাঙা যাবে না মাদক ব্যবসায়ীদের নেটওয়ার্কও। ওই কর্মকর্তার মতে, দেশে এখন মাদকসেবীর সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এরমধ্যে অর্ধেকই ইয়াবায় আসক্ত। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী আর তরুণ-তরুণী শুধু নয়, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীদের একটি অংশ এখন ইয়াবায় আসক্ত। এ ছাড়া ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, মদ এবং টিডিজেসিক ইনজেকশন ব্যবহার করছে মাদকসেবীরা। ১৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারী পুরুষ মাদক সেবন করছে। তবে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী মাদকসেবীর সংখ্যাই বেশি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক খন্দকার রাকিবুর রহমান বলেন, মাদক পাচার বন্ধে ভারতের সঙ্গে চুক্তির পর ফেনসিডিল পাচার কমে গেছে। ভারত সরকার বাংলাদেশের সীমান্তে অবৈধ ফেনসিডিল কারখানাগুলো উচ্ছেদ করেছে। এখন কূটনীতিক প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর এর মধ্য দিয়ে ইয়াবা পাচার কমে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের প্রতিটি জেলার মাদক মাফিয়াদের সহযোগিতা করছে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। কোনো কোনো জেলায় আবার ক্ষমতাসীন দল ছাড়াও বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও রয়েছেন। মাদক প্রশ্নে এসব এলাকায় সবাই এক। রাজনৈতিক দলের নেতা ছাড়া প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা, স্থানীয় বিশিষ্টজনেরাও মাদক মাফিয়াদের সহযোগিতা করে আসছে।

৩২ ধরনের মাদক : মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে ৩২ ধরনের মাদক সেবন চলছে। এ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন নামের যেসব মাদক উদ্ধার হয়েছে সেগুলো হচ্ছে— হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফায়েড স্পিরিট, কেডিন, ফেনসিডিল, তাড়ি, প্যাথেডিন, টিডি জেসিক, ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড, ওয়াশ (জাওয়া), বনোজেসিক ইনজেকশন (বুপ্রেনরফিন), টেরাহাইড্রোবানাবিল, এক্সএলমুগের, মরফিন, ইয়াবা, আইএসপিল, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, মিথাইল, ইথানল ও কিটোন। এ ছাড়া ইনোকটিন, সিডাক্সিনসহ বিভিন্ন ঘুমের ট্যাবলেট, জামবাকসহ ব্যথানাশক ওষুধ কিংবা টিকটিকির লেজ পুড়িয়ে কেউ কেউ নেশা করে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

সীমান্ত পয়েন্ট : মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৩২ সীমান্ত জেলার অন্তত ৫১টি পয়েন্ট দিয়ে অবাধে মাদক ঢুকছে। পশ্চিম সীমান্তে যশোরের বেনাপোল, পাটখালী, চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা, সাতক্ষীরার কলারোয়া, দেবহাটা, ভোমরা, কুলিয়া, চুয়াডাঙ্গার মহেশপুর, জীবননগর, মেহেরপুরের মুজিবনগর, মেহেরপুর সদর, রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, রাজশাহী সদর, গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, জয়পুরহাট সদর, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, বিরামপুর, হিলি, হাকিমপুর, বিরলা ও পোরশা, পূর্ব সীমান্তে সিলেটের জকিগঞ্জ, চুনারুঘাট, মাধবপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, আখাউড়া, বিজয়নগর, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, বিবিরবাজার, ফেনীর ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম, উত্তর সীমান্তে কুড়িগ্রামের রৌমারী, নাগেশ্বরী, শেরপুরের শেরপুর সদর, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা এবং দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে টেকনাফ ও উখিয়া দিয়ে অবাধে মাদক প্রবেশ করছে।

মাদকের রুট : গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক কেনাবেচা হলেও এর মূল বাজার সবকটি মেট্রোপলিটন শহর। তবে রাজধানীতে মাদকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। সূত্রমতে, রাজধানীর বাজারে মাদক আসে পাঁচটি পথে। এগুলো হলো— ভারত থেকে সাতক্ষীরা ও যশোর হয়ে সড়কপথে, রেলপথে আখাউড়া হয়ে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চল থেকে সড়কপথে এবং কুমিল্লার বুড়িচং হয়ে সড়কপথে মাদকের চালান ঢাকায় আসছে। তবে মাদক ইয়াবা সব সময়ই কক্সবাজার থেকে আসছে। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে রেলপথে ঢাকায় আসছে ইয়াবার চালান। এখন নৌপথে ইয়াবার চালান যাচ্ছে বিভিন্ন জেলায়।

যশোর সীমান্ত : মাদক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত সরকারি একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, কলকাতার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা বেনাপোল সীমান্তকে মাদক পাচারের ‘নিরাপদ রুট’ হিসেবে বেছে নিয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ২৬ ব্যাটালিয়ন বেনাপোল থেকে কিছুদিন পরপরই ফেনসিডিল, গাঁজা ও টিডি জেসিক ইনজেকশনের চালান আটক করছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী রুট : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সূত্রমতে, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওপারে ভারত সীমান্তের ভিতরে মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় বেশ কিছু ফেনসিডিলের কারখানা ছিল। ভারত সরকার কিছু গুঁড়িয়ে দিলেও এখনো কিছু কারখানা রয়ে গেছে। সেখান থেকে সীমান্তঘেরা তিনটি উপজেলা গোদাগাড়ী, চারঘাট ও বাঘার অন্তত ১৯টি ঘাট দিয়ে ফেনসিডিল ও হেরোইনসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য বাংলাদেশে ঢুকছে। এরপর ট্রেনে ও বাসে করে এগুলো ঢাকায় পাঠানো হয়। ঘাটগুলো হলো— গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ, রেলবাজার, হাটপাড়া ও সুলতানগঞ্জ। এ ছাড়া চারঘাটের রাওথা, পিরোজপুর, বাঘার মনিগ্রাম ইউনিয়নের মীরগঞ্জ, পানিকামড়া ও আলপাইপুর ঘাট আছে। নাটোরের লালপুর ও দিনাজপুরের হিলি থেকে মাদক আসে। ঢাকায় এসে এসব মাদক ছড়িয়ে পড়ছে অন্যত্র।

কুমিল্লা ও আখাউড়া রুট : রাজধানীতে মাদকের বড় চালান আসে ট্রেনে করে। আখাউড়া সীমান্ত থেকে আসা এসব চালানে আসে মূলত ফেনসিডিল। ঢাকার কমলাপুর ও আশপাশের স্টেশনে এসব ফেনসিডিল নামানো হয়। ত্রিপুরার আগরতলা থেকে আসছে এসব ফেনসিডিল। মাদক ব্যবসায়ীরা আখাউড়া, চান্দুরা সড়ক হয়ে নারায়ণগঞ্জে ও ঢাকায় ফেনসিডিলের চালান পাঠাচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন) সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, নতুন সাংগঠনিক কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে একসঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় নতুন নতুন পদ সৃষ্টি করে কর্মকর্তাদের পোস্টিং দেওয়া হয়। এতে সাময়িকভাবে অভিযানিক কর্মকাণ্ড কিছুটা ব্যাহত হলেও আগামীতে নতুন উদ্যোমে আমরা কাজ করতে পারব।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow