Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, শনিবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১০ মার্চ, ২০১৭ ২৩:১৮
নতুন প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস থেকে বঞ্চিত ছিল : প্রধানমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ’৭১ এবং ’৭৫-এর খুনিদের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

নতুন প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস থেকে বঞ্চিত ছিল। ’৭৫-এ জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করার পর আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ ছিল, তার নামটাও নিষিদ্ধ ছিল, তার ছবি নিষিদ্ধ ছিল। একটি প্রজন্ম ’৭৫-৯৬ সাল পর্যন্ত ২১টি বছর— এদেশের মানুষ কিছুই জানতে পারেনি। যাদের বয়স আজকে ৪০-৫০ তারাও সঠিক ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।

গতকাল  বিকালে রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ৭ মার্চ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এ কথা বলেন। ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ : রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামো পরিবর্তনের দিকদর্শন’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট।

’৭৫-এর খুনি আর একাত্তরের পরাজিত শক্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না মন্তব্য করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,  যে কারণে ’৭৫-এ আমরা দেখেছি অপবাদ, নানা ধরনের অপপ্রচার করে মানুষের মনকে বিষাক্ত করা হয়েছিল। অনেক সময় এমন মনে হতো— দেশ স্বাধীন করা একটা মহা অপরাধ হয়ে গেছে। একটা শোষিত জাতির মুক্তির জন্য তিনি সংগ্রাম করে গেলেন সারাটা জীবন। আপনারা একটু হিসাব করে দেখেন, কতগুলো বছর একটানা জেলে ছিলেন তিনি। কষ্ট করে তিনি দেশটা স্বাধীন করলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছর তিনি সময় পেয়েছিলেন, সেই সময়েও অনেকে তো সহযোগিতা করেননি। এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল যা ’৭৫-এ পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে যে সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছেছিল, ’৭৫-এর হত্যাকাণ্ডের পর সে দেশ আবার ঘাতকের দেশ হিসেবে পরিচিতি পেল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ভাষা আন্দোলনে জাতির পিতার যে অবদান এবং ভাষা আন্দোলনটা যে তিনিই প্রথম শুরু করেছিলেন— এই বিষয়টা একসময় সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়েছিল। অনেকেই বলতেন, উনি (বঙ্গবন্ধু) আবার ভাষা আন্দোলন কীভাবে করেছেন, উনি তো জেলেই ছিলেন। মানে জেলে থাকার কারণে যেন তিনি ভাষা আন্দোলনে কোনো অবদানই রাখেননি। কিন্তু সেই ’৪৮ সাল থেকে তিনিই যে ভাষা আন্দোলনটা শুরু করলেন সে কথাটা অনেকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করেছেন। ঠিক একইভাবে আমরা যদি ’৭৫ থেকে ’৯৬ পর্যন্ত দেখি, তখনো ওই একই ঘটনা দেখি।

তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যেই আপনারা ইতিহাস পাবেন। মূলত ভাষণটি ছিল ২৩ মিনিটের। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সে সময় মাঠে উপস্থিত ছিলাম। মঞ্চের সামনে নয়, ঠিক পাশেই। যেটা রেকর্ড করা হয়েছিল সেটা ১৮/১৯ মিনিটের রেকর্ড। সেই ভাষণে বাংলাদেশের জনগণের সেই ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস তাদের সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতি সংগ্রামে রক্ত দেওয়ার ইতিহাস, সবকিছু বিবৃত করে ভবিষ্যতে কি করতে হবে অর্থাৎ একটা গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি কীভাবে নিতে হবে, এমনকি তিনি যদি না থাকতে পারেন বা হুকুম দিতে নাও পারেন— তখন কী করতে হবে সে কথাগুলোও তিনি বলে গেছেন।

তিনি আরও বলেন, জাতির পিতার নেতৃত্বে যে আন্দোলন সংগ্রাম এবং তিনি যে এদেশকে স্বাধীন করতে চান, সন্তান হিসেবে পরিবারের সদস্য হিসেবে এ কথা আমরা সব সময় উপলদ্ধি করতে পারতাম। কিন্তু আমাদের ওপর নির্দেশই ছিল— এ কথা আমরা বলতে পারব না। বঙ্গবন্ধু প্রতিটি ক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে গেছেন। ছয় দফা দেওয়ার পর তার জীবনের ওপর অত্যাচার নেমে এলো। তিনি কিন্তু থেমে থাকেননি। তখন একটা ষড়যন্ত্র ছিল তাকে ফাঁসি দিয়ে মেরে ফেলা হবে। বাংলাদেশের মানুষ বসে থাকেনি। তিনি কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে চাননি। যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ তারা কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে পারে না। আমরা ওদের বিদায় দেব। আমাদের পতাকা, জাতীয় সংগীত, এই ভূ-খণ্ডের নাম বাংলাদেশ হবে— তাও তিনি ঠিক করেছেন। জাতীয় সংগীত যে আমার সোনার বাংলা এই সিদ্ধান্তও তিনি দিয়েছেন। জয়বাংলা স্লোগান— এই স্লোগান মাঠে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ছাত্রলীগকে যে, তোমরা এই স্লোগানটিকে মাঠে নিয়ে যাও।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন ট্রাস্টের সদস্য সচিব শেখ হাফিজুর রহমান, বক্তৃতা করেন ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাশুরা হোসেন, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা এবং সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এ. আরাফাত।  

শেখ হাসিনা বলেন, কিন্তু তিনি (বঙ্গবন্ধু) সব সময় তার বক্তৃতা এমনভাবে রাখতেন যে পশ্চিমারা এতটুকু সন্দেহ করতে না পারে, ধরতে না পারে তিনি কী করতে যাচ্ছেন। এটাই একজন রাজনৈতিক নেতার দূরদর্শিতা। আমাদের কোনো কোনো নেতা তো বলেই ফেলেছেন, ভোটের বাক্সে লাথি মারো বাংলাদেশ স্বাধীন করো। ভোটের বাক্সে লাথি মেরে কখনো কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন করা যেত না। কেউ কেউ আসলামু আলাইকুম বলে পাকিস্তানকে বিদায় করেছেন। কিন্তু পাকিস্তান বিদায় হয়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু জানতেন কী করতে হবে।  

অনুষ্ঠানে আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, আমার একটা প্রত্যাশা ছিল— আমাদের নতুর প্রজন্মের যারা ইতিহাস বিকৃতির সময় বেড়ে উঠেছে— তাদের মনের আকাঙ্ক্ষা কি তা জানা? আজকের মূল প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে তা জানা হলো। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন বাঙালির হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু থাকবেন।

বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন মানুষ মাত্র ৫৪ বছর বেঁচে ছিলেন। এই সময়ে তিনি দুটা স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু ’৭৫-এর পরে তার এই ভাষণও বাজাতে দেওয়া হতো না। এই ভাষণ বাজাতে গিয়ে ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের কত নেতা-কর্মী হত্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন! একটা সময় বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়াটাই নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেকগুলো ছবির মাঝে বঙ্গবন্ধুর ছবিটা লুকিয়ে রাখতে হতো। কিন্তু কেন? তার অপরাধ কী ছিল? তার অপরাধ ছিল ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর শোষণের হাত থেকে একটা জাতির স্বাধীনতা এনে দেওয়া। আসলে পাকিস্তানি হানাদার আর তাদের দোসর বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

৭ মার্চের ভাষণের পটভূমি তুলে ধরে তিনি বলেন, ’৬২ সাল থেকেই একেবারে মহকুমা এবং থানা পর্যায় পর্যন্ত ছাত্রলীগের মাধ্যমে তিন সদস্যবিশিষ্ট নিউক্লিয়াস গঠন করে তিনি প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। যখন রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল তখনো তিনি এটা করেছিলেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow