Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : সোমবার, ১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১২ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৪৫
সাবমেরিন উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী
কেউ আক্রমণ করলে সমুচিত জবাব
রিয়াজ হায়দার, চট্টগ্রাম
কেউ আক্রমণ করলে সমুচিত জবাব
চট্টগ্রামে গতকাল সাবমেরিন ‘নবযাত্রা’ ও ‘জয়যাত্রা’ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা —বাংলাদেশ প্রতিদিন

অগ্নিঝরা স্বাধীনতার মাসে নৌবাহিনীর ত্রিমাত্রিক যাত্রায় ‘জয়যাত্রা’ ও ‘নবযাত্রা’ নামে দুটি সাবমেরিন (ডুবো যুদ্ধজাহাজ) কমিশনিংয়ের মধ্য দিয়ে নতুনতর ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। টর্পেডো ও মাইনে সুসজ্জিত ও শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ এবং ডুবো জাহাজে আক্রমণ চালাতে সক্ষম এই সাবমেরিন দুটোর কমিশনিং অনুষ্ঠানে গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা কারও সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হতে চাই না।

তবে কেউ আক্রমণ করলে যেন সমুচিত জবাব দিতে পারি সে জন্য বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম নেভাল বার্থে ‘নবযাত্রা’ অধিনায়ক কমান্ডার কে এম মামুনুর রশিদ ও ‘জয়যাত্রা’ অধিনায়ক লে. কমান্ডার মাজহারুল ইসলামের হাতে কমিশনিং ফরমান তুলে দেন। সাবমেরিন দুটির নামফলকও উন্মোচন করেন। এ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য আয়োজনে রেঙে ওঠে নৌ-ঘাঁটি। তিনি নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ বিএনএস বঙ্গবন্ধু এবং নৌ-কমান্ডোদের মহড়া প্রত্যক্ষ করেন। কর্ণফুলীর বুক ও আকাশপথে দারুণ প্রকাশ ঘটে নৌবাহিনীর ত্রিমাত্রিক সক্ষমতার। ঐতিহাসিক এ মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে আলোর দারুণ বিচ্ছুরণের পাশাপাশি তোপধ্বনির ক্ষণটি মনে রাখার মতো। আর এ সময় সক্ষমতার পরিচিতি মহড়ায় বানৌজা বঙ্গবন্ধু, নেভাল এভিয়েশনের দুটি হেলিকপ্টার, দুটি এমপিএ বিমান ও স্পেশাল ফোর্স সোয়াডসের ছয়টি কমান্ডো বোট অংশ নেয়। বীরের জাতি হিসেবে সাবমেরিনার নৌ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মনোবল চাঙ্গা রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। ‘বিএনএস শেখ হাসিনা’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটির ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন। এটিই বাংলাদেশের প্রথম সাবমেরিন ঘাঁটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। নতুন ঘাঁটির ভিত্তি স্থাপন এবং সাবমেরিন কমিশনিংয়ের পর প্রধানমন্ত্রী নৌবাহিনী সদস্যদের আত্মবিশ্বাস আর আত্মমর্যাদা নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। এর আগে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম নৌ-ঘাঁটিতে পৌঁছলে নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ এবং চট্টগ্রাম নৌ-ঘাঁটির কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. আবু আশরাফ তাকে স্বাগত জানান। নৌবাহিনীর একটি চৌকস দল এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়। প্রধানমন্ত্রী সাবমেরিন দুটি ঘুরে দেখেন এবং সাবমেরিনের যাবতীয় সক্ষমতার বিষয়ে তাকে অবহিত করা হয়। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, সম্পাদক এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সিনিয়র সাংবাদিকবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, আমাদের অর্থনীতি সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খানসহ বিভিন্ন দৈনিকের সম্পাদকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথির ভাষণে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে একটি শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আজ একটি ঐতিহাসিক দিন। এ দিনটি শুধু বাংলাদেশ নৌবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য নয়, সমগ্র বাংলাদেশের জন্য এটি এক বিশেষ দিন। স্বাধীনতার এই মাসে আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন সাবমেরিন বাংলাদেশের নৌবাহিনীতে যুক্ত হলো। একটি আধুনিক ও শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথে বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে গেল। পৃথিবীর মাত্র গুটিকয় দেশ সাবমেরিন পরিচালনা করে থাকে, সেই তালিকায় যুক্ত হলো বাংলাদেশের নাম। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার। ’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দুটি সাবমেরিন বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুক্ত হওয়ায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার হওয়ার ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সক্ষমতা অর্জন করল। প্রধানমন্ত্রী দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের খণ্ড চিত্র তুলে ধরে বলেন, বিশ্বে এখন বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। পাঁচ কোটি মানুষ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উঠে এসেছে। আমাদের প্রবৃদ্ধি এখন ৭.১১ ভাগে উন্নীত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা কারও সঙ্গে কখনো কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হতে চাই না। কিন্তু কেউ যদি আক্রমণ করে তাহলে আমরা যেন তার সমুচিত জবাব দিতে পারি সে প্রস্তুতি আমাদের থাকবে। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা যা যা করণীয় তা করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের যা যা প্রয়োজনীয় তা আমরা সংগ্রহ করব। কারণ, এগুলো হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। মূলত ’৯৬ সালে সরকার গঠনের পর থেকেই এ পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রশ্নে তার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পুনরুল্লেখ করে বলেন, আমাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে আমাদের প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অথবা দেশের ভিতরে কেউ যেন কোনো ধরনের অশান্তির সৃষ্টি না করতে পারে এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে সে জন্য আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমাদের ভূখণ্ড কাউকে এ ধরনের সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহার করতে দেব না— সেটা আমাদের সিদ্ধান্ত। আমরা সেভাবেই আমাদের পদক্ষেপ নিচ্ছি। এদিকে বিকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বোট ক্লাবে ‘শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার’ উদ্বোধনকালে উন্নয়নবিরোধী ও অপকর্মকারীদের সতর্ক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি দুর্নীতি করতে, কমিশন খেতে, ব্যবসা করতে ক্ষমতায় আসিনি। উন্নয়ন কাজে কেউ গাফিলতি করলে সহ্য করব না। অপকর্ম যদি কেউ করে, সে যেই হোক, তাকে ছাড়ব না। কর্ণফুলীর ভাগ্য যাতে বুড়িগঙ্গার মতো না হয় সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। বক্তব্যের আগে চট্টগ্রাম মহানগর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরায় কর্ণফুলী নদীর তীরে সাড়ে ৩৫ একর জমির ওপর নির্মিত শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার উদ্বোধন করেন তিনি। বর্তমানে এই শোধনাগার থেকে চট্টগ্রাম নগরে প্রতিদিন ১৪ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। জাপানি দাতা সংস্থা জাইকার অর্থ সহায়তায় ১ হাজার ৮৪৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ‘দুর্নীতি করলে এত উন্নতি করতে পারতাম না’ মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ব্যবসা করতে আসিনি। জনগণের সেবাই আমার কাজ। পদ্মা সেতুর বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক আমাকে অনেক যন্ত্রণা দিয়েছে। শুধু আমাকে নয়, আমার বোন, ছেলে-মেয়ে, ছেলের বৌ, মন্ত্রী, সচিব, উপদেষ্টা সবাইকে যন্ত্রণা দিয়েছে। কিন্তু আমি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলাম। আজ প্রমাণ হয়েছে, বিশ্বব্যাংক মনগড়া বানোয়াট অভিযোগ করেছিল।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow