Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৬ মার্চ, ২০১৭ ২২:৫৮
জঙ্গি আস্তানায় বিস্ফোরণ
সীতাকুণ্ডে রাতভর গোলাগুলি, আত্মঘাতী হামলা, শিশুসহ নিহত ৫
মুহাম্মদ সেলিম, সীতাকুণ্ড থেকে ফিরে
জঙ্গি আস্তানায় বিস্ফোরণ
সীতাকুণ্ডের জঙ্গি আস্তানা ‘ছায়ানীড়ে’ গতকাল সকালে বিশেষ অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী —বাংলাদেশ প্রতিদিন

বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা। সীতাকুণ্ডের প্রেমতলার ‘ছায়ানীড়’ ভবন।

১৫ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস বন্দীদশা থেকে ২১ সাধারণ মানুষকে উদ্ধার এবং জঙ্গিদের ঘায়েল করতে পুলিশ, সোয়াত ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিট নামে ‘অপারেশন অ্যাসল্ট সিক্সটিন’ নামের দুর্ধর্ষ এক অভিযানে। এ সময় গুলিবিনিময় ও বিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো প্রেমতলা এলাকা। চলে পাল্টাপাল্টি গুলি। জঙ্গিরা বিস্ফোরণ ঘটায় শক্তিশালী বোমার। কিন্তু ঘায়েল হয় এক নারীসহ চার জঙ্গি। ওই ভবন থেকে একটি শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। ধারণা      করা হচ্ছে, জেএমবি সদস্যের সন্তান ওই শিশু। অক্ষত উদ্ধার করা হয় ২১ জনকে। এরপর আরও ৩ ঘণ্টা পর সকাল সোয়া ১০টায় সমাপ্তি ঘোষণা করা হয় ১৯ ঘণ্টার ওই রুদ্ধশ্বাস অভিযানের। অভিযানের পর চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাতেই ওই বাড়িতে অভিযানের একাধিক চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জিম্মিদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কৌশলে ভোরে অভিযান চালানো হয়। এ সময় জঙ্গিরা “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি দিতে দিতে বিস্ফোরণ ঘটায়। তারা ভবনের ভিতর থেকে গ্রেনেড ছোড়ে। এতে দুই সোয়াত সদস্য আহত হন। অভিযানে নিহত হয় চার জঙ্গি। পরে ওই ভবনে আটকে পড়া ২১ জনকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ’ তিনি জানান, নিহত চার জঙ্গির মধ্যে দুজনের হাত, পা ও মুখমণ্ডল বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তাদের চেহারা চেনার উপায় নেই। বাকি দুজনের চেহারা চেনা যাচ্ছে। ছাদ ও ভবনের বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর বোমার সরঞ্জাম দেখা গেছে। এসব বিস্ফোরক ও বোমা নিষ্ক্রিয় করতে পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল কাজ করছে। নিহত জঙ্গিদের পরিচয় জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এডিসি কাজী সানোয়ার আহমেদ বলেন, ছায়ানীড় থেকে উদ্ধার সরঞ্জাম দিয়ে ৪০ থেকে ৫০ কেজি বোমা বানানো যেত। আস্তানা থেকে বোমা তৈরির এক্সক্লুসিভ সব সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি কার্টনে অ্যাসিড, লিকুইড কেমিক্যাল ও ১২ সেট জেল এক্সক্লুসিভ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ‘আত্মঘাতী জঙ্গিদের আত্মহননের ক্ষেত্রে অতীতে এত শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি বাংলাদেশে। ৩ থেকে ৪ কেজি ওজনের যে বোমার বিস্ফোরণ তারা ঘটিয়েছে, এটা যদি কোনো জনবহুল এলাকায় ঘটানো হতো, তাহলে ৫০ গজের মধ্যে থাকা সবাই মারা যেত। এ সীমানার বাইরে থাকা ব্যক্তিরা গুরুতর আহত হতো। ’ সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বুধবার দিবাগত রাতে একাধিকবার ছায়ানীড় দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। প্রতিবারই জঙ্গিদের বাধা এবং জিম্মিদের ক্ষয়ক্ষতির কথা চিন্তা করে অপারেশন থেকে সরে আসা হয়। রাত ১টার মধ্যেই চট্টগ্রাম রেঞ্জ ও সিএমপির পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে যোগ দেন ডিএমপির সোয়াত ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সদস্যরা। এরপর দীর্ঘক্ষণ চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বৈঠক। ওই বৈঠকেই নামকরণ করা হয় ‘অপারেশন অ্যাসল্ট সিক্সটিন’-এর। ভোর ৬টায় দিনের আলো ফুটলে অপারেশনে নামে যৌথ বাহিনী। ‘অপারেশন অ্যাসল্ট সিক্সটিন’ সদস্যরা ছায়ানীড় ভবনের অভিমুখী যাত্রা করতেই গুলি ছোড়ে জঙ্গিরা। কয়েক মিনিট গুলিবিনিময় হওয়ার পর ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে এক শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। এ বিস্ফোরণে পুরো এলাকাই কম্পিত হয়। এরপর অনেকক্ষণ চলে গুলিবিনিময়। ৬টা ৪০ মিনিটে গুলিবিনিময় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয় আহত সোয়াত টিম সদস্য শাওরিত হাসান ও আসিফ আহম্মদ সাদকে। ৮টার দিকে ভবনে বন্দীদশায় থাকা ২১ জনকে উদ্ধারের জন্য অভিযান শুরু করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। তারা ভবনের গ্রিল কেটে বের করে নিয়ে আসেন ভবনমালিক রেহেনা আক্তারের পরিবার, ভাড়াটিয়া দিদারের পরিবার, সেলিম মেম্বারের পরিবার, সাবিনা ইয়াসমিনের পরিবার, মর্জিনা ইয়াসমিনের পরিবার, আনিসুর রহমানের পরিবারসহ ওই ভবনে থাকা সাত পরিবারের ২১ সদস্যকে। জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে কয়েকটি শিশু রয়েছে। উদ্ধার হওয়ার পর শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলেও তাদের চেকআপের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকালে ওই ভবনের নিচতলা থেকে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ধারণা করছে, নিহত ওই শিশু নারী জঙ্গির সন্তান। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুর এ আলম মিনা বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল ভবনে আটকে পড়াদের নিরাপদে মুক্ত করে জঙ্গিদের ঘায়েল করা। পরিকল্পনামতো আমরা সফল হয়েছি। ভবনে আটকে পড়াদের কোনো ক্ষতি ছাড়াই জঙ্গিদের ঘায়েল করেছি। ’

জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, বিকালে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। একই সময় ওই ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয় নির্মল ভৌমিক নামে এক ব্যক্তিকে। অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে থাকা ফায়ার সার্ভিসের সদস্য মনিরুজ্জামান বলেন, ‘জঙ্গিরা আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। বিস্ফোরণে জঙ্গিদের শরীরের বিভিন্ন অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ভিতরের প্রকৃত চিত্র বুঝতে না পারায় দীর্ঘ সময় সেখানে অভিযান থেকে বিরত থাকেন সোয়াত ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সদস্যরা। পরে ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় বাড়িটিতে প্রবেশের জন্য বিকল্প দরজা তৈরি করে সেখানে প্রবেশ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ’ ‘ছায়ানীড়’ ভবনের মালিক রেহেনা আক্তারের বোনের জামাই আবু বক্কর বলেন, ‘জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার হওয়া বাড়ির মালিক রেহেনা আক্তার এবং তার দুই ছেলে নঈম উদ্দিন ও নাছির উদ্দিনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চেকআপের পর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, তাদের থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ’

টার্গেট ছিলেন বিদেশিরা : বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে এবং বিদেশিদের ওপর হামলা চালাতেই সীতাকুণ্ডে দুটি আস্তানা গড়ে তোলে নব্য জেএমবি। এ আস্তানায় অবস্থান করে বিদেশিদের ওপর হামলার নীলনকশা তৈরি করে জঙ্গিরা। সীতাকুণ্ডের ছায়ানীড়ে ‘অপারেশন অ্যাসল্ট সিক্সটিন’ শেষে এমন তথ্য জানান চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইলাম। তিনি বলেন, ‘নব্য জেএমবির সদস্যরাই এ দুই আস্তানা গড়ে তুলেছে। তাদের টার্গেট ছিল মিরসরাই-সীতাকুণ্ড অঞ্চলে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশিদের ওপর হামলা করা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনাও ছিল তাদের। এ লক্ষ্যে প্রচুর গ্রেনেড ও বিস্ফোরক মজুদ করা হয় এ দুই আস্তানায়। বড় ধরনের নাশকতা করে বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে চেয়েছিল তারা। ’ তিনি বলেন, ‘অপারেশন শেষে বোমা ও বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করার কাজ করছে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। ছায়ানীড় ভবনের দুই রুম, ছাদসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর বিস্ফোরক মজুদ রয়েছে। এগুলো নিষ্ক্রিয় করতে সময় লাগবে। ’

এলাকাজুড়ে ছিল আতঙ্ক-উৎকণ্ঠা : সীতাকুণ্ড পৌর এলাকার দেড় কিলোমিটারের মধ্যে দুটি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়ার পর সীতাকুণ্ড, প্রেমতলাসহ আশপাশ এলাকায় গতকাল সারা দিন ছিল উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক। ওই এলাকার স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই ছিল বন্ধ। এমনকি অতি জরুরি কাজ ছাড়া বাইরে বের হননি এলাকাবাসী। আলোচিত ছায়ানীড় ভবনের কয়েক শ গজের মধ্যেই ছিল সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজ ও এভারগ্রিন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল। গতকাল নোটিস দিয়ে বন্ধ রাখা হয় এভারগ্রিন স্কুল। খোলা থাকলেও কোনো ক্লাস হয়নি ডিগ্রি কলেজের। এ সময় কলেজ রোড ও সীতাকুণ্ড সদরের অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ। কলেজ রোডের মুদি দোকানি মো. হারুন বলেন, ‘অভিযান শুরুর পর স্থানীয় লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। পুলিশও দোকান বন্ধ রাখতে বলে। তাই দোকান বন্ধ রেখেছি। ’

জঙ্গিবাদ নির্মূল না হলেও নিয়ন্ত্রণ করা গেছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে জঙ্গিবাদ, নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, মাদকের বিরুদ্ধে দেশবাসী আজ রুখে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, এগুলো এখনো নির্মূল করা সম্ভব না হলেও নিয়ন্ত্রণ করা গেছে।

এখনো ষড়যন্ত্রকারীরা ঘাপটি মেরে রয়েছে। থেমে নেই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরাও। গতকাল জিলা স্কুল মাঠে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী এক সমাবেশে তিনি একথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে হত্যার সুযোগ খুঁজছে। তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যদি কেউ এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয় তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে। মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত রাখতে আবারও আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জয়ী করুন। জেলা পুলিশ প্রশাসন ও যশোর পৌরসভার আয়োজনে এ সমাবেশে পুলিশের খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি এসএম মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক, সংসদ সদস্য মনিরুল ইসলাম, সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ ও সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টাচার্য। এ ছাড়া অন্যদের মধ্যে জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার, যশোর পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম রেন্টু চাকলাদার প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। সমাবেশ থেকে যশোর শহরকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার প্রক্রিয়া, পৌর এলাকায় বসবাসরত মুক্তিযোদ্ধাদের হোল্ডিং ট্যাক্সমুক্তকরণ এবং হ্যালো যশোর পুলিশ অ্যাপসের উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই অনুষ্ঠানে ৮৬৬ জন মাদক ব্যবসায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। অনুষ্ঠানে কোতোয়ালি থানার জন্য একটি অত্যাধুনিক পিকআপ ভ্যানের চাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow