Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, সোমবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৪৮
আগুনঝরা মার্চ
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন পালিয়ে যাব না মোকাবিলা করব
মওদুদ আহমদ
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন পালিয়ে যাব না মোকাবিলা করব

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সন্ধ্যার দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ল পাকিস্তানি শাসক ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সব সমঝোতা ভণ্ডুল হয়ে গেছে। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সমঝোতায় প্রায় এসে গিয়েছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের সব বিষয় বঙ্গবন্ধু নির্ধারণ করবেন।

তার সমগ্র পাকিস্তান সম্পর্কে আগ্রহ ছিল কম। যদিও বঙ্গবন্ধুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল জাতীয় পরিষদে। ইয়াহিয়া খান ঘোষণাও দিয়েছেন পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব। কিন্তু বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের অধিকার ও স্বাধীনতা, যাতে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনভাবে দেশ চালাতে পারে। তবে যখন ইয়াহিয়া-বঙ্গবন্ধুর সব সমঝোতা ভেঙে গেল, তখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা সিদ্ধান্ত নিল, কীভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আমরা সেদিন সন্ধ্যার পরই সাংঘাতিক রকমের ভয়ভীতি আর উত্কণ্ঠার মধ্যে ছিলাম। চরম উত্তেজনা কাজ করছিল প্রতিটি মুহূর্তে। বর্তমান হোটেল রূপসী বাংলা ছিল ঢাকার একমাত্র আন্তর্জাতিক হোটেল যার নাম ছিল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল। সেই হোটেলে বিদেশি ৪২ জন সাংবাদিকও ছিলেন। তারা ছিলেন সারা পৃথিবীখ্যাত। আমি তখন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করতে গিয়েছিলাম, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সর্বশেষ অবস্থা। রাত ৯টার দিকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের লবিতে একটা বড় কালো শ্লেটে চক দিয়ে বড় করে লেখা ছিল, ‘আপনারা কেউ হোটেলের বাইরে যাবেন না। ’ সাংবাদিকদের নিয়ে আমরা চলে গেলাম ১১ তলার পশ্চিম কোণের কয়েকটি কামরায়। আমি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ৪২ জন সাংবাদিককে ব্রিফ করেছিলাম বঙ্গবন্ধু কী করছেন, সমঝোতার কী হলো, তার সর্বশেষ কী অবস্থা এসব বিষয়ে। তাদের বললাম, সংলাপ ভেঙে গেছে, সংলাপ থেমে গেছে। এখন পাকিস্তানি আর্মি টেক ওভার করতে যাচ্ছে। তখনই ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা হয়, কেউ যেন হোটেল থেকে না বের হন। তখনই সাংবাদিকরা বুঝে ফেললেন বাংলাদেশে কী হতে যাচ্ছে। আমি শুনেছিলাম সন্ধ্যা ৬টার দিকেই ইয়াহিয়া খান ঢাকা ছেড়েছেন। রাত ৯টার পরপরই সুগন্ধা থেকে জিপে করে রাইফেল তাক করে পাকিস্তানি আর্মি গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছে। উত্তরের জানালা দিয়ে দেখলাম ভিআইপি রোড দিয়ে ট্যাঙ্ক ও লরি নিয়ে আর্মি ধেয়ে আসছে। সাকুরার পাশে ছিল ইংরেজি দৈনিক পিপল পত্রিকার অফিস। পাকিস্তানি সেনারা ট্যাঙ্ক থেকে নেমে গেল। তারা ‘আল্লাহু আকবার’ বলে পিপল অফিসে গিয়ে আধা ঘণ্টা অবস্থান করে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিল। পত্রিকা অফিসের সেখানে কেউ ছিলেন না। পরে পাকিস্তানি সেনারা গাড়িতে উঠে ধানমন্ডির দিকে রওনা দিতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে যাওয়ার পর তারা ব্যাপক গুলিবর্ষণ করে। আমরা জানালা দিয়ে মোটামুটিভাবে সব আন্দাজ করতে পারলাম, মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ হচ্ছে। আমি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ফোন করেছিলাম। ফোনটা ধরেছিলেন হাজী মোর্শেদ বলে কুষ্টিয়ার এক ব্যক্তি। আমি বলেছিলাম, পাকিস্তান আর্মির গাড়িবহর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের দিকে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু যেন নিরাপদে সেখান থেকে সরে পড়েন। হাজী মোর্শেদ বললেন, ‘না, বঙ্গবন্ধু সরে যাবেন না। আমরা উনাকে বার বার বলেছি, কিন্তু উনি রাজি হচ্ছেন না। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, আমি কোথাও পালিয়ে যাব না। যা হবার এখানেই হবে। তারা এলে আমি এখান থেকেই মোকাবিলা করব। ’ সন্ধ্যার পরই বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে সব নেতা-কর্মী চলে যান। বিকালে আমিও সেখানে ছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা সরে পড়। তোমরা যে যেখানে থাকো প্রস্তুতি নাও। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ কর। আমি এখান থেকেই মোকাবিলা করব। ’ ২৫ মার্চ রাত ১০টার দিকে আমরা দেখলাম হোটেল কন্টিনেন্টালে তিনটি কালো মার্সিডিজ গাড়ি এলো। জুলফিকার আলী ভুট্টো গাড়ি থেকে নামলেন। আমরা পশ্চিমের স্যুইটে ছিলাম, আর তিনি ছিলেন পূর্বের স্যুইটে। সব সাংবাদিক গেলেন তার সঙ্গে কথা বলতে। আমিও গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি রিফিউজ করলেন। কারও সঙ্গে কথা বললেন না। তারপর আমরা সবাই ফিরে এলাম। রাতে দ্বিতীয় দফা যখন বঙ্গবন্ধুকে টেলিফোন করি, তখন আর লাইনে পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল। বোধহয় তখন রাত ১২টা হবে। চারদিকে গোলাবারুদের গন্ধ ও হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়ে গেল। সারা ঢাকায় আগুন জ্বলছে। রাত দেড়টার দিকে ইন্টারকন্টিনেন্টালে এয়ারফোর্সের একটা বাস এলো। বিদেশি সাংবাদিকদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে। সাংবাদিকদের ৫ মিনিট টাইম দিল, দ্রুত বের হওয়ার জন্য। দ্রুত সবাই নিচে নেমে এলেন। আমি সেখানে রয়ে গেলাম। সেখানে আরও দুজন সাংবাদিক রয়ে গেলেন। একজন সাইমন ড্রিং, অন্যজন অ্যাসোসিয়েট প্রেসের ফটোসাংবাদিক। সাইমন ড্রিং পরে বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেল ইটিভির প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যাকে বিছানার নিচে রেখে তোশক-চাদর দিয়ে ঢেকে রেখেছিলাম। এক দিন পর যখন কারফিউ তুলে নেওয়া হলো তারপর তাকে ব্রিটিশ হাইকমিশন অফিসে নিয়ে যাওয়া হলো। তাকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে নিয়ে গিয়েছিলাম। অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিনসহ নয়জন প্রফেসরকে হত্যার দৃশ্য তাকে দেখিয়েছিলাম। সেখানে মৃতদেহগুলো পড়ে ছিল। আমিও নিজের চোখেই দেখেছিলাম। ২৭ মার্চ কারফিউ তুলে নেওয়া হলে আমি আর ঢাকায় থাকলাম না। আমরা কয়েকজন মিলে সিলেট হয়ে ত্রিপুরায় চলে গেলাম। কয়েকজন সাংবাদিকের নাম বলতেই হয়— জন টিলজার, মার্টি রুলাফড, মার্টি রেইডনি, পিটার ডিলসহ বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিকরা ছিলেন আমার সঙ্গে। তাদের যখন ঢাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়, তখন তাদের কাপড়-চোপড় এবং উলঙ্গ করে জুতা ও কাপড় খুলে খাতা ও বইপত্র, ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে তাদের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আর সাইমন ড্রিং রয়ে গিয়েছিলেন। দুই দিন পর তিনি ব্রিটিশ হাইকমিশন হয়ে লন্ডনে ফেরেন। তিনি যখন বাংলাদেশের বাইরে চলে গেলেন, তিনিই প্রথম বাংলাদেশের হত্যাযজ্ঞের কথা পৃথিবীর কাছে তুলে ধরেন। তার সুবাদেই পৃথিবীবাসী বাংলাদেশের ওই সময়কার হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে জানতে পারে। আমার মনে আছে, স্বাধীনতাযুদ্ধের ৯ মাসে আমি অন্তত ২৫০ জন বিদেশি সাংবাদিককে ব্রিফ করেছি কলকাতায়। তবে ওই দিনগুলো আর কোনো দিন আমাদের জীবনে ফিরে আসবে না। ওই গৌরবময় উত্তেজনাপূর্ণ সংগ্রামী দিনগুলো এখন শুধুই ইতিহাস।

লেখক : স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি ও সাবেক আইনমন্ত্রী।

অনুলিখন : মাহমুদ আজহার।

up-arrow