Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২২:২৯
তীব্র নিন্দা নিরাপত্তা পরিষদের
গভীর উদ্বেগ ও মিয়ানমারকে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে প্রথমবারের মতো বিবৃতি রোহিঙ্গারা সর্বনাশা সংকটে : জাতিসংঘ মহাসচিব । নতুন শরণার্থী ৩ লাখ ৮০ হাজার
প্রতিদিন ডেস্ক
তীব্র নিন্দা নিরাপত্তা পরিষদের
বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকরা গতকাল রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন —বাংলাদেশ প্রতিদিন

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। গতকাল পরিষদের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এই প্রথমবারের মতো এ নিন্দা জানানো হলো।

একই সঙ্গে এই নির্যাতনে উদ্বেগ প্রকাশ করে তা বন্ধের জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে। এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

এর আগে একাধিকবার রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা হলেও চীন ও রাশিয়ার ভেটোর কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বৈঠকে বলা হয়, নির্যাতনের মুখে কমপক্ষে ৩ লাখ ৮০ লাখ হাজার রোহিঙ্গা দেশটি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বৈঠকে মিয়ানমার সরকারের সমালোচনা করা হয় এবং মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলোকে রাখাইন রাজ্যে গিয়ে নির্যাতনের শিকার মানুষজনের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়। ইথিওপিয়ার রাষ্ট্রদূত তেকেদা এলেমুর সভাপতিত্বে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি দেশের প্রতিনিধি এতে অংশ নেন। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও চাপ অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সু চি সরকার নির্বিকার। আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অং সান সু চি যাবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু জাতিসংঘ তার অবস্থান থেকে সরেনি। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে জাতিসংঘ শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছে। মিয়ানমারের পক্ষে তাদের মিত্ররা অবস্থান নিলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডের নিন্দা ও প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘ বিশ্বমানবতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বার বার সতর্ক করছে মিয়ানমারকে।

নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের মনোভাবের পর মিয়ানমার কোন দিকে অবস্থান নেয় সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। সবারই প্রত্যাশা ইতিবাচকভাবে সংকট নিরসনে মিয়ানমার কাজ করার চেষ্টা করবে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের উচিত শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিয়েছে জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা। এক বিবৃতিতে আল-কায়েদা মিয়ানমারের মুসলিমদের ত্রাণ, অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সারা বিশ্বের মুসমিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে চরম নির্যাতন ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়া রোহিঙ্গাদের সাহায্যের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতারেস। মঙ্গলবার সংস্থাটির সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক সাংবাদিকদের এসব কথা জানিয়েছেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য পাঠানো ত্রাণ সহায়তার সবশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণাও দেন তিনি।

রাখাইনে চলমান সংকট : মিয়ানমারে রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠীর ওপর নির্যাতনের কারণে সৃষ্ট সংকটে যুক্তরাষ্ট্র গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ওই দেশে সহিংসতার আবারও নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্টের আবাসিক দফতর হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি সারাহ স্যান্ডার্সে এক বিবৃতিতে এই উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করেছেন। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস গতকাল প্রেস রিলিজের মাধ্যমে সারাহর বক্তব্য তুলে ধরে। বিবৃতিতে মিয়ানমারকে ‘বার্মা’ বলে উল্লেখ করা হয়।

‘উত্তরাঞ্চলে রাখাইন রাজ্যে চলমান সংকটে যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, যেখানে ২৫ আগস্ট বার্মার নিরাপত্তা পোস্টগুলোয় হামলার জেরে কমপক্ষে ৩ লাখ মানুষ বাসস্থান ছেড়ে পালিয়ে গেছে। আমরা আবারও নিন্দা জানাচ্ছি এসব হামলার, যা সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।

বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা নৃ-গোষ্ঠী ও অন্যান্য সংখ্যালঘু মানুষের ব্যাপকহারে আবাসস্থল থেকে উচ্ছেদ হওয়া ও তাদের ওপর নির্যাতন এটিই প্রমাণ করে যে, বার্মার নিরাপত্তা বাহিনীগুলো বেসামরিক মানুষদের রক্ষা করছে না। নিরাপত্তা বাহিনী এবং তাদের নির্দেশে কাজ করা বেসামরিক নাগরিকদের দ্বারা সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া, গণহারে হত্যাকাণ্ড এবং ধর্ষণের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আমরা শঙ্কিত। আমরা বার্মা কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানাই আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে, সহিংসতা বন্ধ করতে ও কোনো সম্প্রদায়ের বেসামরিক জনগণকে তাদের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ না করতে। রাখাইন কমিশনের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে আমরা বার্মার নিরাপত্তা বাহিনীকে অনুরোধ করছি সে দেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে।

যত দ্রুত সম্ভব মানবিক সহায়তা ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছানোর জন্য বার্মা সরকারের প্রতিজ্ঞাকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা সরকারকে অনুরোধ করছি আক্রান্ত এলাকায় গণমাধ্যমের প্রবেশের অনুমতি দিতে। সহিংসতার কারণে উচ্ছেদ হওয়া রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে এবং আমরা বাংলাদেশ সরকারের মানবিক সহায়তা প্রদানের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করি। ’ এদিকে সংবাদ সম্মেলনে স্টিফেন দুজারিক জানান, ২৫ আগস্টের পর ৩ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তাদের সর্বোচ্চ সহায়তা করছে স্থানীয় প্রশাসন ও লোকজন। নতুনদের আশ্রয় দিতে বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের কাছে সহায়তা চেয়েছে। তিনি আরও জানান, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য দুটি চার্টার্ড বিমানে করে বাংলাদেশে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সহায়তায় পাঠানো প্রথম বিমানে রয়েছে স্লিপিং ম্যাট, বাড়ি তৈরির জিনিসপত্রসহ আরও কিছু জিনিসপত্র। বিমানটি বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর এরই মধ্যে বিমান থেকে এগুলো ট্রাকে নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় বিমানটি আরব আমিরাতের আর্থিক সহায়তার ত্রাণে পূর্ণ ছিল। সেখানে ২ হাজার তাঁবু রয়েছে। দুজারিক জানান, ‘এই ত্রাণে ২৫ হাজার রোহিঙ্গাকে সহায়তা করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া আরও ত্রাণ আসছে যা দিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে সাহায্য করা সম্ভব। ’ নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি। দুজারিক জানান, সংস্থাটি কক্সবাজারে ৭০ হাজার মানুষকে খাবার সরবরাহ করছে। আর কাছের ক্যাম্পগুলোয় ৬০ হাজার মানুষকেও খাবার পৌঁছে দিচ্ছে। মিয়ানমার সীমান্তে দায়িত্ব পালন করা জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মীরা জানান, এখনো সেখানে সহিংসতা চলছে। আগুন দেওয়া হচ্ছে গ্রামগুলোয়। ফলে পালিয়ে আসছেন হাজার হাজার রোহিঙ্গা। রাখাইন রাজ্যে থাকা রোহিঙ্গাদের বাস্তবতার কথা জানাতে গিয়ে জাতিসংঘের মুখপাত্র আরও বলেন, রাখাইনে মানবিক সহায়তা দেওয়া সংস্থাগুলোর মধ্যে জাতিসংঘসহ অন্য বেশির ভাগই তাদের কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে। রেড ক্রস ও সরকার কিছুটা কার্যক্রম চালাতে পারছে বলে জানিয়েছন তিনি। স্টিফেন দুজারিক বলেন, জাতিসংঘ ও তার সহযোগী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের সাহায্য করার ব্যাপারে নিজেদের আগ্রহের কথা জানিয়ে আসছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় যত দ্রুত সম্ভব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বিত ত্রাণ কার্যক্রম চালাতে চান তারা।

আলোচনা ঠেকাতে মরিয়া মিয়ানমার : আসিয়ান সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞের বিষয়টি এড়িয়ে যেতে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে মিয়ানমার। ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি মঙ্গলবার এ খবর দিয়েছে। চলতি মাসের ১০ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, মূল সম্মেলনের আগে আগামী বৃহস্পতিবার ম্যানিলায় আসিয়ানের আন্তসংসদীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

সু চি মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন : মিয়ানমারের কার্যত নেত্রী অং সান সু চি দেশটিতে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আগামী সপ্তাহে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে পালিয়ে যাচ্ছে। আর যারা পালাতে পারছে না তাদের ওপর চলছে নির্যাতনের খড়্গ, এমনকি মৃত্যু। এ অবস্থায় সারা বিশ্বে মিয়ানমার বিশেষ করে তার নেত্রী অং সান সু চির বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।   এএফপি।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow