Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮

প্রকাশ : শনিবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০ টা আপলোড : ১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ২২:৫০
খুনের শহর বগুড়া
আধিপত্য বিস্তার, ভূমি দখল, টেন্ডারবাজি, মাদকের টাকা জোগাড় নিয়ে হত্যালীলা এক বছরে ৯০ খুন
শেখ সফিউদ্দিন জিন্নাহ্ ও আবদুর রহমান টুলু, বগুড়া থেকে
খুনের শহর বগুড়া

একের পর এক খুনের ঘটনা বেড়েই চলেছে উত্তরবঙ্গের গেটওয়ে খ্যাত বগুড়ায়। একসময়ের শান্তির শহর এখন অনেকটা অশান্তির শহরে পরিণত হয়ে উঠেছে। সামান্য ঘটনায় যে কাউকে খুন করা বগুড়ায় সাধারণ ব্যাপার। মাত্র ৫০ টাকার জন্যও খুনের ঘটনা ঘটছে এখানে। এমনকি হাসি-ঠাট্টা করেও খুন করা হয়। গত এক মাসের ব্যবধানে শুধু বগুড়া শহরেই অন্তত নয়টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। শহরের বাইরেও রয়েছে আরও খুনের ঘটনা। আর এসব খুনের শিকার শুধু সাধারণ মানুষই নয়; রাজনৈতিক ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি খুনের শিকার হয়েছেন। যদিও আধিপত্য বিস্তার, ভূমি দখল, টেন্ডারবাজি, মাদকের টাকা জোগাড় ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই খুনের ঘটনা ঘটছে বলে জানায় পুলিশ। গত এক বছরে বগুড়ায় ৯০টির বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আর এসব খুনের বেশির ভাগই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে গত ডিসেম্বরের শুরুর দিকে হঠাৎ বগুড়া শহর ও জেলাজুড়ে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়। চার দিনের ব্যবধানে তিনটি হত্যাকাণ্ডসহ ছিনতাই, ডাকাতির মতো মারাত্মক কয়েকটি ঘটনা ঘটে।

এদিকে বগুড়া শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে ফুলতলায় নিয়মিতই ঘটে মারাত্মক সব ঘটনা। দিনে-রাতে খুনের ঘটনা ঘটে এখানে। কোনো অবস্থাতেই ফুলতলার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই এলাকায় দেদার হচ্ছে খুনের বদলে খুন। আজ একজনকে হত্যা করলে কাল অন্যজনকে হত্যা করা হয়। একসময় ফুলতলায় পেশাদার খুনি আমিনুর রহমান শাহীন ও মজনু মিয়ার আলাদা সন্ত্রাসী বাহিনী ছিল। যদিও শাহীন ও মজনু দুজনই প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয়। তবে এদের অপকর্মের রেশ এখনো রয়েছে। ওই এলাকায় সাধারণ মানুষ এখনো আতঙ্কে দিন কাটায়। পেশাদার এই দুই খুনির বাহিনীর সদস্যরা এখনো আধিপত্য ধরে রাখতে সক্রিয়। একের পর এক খুন, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধের ঘটনা ঘটাচ্ছে। আর এর অনেকটা প্রভাব বগুড়া শহরেও পড়ে বলে একাধিক সূত্র জানায়। বগুড়া থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক তৌফিক হাসান ময়না বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘খুন-খারাবির কারণে বগুড়া এখন অসুস্থ নগরীতে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব আমাদের মধ্যে যেমন পড়ছে, ঠিক পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও পড়বে।’

তবে বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘খুনের ঘটনা বেশি থাকলেও এখন বগুড়া শহর অনেকটা শান্ত। তবে ঘটনাগুলোর বেশির ভাগই আমরা উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। দুষ্কৃতিকারীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নেওয়া হচ্ছে।’বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গডফাদাররা ক্ষমতাধর হওয়ায় পুলিশ মূল ঘাতকদের ধরতে পারছে না। এমনকি গ্রেফতার করলেও তারা জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও খুনসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। আর এসব কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। তবে পুলিশের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্য সময়ের চেয়ে এখন অনেক ভালো। এদিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত অধিকাংশ আসামি গ্রেফতারই হয়নি। বেশির ভাগ হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। ফলে খুনের মামলাগুলোর বিচারকাজ শুরু করা যায়নি। তবে পুলিশ বলছে, বেশির ভাগ খুনির বয়স ১৬ থেকে ২০ বছর। এই তরুণরা প্রথমে মাদক সেবন, এরপর ছোটখাটো চুরি, ছিনতাই এবং শেষে হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। শহরের চেয়ে গ্রামেই মানুষ বেশি খুন হয়। তবে সেখানে খুনের কাজে চাকু-ছোরার ব্যবহার হয় বেশি। কিন্তু বগুড়া শহরে খুনের ঘটনায় পিস্তল ও রিভলবারের ব্যবহার বাড়ছে। শহরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুনের ঘটনা বেশি ঘটেছে। এ ছাড়া মাদক সেবন, সন্ত্রাসী-সন্ত্রাসী টক্কর, টেন্ডার ও চাঁদার টাকার ভাগ-বাটোয়ারা, জায়গা দখল ও বালুমহাল নিয়ে শহরে বেশি মানুষ খুন হয়। এদিকে গ্রামাঞ্চলে জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করেই খুনের ঘটনা বাড়ছে। তা ছাড়া দাম্পত্য কলহ, পরকীয়ার কারণেও গ্রামে খুনের ঘটনা ঘটছে। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খোদ বগুড়া সদর থানায় গত তিন মাসে ৩৮৯টি মামলা রুজু হয়েছে। এর মধ্যে খুনের মামলাই সাতটি। বগুড়া সদর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিগত দিনের চেয়ে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। আগে প্রতিনিয়ত খুনের ঘটনা ঘটত। ২৮ নভেম্বর রাতে যশোর থেকে সেনা সদস্য আশরাফুল ইসলাম বগুড়ায় আসেন। তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট সফিকুল ইসলাম তাকে আনতে বাসস্ট্যান্ডে যান। বগুড়ার শাকপালা বাসস্ট্যান্ডে গাড়ি থেকে নেমে নিজ বাসায় যাওয়ার সময় পাঁচ-ছয় জনের একটি ছিনতাইকারী দল তাদের পথরোধ করে। এ সময় ছিনতাইকারীরা অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট সফিকুল ইসলামকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে সর্বস্ব লুটে নেয়। এতে ওই অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্টের মৃত্যু হয়। সার্জেন্ট সফিকুল ইসলামের বাড়ি নরসিংদী। চাকরির সুবাদে দীর্ঘ সময় বগুড়ায় বসবাস করছিলেন তিনি। এর চার দিনের মাথায় ২ ডিসেম্বর সেনাবাহিনীতে ভর্তি হতে এসে খুন হন সাব্বির নামের এক যুবক। সন্ধ্যার পর শহরের আলতাফুননেছা খেলার মাঠে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যান সাব্বির। এ সময় ১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী দল সাব্বিরকে নানা কিছু জিজ্ঞাসা করে অনেকটা হাসিঠাট্টার ছলে কুপিয়ে হত্যা করে। সাব্বিরের বাড়ি নওগাঁর মহাদেবপুরে। শুধু তাই নয়, শহরের প্রাণকেন্দ্র নিউমার্কেটের আল-হাসান জুয়েলার্সে প্রকাশ্যে ককটেল ফাটিয়ে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় অন্তত ৬০০ ভরি সোনা লুট হয়েছে বলে জানান দোকান মালিক। এ সময় ডাকাত দলকে প্রতিহত করতে পুলিশ ৩৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। ২৭ নভেম্বর বগুড়ার গাবতলীতে বিয়ের দাওয়াত খেয়ে বাড়ি ফেরার পথে তোজাম্মেল হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহত ওই ব্যক্তি দুর্গাহাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি ওই এলাকার মৃত ওসমান মোল্লার ছেলে। ২৯ আগস্ট রাতে একদল ডাকাত নামুজা ভাণ্ডারীবাড়ী এলাকায় জোড়া খুনের ঘটনা ঘটায়। ডাকাতির সময় গৃহকর্ত্রী কাপিয়া সজাগ হলে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। এ সময় পাশে ঘুমন্ত মেয়ে আয়েশা সজাগ হয়ে যায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ডাকাত দল মেয়েকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে। ওই এলাকার হাফিজার রহমানের বাড়িতে বসবাস করতেন গোলাম মোস্তফার স্ত্রী কাপিয়া আক্তার ও মেয়ে আয়েশা খাতুন। ৮ জুলাই রাতে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার সোনারায় ইউপি চেয়ারম্যান তারাজুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় চেয়ারম্যানের স্ত্রী শাপলা বেগমও গুলিবিদ্ধ হন। নিহত ওই চেয়ারম্যান বগুড়া শহর আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন। তিনি বগুড়া শহরের রহমাননগরে বসবাস করতেন। ঈদ উপলক্ষে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি খুন হন। ১৯ অক্টোবর গাবতলীর চরকাতলী এলাকায় জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। সামান্য কথাকাটাকাটির জেরে আপন চাচাতো ভাই আরমান হোসেন ভেটু দা দিয়ে কুপিয়ে মো. জিল্লা ও তার স্ত্রী বুলবুলিকে হত্যা করেন। ১০ নভেম্বর বগুড়া শহরের কলোনির করতোয়া রোড এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যুবলীগ নেতা সামসাদের ছোট ভাই যুবলীগ নেতা আবু সাইদকে প্রতিপক্ষ কুপিয়ে হত্যা করে। তবে পুলিশ বলছে, ওই এলাকায় চাঁদাবাজি নিজেদের দখলে নেওয়ার জন্য প্রতিপক্ষ রাসেল গ্রুপের লোকজন তাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। বগুড়া পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক মো. আসলাম আলী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ড ঘটছে যেমন তেমন পুলিশও জড়িতদের গ্রেফতারে সক্ষম হচ্ছে। অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনার আমরা সফল তদন্ত সম্পন্ন করতে পেরেছি।’

এই পাতার আরো খবর
up-arrow