Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২৩:১৯
জাতিসংঘে ফের আলোচনা, দ্রুত সমাধানের তাগিদ মিয়ানমারকে
প্রতিদিন ডেস্ক
জাতিসংঘে ফের আলোচনা, দ্রুত সমাধানের তাগিদ মিয়ানমারকে

রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের উন্মুক্ত আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, বলিভিয়াসহ ১২টি দেশের স্থায়ী প্রতিনিধিরা বর্বরতা অব্যাহত থাকায় মিয়ানমারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। খবর এনআরবি নিউজ। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে ১৩ ফেব্রুয়ারি সকাল সোয়া ১০টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত এ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। কুয়েতের রাষ্ট্রদূত শেখ সাবাহ খালিদ আল হামাদের সভাপতিত্বে এ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রায় সবাই উল্লেখ করেন, মিয়ানমার সরকারের দমননীতির মুখে প্রাণ বাঁচাতে এখনো রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আলোচনার সূচনা ঘটান জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্দি। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিধ্বনি ঘটিয়ে ফিলিপ্পো গ্র্যান্দি বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে সৃষ্ট এ সংকটের সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে।’ গত ছয় মাসে ৬ লাখ ৮৮ হাজারেরও অধিক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে গ্র্যান্দি বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘শরণার্থীদের নিরাপদে নিজ আবাস ভূমিতে প্রত্যাবর্তনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আন্তরিক অর্থে সোচ্চার হওয়া দরকার।’ সভায় জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব মিরোল্লাভ জেনকা তিনটি পয়েন্ট উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে রাখাইন প্রদেশে দ্বন্দ্ব্ব-সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে, রাখাইনের বর্তমান অবস্থা কী, তা জাতিসংঘের পক্ষে এখনো জানা সম্ভব হয়নি। কারণ, সেই প্রদেশে জাতিসংঘের লোকজন, মিডিয়া এবং স্বেচ্ছাসেবকরা এখনো অবাধে ঢুকতে পারছেন না। এমন অবস্থার অবসান দরকার এবং নিজ আবাসস্থলে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরে স্বাভাবিক জীবনযাপনের গ্যারান্টি মিয়ানমারকে দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি, যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি মার্ক ফিল্ড, রাশিয়া ফেডারেশনের সার্জেই লেভরব, পোল্যান্ডের এন্ড্রেজেজ ডুডা, কাজাখস্তানের নূর সুলতান নজরবায়েভ, সুইডেন, ফ্রাঞ্চের স্থায়ী প্রতিনিধিরাও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে দ্রুত এর অবসান ঘটাতে সবাইকে আন্তরিক অর্থে কাজ করতে হবে। নিকি হ্যালি অত্যন্ত জোরালোভাবে গ্রেফতারকৃত রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান। তিনি মিয়ানমারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান। ব্রিটেনের প্রতিনিধিও বলেন, সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত রাখাইন প্রদেশের প্রকৃত চিত্র জানা কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না। এ ছাড়া উপস্থিত সবাই কফি আনান কমিশনের পূর্ণ বাস্তবায়ন চান। তারা হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের লোকজনকে সরেজমিন অবাধে প্রবেশাধিকার দেওয়ারও দাবি করেন। সভায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, মিয়ানমার সরকার দুটি অভ্যর্থনা কেন্দ্র খুলেছে এবং শিবিরও স্থাপন করেছে। কিন্তু কার্যত কিছুই রোহিঙ্গাদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হচ্ছে না। রোহিঙ্গারা নাগরিক অধিকারসহ নিরাপদে নিজ পৈতৃক আবাসে ফিরে চাষাবাদ করতে চায়। অবাধে চলাফেরা ও সভা-সমিতি করার অধিকার চায়। এগুলো মৌলিক অধিকার, বিধায় বিশ্বসভাকে তা বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশ সবসময় নিকট প্রতিবেশী হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে বদ্ধপরিকর বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সভায় নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য রাষ্ট্রের সবাই প্রায় সাত লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে সাময়িক আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বিষয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেন।

এখনো ঢুকছে রোহিঙ্গা : চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবাসনের জন্য দুই দেশের মধ্যে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয়েছে প্রায় দুই মাস আগে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের পরিবর্তে এখনো বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঘটছে রোহিঙ্গাদের। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে যৌথ স্বাক্ষরে চুক্তি সম্পাদিত হলেও এর ইতিবাচক পদক্ষেপ এখনো শুরুই হয়নি। এর ওপর প্রতিদিন নাফ নদ পার হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখনো এপারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়টি অনেকটাই বলে দেয় সেখানকার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ-প্রতিবেশ কতটুকু রোহিঙ্গাদের অনুকূলে রয়েছে। আর এ বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে দেশি-বিদেশি কূটনৈতিক মহলকে। উত্তর রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা। এ অবস্থায় পালিয়ে আসা ১০ লাখ রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ আসলে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ২৩ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ২৩ জানুয়ারির মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও তা হয়নি। প্রতিদিন ৩০০ জন করে পরিবারভিত্তিক রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানোর জন্য তালিকা তৈরির কাজও শুরু করে বাংলাদেশ সরকার। উদ্বাস্তুদের দুই বছরের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দুই দেশ ঐকমত্যে পৌঁছেছে।

 কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রত্যাবাসন কার্যক্রম এখনো শুরু হচ্ছে না। উল্টো প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ জন করে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু কখনো নাফ নদ সাঁতরিয়ে, কখনো মাছধরার ট্রলারে করে এপারে শাহপরীর দ্বীপ হয়ে অনুপ্রবেশ করছে।

প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী কয়েকটি পুলিশ ও সেনাচৌকিতে গত বছর ২৫ আগস্ট সংঘটিত এক হামলার জের ধরে ওই দিন থেকে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দমন অভিযান শুরু করে সে দেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনী। অভিযান চলাকালে ব্যাপক হারে খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালানোর অভিযোগ ওঠে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের কাছ থেকে পাওয়া এসব ঘটনার স্বীকারোক্তিমূলক বিবরণের ভিত্তিতে অভিযানটিকে জাতিগত নিধন বলে আখ্যা দেয় জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক মহল। এদিকে সোমবারও টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের হাড়িয়াখালী ও ক্ষুরের মুখ পয়েন্টে অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু নৌকায় করে এপারে পালিয়ে এসেছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেসব রোহিঙ্গা ওপারে এখনো আটকে রয়েছে তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। খাবার নেই, আয়-রোজগার নেই, চিকিৎসা নেই, মিয়ানমার সেনা ও বিজিপি এক ধরনের জিম্মি করে রেখেছে তাদের। টাকা-পয়সা সঙ্গে না থাকায় তারা নৌকায় চড়ে বাংলাদেশেও আসতে পারছে না। রাতের আঁধারে নৌকায় করে এদের টেকনাফ পর্যন্ত আনতে মাঝি ও দালালরা ভাড়া নেয় মাথাপিছু ৩০-৪০ হাজার কিয়াত। রাখাইনের বুচিডং থেকে আসা রোহিঙ্গা আলী আহমদ জানান, বাড়ি থেকে বের হলে অথবা কাজের সন্ধানে কোথাও গেলে বর্মি সেনারা তাদের ধরে নিয়ে যায়। এ আশঙ্কায় পালিয়ে এসেছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ থানার ওসি (তদন্ত) শেখ আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘মাঝেমধ্যে অল্পস্বল্প রোহিঙ্গার এখনো আসা অব্যাহত রয়েছে। খবর পেয়ে আমরা তাদের উদ্ধার করে নিকটস্থ ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিই। এ ছাড়া কোনো দালালচক্রের হাতে যেন না পড়ে রোহিঙ্গারা, সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।’ এখন কোনো দালালচক্র রোহিঙ্গাদের হয়রানি করতে পারে না বলেও জানান তিনি। এদিকে দুই দেশের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে চুক্তি হওয়ার পর গত দুই মাসে আরও অন্তত ১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। চুক্তিটি যে মিয়ানমারের একটি কৌশল ছিল, তাও দিন দিন আরও পরিষ্কার হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের কারণে মিয়ানমারের ওপর বিশ্বজনমত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়লে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে মিয়ানমার তা কিছুটা কমাতে পেরেছে। ফলে এ চুক্তিতে মিয়ানমারের স্বার্থ সংরক্ষিত হলেও বাংলাদেশ এ থেকে আদৌ কোনো ফল পাবে কি না, এখন সেই সংশয় দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ১০ রোহিঙ্গাকে নৃশংসভাবে হত্যা এবং এক কবরে তাদের পুঁতে রাখার যে বিবরণ পাওয়া গেছে, তাতে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে সেখানে জাতিগত নিধন চলছে। পরিস্থিতির যে বদল হয়নি এর প্রমাণ হচ্ছে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ অব্যাহত থাকা। রাখাইন রাজ্যের বুচিডং, রাচিডং এলাকায় যেসব রোহিঙ্গা এখনো মাটি কামড়ে পড়ে আছে, তারা মোটেও নিরাপদে নেই। তাই তাদের আসার ক্ষেত্রে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাধাও দেওয়া হচ্ছে না বলে জানান বিজিবি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।

এদিকে মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রশংসা কুড়ালেও এত বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপ বহন করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য বলে মনে করে দেশের সচেতন মহল। এ পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছায় যেতে না চাইলে তাদের ফেরত পাঠানোরও সুযোগ নেই। আর মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ যে চুক্তি করেছে, সেখানেও স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে আগ্রহীদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার যদি ভীতিকর পরিস্থিতি জিইয়ে রাখে, তাহলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow