Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৩ মার্চ, ২০১৮ ২৩:০৫
শুধুই কান্না আহাজারি
লাশের জন্য ঘুরছেন স্বজনরা। হাসপাতালে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। দুই বিমানবন্দর থমথমে। নেপালে ছয় কর্মকর্তা বদলি। তদন্ত কমিশন
জুলকার নাইন, কাঠমান্ডু (নেপাল) থেকে
শুধুই কান্না আহাজারি
বিমান দুর্ঘটনায় নিহত পিয়াসের স্বজনদের কান্না। গতকাল বরিশালের বাড়ি থেকে তোলা ছবি —বাংলাদেশ প্রতিদিন

তখন বিকাল ৪টা। কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশ দূতাবাসে অর্ধশত বাংলাদেশি কথা বলছেন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে। এই জনাপঞ্চাশেক হতভাগা স্বজন সকাল ১১টায় পৌঁছেন কাঠমান্ডুতে। এরপর থেকে ঘুরেছেন হিমালয়ের দেশ নেপালের রাজধানীর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত। কাঠমান্ডুজুড়ে থাকা তিনটি হাসপাতালের মর্গে খুঁজেছেন তাদের প্রিয়জনের লাশ।

সাত দিন আগে মেয়ের বিয়ে দেওয়া বাবা মর্গের রক্ষীর কাছে আকুতি করছেন লাশের হাতে কোনো মেহেদি আছে কিনা দেখার জন্য। তিনি তাহিরা তানভির শশী রেজার বাবা ও মিনহাজ বিন নাসিরের শ্বশুর। হতভাগা বাবা রাষ্ট্রদূতের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন,   ‘৫০টি লাশের কোনো একটির হাতে মেহেদি আছে কিনা দেখেন, সেটিই আমার মেয়ে। বিয়ের সময় ও তিন দিন ধরে এই মেহেদি লাগিয়েছিল। প্লিজ, আপনারা একটা কিছু ব্যবস্থা করেন। আমি তিনটি মর্গে গিয়েছি, কোথাও আমাকে ঢুকতেও দিল না।’ ভারাক্রান্ত রাষ্ট্রদূত বললেন, আমার প্লেন রেডি, লাশ আমার হাতে থাকলে, আমি এখনই নিয়ে গিয়ে দাফন করতাম দেশে। জানা গেল, নেপালের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হওয়ায় লাশ গ্রহণের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে। ১৪ পাতার একটি ফরম ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে স্বজনদের হাতে। শত ধরনের তথ্য চেয়ে এই ফরম পূরণের জন্য দেশে গিয়ে আবারও নেপালে আসতে বলা হয়েছে কাউকে কাউকে। অবশ্য দূতাবাসের কয়েকজন কর্মকর্তা সারা দিনই হাসপাতালগুলোতে ছিলেন। তাদের একজন জানালেন, বেশিরভাগ লাশই চেনার কোনো উপায় নেই। কারও অঙ্গপ্রতঙ্গ বোঝার উপায় নেই। এক লাশের দাবিদার হতে পারে অনেকেই। এই ভয়ে নেপালের পুলিশ হাসপাতালগুলোতে কড়াকড়ির বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। কোন প্রক্রিয়ায় লাশ শনাক্ত করা হবে সেটা নিয়েও দোটানায় নেপালের পুলিশ। ডিএনএ টেস্ট করার কোনো সুবিধাও নেই নেপালে। রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস স্বজনদের বললেন, ডিএনএ টেস্টের প্রযুক্তি প্রয়োজনে বাংলাদেশ থেকে এনে দেওয়ারও প্রস্তাব আমি নেপাল সরকারকে দিয়েছি। তাদের বলেছি— কতজন চিকিৎসক আপনাদের প্রয়োজন আমি বাংলাদেশ থেকে আনব। তারপরও লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া দ্রুত করুন। গতকাল ঢাকা থেকে আসা বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সদস্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক পদমর্যাদার এক কূটনীতিক স্বজনদের জানালেন, বাংলাদেশ থেকে পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক, খাবার-দাবার কী লাগবে তা আনার জন্য সব প্রস্তুতি আমাদের আছে। ইউএস-বাংলার ব্যবস্থাপনায় কাঠমান্ডু আসা নিহতদের স্বজনরা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করে চলে যান বিশ্রাম নিতে। এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে তাদের জন্য হোটেল ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৭-৮ দিন তাদের সেখানে থাকতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লাশ শনাক্ত হওয়ার পরও দেশে ফিরিয়ে আনতে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, নেপালি পুলিশের রিপোর্ট, দূতাবাসের রিপোর্টসহ মোট পাঁচটি রিপোর্ট প্রয়োজন হবে।

এদিকে বিমানমন্ত্রী শাহজাহান কামাল গতকাল দুপুরে নেপালে পৌঁছানোর পর দেশটির সিভিল এভিয়েশনের প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জানতে চেয়েছেন কেন এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। নেপালি কর্তৃপক্ষ মন্ত্রীকে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার কারণ তদন্তে কমিশন গঠন করেছে সরকার। এরই মধ্যে বিধ্বস্ত বিমানের ব্ল্যাকবক্স কমিশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা তদন্ত করে দেখবে।

হাসপাতালে কান্নার রোল : গতকাল দুপুরে কাঠমান্ডু টিএ হাসপাতাল, কেএমসি হাসপাতাল, নরভিক হাসপাতাল ও ওম হাসপাতালে গিয়ে শুধু বাংলাদেশি নয়, নেপালিদেরও কাঁদতে দেখা গেছে। বিমান দুর্ঘটনায় নিহত নেপালিদের স্বজনরা ভিড় করে আছেন হাসপাতালগুলোর আশপাশে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা বলেছেন, এই দুর্ঘটনায় পুরো নেপাল শোকে স্তব্ধ। যা প্রকাশ করার ভাষা আমাদের নেই। আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থার নির্দেশনার কথা তিনি জানিয়েছেন।

ছয়জনকে বদলি : নেপালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের ঘটনায় কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে সে সময় দায়িত্বে থাকা ছয় কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। দেশটির ইংরেজি নিউজ পোর্টাল মাই রিপাবলিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করার ধাক্কা ‘সামলে ওঠার সুযোগ দিতে’ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এ ব্যবস্থা নিয়েছে। ঢাকা থেকে ৬৭ জন যাত্রীসহ ৭১ জন আরোহী নিয়ে সোমবার দুপুরে ত্রিভুবনে নামার সময় ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বিএস২১১ রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে এবং আগুন ধরে যায়।

ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ মডেলের ওই উড়োজাহাজটি কেন দুর্ঘটনায় পড়ল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে পাইলটের শেষ মুহূর্তের কথোপকথনের একটি রেকর্ড প্রকাশ পেয়েছে, যাতে মনে হয় রানওয়েতে নামা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

ডটার অব বাংলাদেশ : নেপালের তরুণদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় সিকিম ম্যাসেঞ্জার নামে একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশি কো-পাইলট নিহত পৃথুলা রশীদকে ডটার অব বাংলাদেশ নামে অবহিত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে যে, তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করে ১০ নেপালিকে বাঁচিয়েছেন।

সারাবিশ্বে শোক : নেপালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, কাঠমান্ডু বাংলাদেশি দূতাবাস ও ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিমান দুর্ঘটনার শোক জানিয়েছে সারাবিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে পাঠানো হয়েছে শোকবার্তা।

শুধু খুশি ইয়াকুব আলীর স্বজনরা : বিমান দুর্ঘটনা কবলিতদের ইউএস-বাংলার তত্ত্বাবধানে যেসব স্বজনরা কাঠমান্ডু এসেছেন তাদের মধ্যে উচ্ছ্বসিত ছিলেন ইয়াকুব আলী রিপনের ছোটভাই দিপু বেপারি। গত সন্ধ্যায় নরভিক হাসপাতালের সামনে আনন্দে উচ্ছ্বসিত দিপু বললেন, আমার ভাই মৃত জেনে নেপাল এসেছিলাম। এর আগে তিনি টেলিভিশনে দেখেছিলেন তার ভাই মারা গেছেন। সে তথ্যে গ্রামের বাড়িতে তারা কোরআনখানি করেন। সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখেন তার ভাই বেঁচে আছেন। সঙ্গে সঙ্গে সেটি তার পরিবারকে জানিছেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow