Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১২ জুলাই, ২০১৮ ০৪:১৫
ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া
ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে চমক
ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া
বিজয় উদযাপনে ক্রোয়েশিয়ার প্রাণভোমরা মডরিচ ও তার সতীর্থরা —এএফপি
bd-pratidin

যুদ্ধংদেহী দুটি দল পরস্পরের দিকে তেড়ে যাচ্ছে। কেউ কাউকে ল্যাং মেরে মাটিতে আছড়ে ফেলছে। অকারণে গায়ে গা ঘেঁষে প্রতিপক্ষকে উত্তপ্ত করে তুলছে। ঘটনার সংখ্যা এত বেশি, অনেকটা বাধ্য হয়েই ‘দেখেও না দেখার ভান’ করতে হলো তুর্কি রেফারি শাকির কুনিতকে। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের ম্যাচটা চলল এভাবেই। উত্তেজনার পারদ চড়তেই থাকল। একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।

শেষ হয়ে যাচ্ছে সুযোগ! ক্লান্ত হয়ে পড়ছে শরীর। টানা ১০০ মিনিটের ওপর দৌড়ানোর পর কারও পা-ই আর চলছে না ঠিক পথে। এঁকেবেঁকে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছেন কেউ কেউ। বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছার আকাঙ্ক্ষা দল দুটোকে এগিয়ে নিচ্ছে। ভার হয়ে ওঠা শরীর টেনে টেনে ছুটছে তারা কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। দুটো দলেরই জানা, জয় কেবল তাদের ভাগ্যেই জোটে যারা শেষ পর্যন্ত হাল ছাড়ে না। ফুটবলীয় লড়াইয়ে এ কথার মর্ম জানা ওদের ভালো করেই। জানা থাকলেই কি সবকিছু মানা যায়। ইংল্যান্ড মানতে পারল না। তারুণ্যের শক্তি পরাজয় স্বীকার করল ক্রোয়েশিয়ার অভিজ্ঞ সৈনিকদের কাছে। আক্ষরিক অর্থে বলতে গেলে, ৩২ বছরের বুড়ো মারিও মানজুকিচের কাছে! ২-১ গোলের জয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনাল নিশ্চিত করল ক্রোয়েশিয়া। মোমেন্টামটা পেয়ে গেলে ক্যারিশমাটিক অনেক কিছুই হতে পারে। এজন্য প্রয়োজন সঠিক সময়টা বুঝতে পারা। যোগ্যতাও প্রয়োজন। সবকিছু মিলে গেলে ম্যাজিকাল কিছু হয়ে যায়। ফুটবলে কোনো দল মোমেন্টামটা পেয়ে গেলে প্রতিপক্ষের আর কিছু করার থাকে না। গতকাল যেমন হলো লুঝনিকি স্টেডিয়ামে। ম্যাচের ৬৫ মিনিট পর্যন্তও কেউ ভাবেনি ক্রোয়েশিয়া পাল্টা আঘাত করতে পারবে। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটেই পিছিয়ে পড়া ক্রোয়েশিয়ার খেলা দেখে সমর্থকরা একটা সময় নীরবই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরের মিনিটেই সবকিছু বদলে গেল। ম্যাচের ৬৬তম মিনিটে সমতায় ফেরে ক্রোয়েশিয়া। সিমের ক্রসে বল পেয়ে গোল করেন ইভান পেরিসিচ। এরপর ৭১তম মিনিটে দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন ইভান পেরিসিচ। ডি বক্সের ভিতরে বাঁ পাশ থেকে নেওয়া শটটা সেকেন্ড বারে লেগে ফিরে এলেও ইংলিশ সমর্থকদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছিল। থেমে গিয়েছিল তাদের ‘ইটস কামিং হোম’ কোরাস। বিপরীতে লাল-সাদা ডোরাকাটা জার্সি পরা ক্রোয়াটরা উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছিল। অতিরিক্ত মিনিটে গড়ানো ম্যাচের ১০৮তম মিনিটে পেরিসিচের পাসে দারুণ এক গোল করে মারিও মানজুকিচ ক্রোয়েশিয়ার মধ্যে ছড়িয়ে দেন ফাইনালে পৌঁছার আনন্দ।

সংগীতের সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে থাকা লুঝনিকি স্টেডিয়ামের ৭৮ হাজার ১১ জন দর্শক কেবল তীরে উঠল। গা ঝাড়া দিয়ে আড়মোড়া ভেঙে তারা বসছে ফুটবল দেখবে বলে। ফুটবলের ছন্দে নেচে ওঠার আশায়। ক্রোয়েশিয়ার সমর্থকরা একদিকে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের। আর লুঝনিকির পুরো গ্যালারিতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রাশানরা। সংখ্যায় ওরাই সবচেয়ে বেশি। রাশিয়া বিশ্বকাপে টিকে না থাকলেও বিশ্বকাপ উদ্যাপন থেকে বঞ্চিত থাকতে চায় না তারা। ফুটবল নিয়ে উন্মাতাল হবে সবাই। আক্রমণ হবে। সেই আক্রমণ রুখে দেবে প্রতিপক্ষ। শট হবে গোলমুখে। সেই শট পাখির মতো উড়ে গিয়ে লুফে নেবেন গোলরক্ষক। এসব দৃশ্য দেখে দেখে রোমাঞ্চিত হবে সমর্থকরা। শিহরণ জাগবে মনে। তারপর কোনো এক জুতসই মুহূর্তে গোল হবে। বুনো উল্লাসে মেতে উঠবে সবাই। কিন্তু কী হলো! ম্যাচটা ঠিকভাবে শুরুও হতে পারল না। ‘সেট পিস’ থেকে গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দিলেন কিয়েরেন ট্রিপলার। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটে ডি বক্সের কয়েক হাত বাইরে থেকে ফ্রি কিকে গোল করেন তিনি। এর পরও ইংল্যান্ডেরই আক্রমণের পাল্লা ছিল ভারী। ক্রোয়েশিয়া কেবল ঠেকিয়েই চলছিল। কিন্তু শেষ দিকটা আর সামলাতে পারল না ইংলিশ তরুণরা। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার নায়ক ডেভর সুকার এখন তাদের ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট। গতকাল সেমিফাইনালের আগে মাঠে দেখা হয় তার সঙ্গে ইংলিশ কোচ গেরেথ সাউথগেটের। দুজনে কথা বলেন কিছুক্ষণ। হয়তো পরস্পরকে সেমিফাইনালের জন্য শুভকামনা জানান! কেবল ডেভর সুকারই নন, গতকাল ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া সেমিফাইনালের অতিথি তালিকায় ছিলেন আরও অনেকে। সাবেক বিশ্বকাপজয়ী অনেক তারকাই ছিলেন। দিয়েগো ম্যারাডোনা, রবার্তো কার্লোস, পাওলো মালদিনি, কাফু, টট্টি আরও অনেকে। ৩৯ জনের তালিকা ছিল। এর অনেকেই ছিলেন গ্যালারিতে। ফিফা সভাপতি ও ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও মাঠে ছিলেন। ডেভর সুকার যা পারেননি, তাই করলেন লুকা মডরিচরা। তাদের সঙ্গে ছিল সমর্থকরাও। ম্যাচটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সমর্থকদের দিকে ছুটে যান ক্রোয়েশিয়ান ফুটবলাররা। সবার চোখেই তখন অশ্রু চিকচিক করছে। ফাইনালে পৌঁছার আনন্দ যে সত্যিই কান্না নিয়ে আসার মতো। ১৫ জুলাইয়ের ফাইনালে ফরাসিদের মুখোমুখি হবে ক্রোয়াটরা। ক্রোয়েশিয়া ফাইনালে ওঠায় নতুন একটা দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেল!

এই পাতার আরো খবর
up-arrow