Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৭ জুলাই, ২০১৮ ২৩:১৫
ককটেলে উত্তাপ ছড়াল রাজশাহীতে
আওয়ামী লীগ বিএনপির পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
ককটেলে উত্তাপ ছড়াল রাজশাহীতে
রাজশাহীতে বিএনপির সমাবেশে ককটেল হামলার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী —বাংলাদেশ প্রতিদিন

রাজশাহীতে বিএনপির প্রচার সমাবেশে ককটেল হামলার ঘটনায় সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী মাঠে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনার জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরের প্রতি দায় চাপিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর সাগরপাড়া বটতলা এলাকায় রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের পথসভার কাছে তিনটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। এতে একজন সাংবাদিকসহ তিনজন আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশ ও র‌্যাব। বিএনপি এ বিস্ফোরণের জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মীদের দায়ী করেছে। দুপুরে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, এটা বিএনপির একটা সাজানো নাটক। ককটেল হামলার পর বোয়ালিয়া থানার ওসি আমান উল্লাহ বলছেন, ঘটনার পর থেকে আমরা এলাকায় আছি। হামলাকারীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে জেলা ছাত্রদল সাগরপাড়া মোড়ে এ পথসভার আয়োজন করে। বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন। সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান ও সহসাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন শওকত। নেতাদের বক্তব্য শেষ হতেই তিনটি মোটরসাইকেলে মুখোশধারীরা সেখানে গিয়ে পরপর তিনটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে তারা দ্রুত টিকাপাড়ার রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যায়। ফলে পথসভা পণ্ড হয়ে যায়। এ ঘটনায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান, বেসরকারি টেলিভিশন বাংলাভিশনের রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি আদিত্য চৌধুরী ও স্বপন কুমার দাস নামে স্থানীয় এক দোকানদার আহত হন। তারা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। বিস্ফোরণে পথসভা পণ্ড হয়ে যাওয়ার পর বিএনপি নেতা-কর্মীরা সেখানে বিক্ষোভ করেন।

বিস্ফোরণের পর বিএনপি নেতা রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু অভিযোগ করেন, ভোটারদের মধ্যে ভয়ভীতি দেখাতে আওয়ামী লীগ এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে বাইরে আসতে পারেন, সেজন্য বিএনপি যখন প্রচারণা চালাচ্ছে, তখন আওয়ামী লীগ এই ককটেল হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, গাজীপুর ও খুলনার স্টাইলে রাজশাহীতে নির্বাচন করার জন্য এবং বিএনপি নেতা-কর্মীদের বাড়িছাড়া করার জন্য এ বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে।

রাজশাহীর উপ-পুলিশ কমিশনার আমীর জাফর বলেন, যে কোনো দলের পথসভা করতে পুলিশের অনুমতি লাগে। এ পথসভার জন্য জেলা ছাত্রদল কোনো অনুমতি নেয়নি।

সকালে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার পর সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন দুপুর ১২টায় সংবাদ সম্মেলন করেন। নগরীর কুমারপাড়া মোড়ে দলীয় কার্যালয়ের এ সংবাদ সম্মেলনে লিটন বলেন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বোমা ও ককটেলবাজির মতো সহিংস কাজে সিদ্ধহস্ত। এটা একটা সাজানো নাটক। তিনি বলেন, নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার জন্যই আজকের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। রাজশাহীর বাগমারা ও নওগাঁর আত্রাইয়ে বাংলা ভাইকে নিয়ে সহিংস কর্মকাণ্ডে দুলুর ভূমিকা সম্পর্কে সবাই জানে।

লিটন আরও বলেন, নিশ্চিত পরাজয় জেনে রাজশাহীকে অসহিষ্ণু করার চেষ্টা করছে বিএনপি। মাঠে জনসমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়ে রাতের আঁধারে বিএনপি নেতা-কর্মীরা তার পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে ফেলছে। সংখ্যালঘুদের হুমকি দিচ্ছে। ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই এই ককটেল বিস্ফোরণের নাটক সাজানো হয়েছে। তিনি বলেন, তারা যতই চেষ্টা করুক শান্তির নগরী রাজশাহীকে কখনো অশান্ত করতে দেওয়া হবে না। এতদিন রাজশাহীর পরিবেশ শান্ত ছিল। বিএনপি নেতা দুলু রাজশাহীতে আসার পর এ ঘটনাটি ঘটল। তারা পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনকে প্রশ্নবিব্ধ করতে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য এস এম কামাল হোসেন অভিযোগ করেন, এ ঘটনার পেছনে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হাত আছে। তারা নির্বাচন থেকে সরে যেতে চক্রান্ত করছেন।

এদিকে ধানের শীষের প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু বলেন, সকালে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুসহ দলীয় নেতা-কর্মীরা সাগরপাড়া বটতলা এলাকায় বুলবুলের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। এ সময় মোটরসাইকেলে করে এসে মুখোশধারীরা সেখানে পরপর তিনটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে তাদের দলের কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুর রহমান ও কর্মী স্বপন কুমার আহত হয়েছেন।

মিজানুর রহমান মিনু অভিযোগ করেন, রাজশাহীতে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করতে আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে এ ককটেল হামলা চালিয়েছে। আওয়ামী লীগের মোটরসাইকেল বাহিনী এতদিন পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে ফেলছিল, ফেস্টুন ভেঙে ফেলছিল। তারাই এবার বুলবুলের নির্বাচনী প্রচারণায় ককটেল হামলা করেছে।

দুই হামলাকারীর নাম প্রকাশ করল বিএনপি : রাজশাহীতে বিএনপির পথসভায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু। তিনি বলেন, জাবেদ ও আবেদ হামলা করেছে। ঘটনার পর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে মিনু সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। এ সময় রাজশাহী মহানগরী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার উপস্থিত ছিলেন। মিনু যাদের হামলাকারী বলে দাবি করেছেন, তাদের মধ্যে জাবেদ ছাত্রদল নেতা এবং আবেদ স্বেচ্ছাসবেক লীগ নেতা। তাদের বাড়ি সাগরপাড়া এলাকায়।

দুলুকে গ্রেফতারের দাবি বাদশার : রাজশাহীতে বিএনপির প্রচার সমাবেশে ককটেল হামলার ঘটনায় দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও সদর আসনের এমপি ফজলে হোসেন বাদশা। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ দাবি জানান। ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, রাজশাহীর নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু ও শান্ত ছিল। দুলু আসার পর এমন ঘটনা ঘটল। এর আগেও দুলু রাজশাহীতে আসার পর এমন ঘটনা ঘটেছে। আজকের ককটেল হামলার পেছনেও তার ইন্ধন আছে। রাজশাহীতে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে তারা রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায়। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকানোর জন্য যেখান থেকে সহিংসতা চালাত জামায়াত-শিবির, সেই জায়গাটি বেছে নেওয়া হয়েছে। কারণ, তারা জামায়াত-শিবিরের সেই প্রশ্রয়টি ধরে রাখতে চায়। এসব ঘটনার পেছনে দুলুর প্রত্যক্ষ মদদ থাকায় তার গ্রেফতার দাবি করছি।

জামায়াতের নিন্দা : বিএনপির পথসভায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এক বিবৃতিতে বলেন, প্রকাশ্যে ২০-দলীয় জোটের সভায় ককটেল হামলার দ্বারাই প্রমাণিত হচ্ছে দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এমন নিরাপত্তাহীন পরিবেশে কারও পক্ষেই নির্বাচনী প্রচারণা চালানো সম্ভব নয়। তাই ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা দিয়ে নির্বাচনের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সরকারের দায়িত্ব। একইসঙ্গে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow