Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১০ আগস্ট, ২০১৮ ২৩:০০
সড়ক খাতে মিলনমেলা
শাজাহান খান ছাড়াও আছেন বিএনপির শিমুল বিশ্বাস জাতীয় পার্টির মশিউর রহমান রাঙ্গা বাসদের ওসমান আলীসহ কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা
শিমুল মাহমুদ
সড়ক খাতে মিলনমেলা

সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি থেকে শুরু করে বাম দলের নেতারাও। রাজনীতিতে মত ও পথের ভিন্নতা থাকলেও এখানে সবাই মিলেমিশে এক হয়ে আছেন। পরিবহন শ্রমিক-মালিক সংগঠনে আছেন মন্ত্রিসভার দুই সদস্য নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাতীয় পার্টির নেতা মশিউর রহমান রাঙ্গা। শ্রমিক সংগঠনে তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি হচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী বর্তমানে কারাবন্দী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।

আওয়ামী লীগ নেতা নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি। এই ফেডারেশনের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নেতা ওসমান আলী। খুলনা মহানগরী শ্রমিক দলের সভাপতি আবদুর রহিম বক্স দুদু বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সহসভাপতি এবং সংগঠনের প্রভাবশালী নেতা। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্মসম্পাদক। ফেডারেশনের অন্যতম সহসভাপতি জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য মফিজুল হক বেবু, আরেক সহসভাপতি সিলেটের পরিবহন নেতা সেলিম আহমেদ ফলিক চারদলীয় জোট সরকারের সময় বিএনপি-জামায়াত নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বর্তমানে ‘কাউয়া’ আওয়ামী লীগার বলে সূত্র জানায়। শ্রমিকনেতা হলেও এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল লিজ নিয়েছেন ৮৭ লাখ টাকায়, বিএনপির কালাম চেয়ারম্যানের সঙ্গে। শ্রমিক ফেডারেশনের আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-শ্রমবিষয়ক সম্পাদক গাজীপুর জেলা বিএনপি নেতা হুমায়ুুন কবির খান, শ্রমিক ফেডারেশনের সহসম্পাদক করম আলী দোহার থানা বিএনপির নেতা।

দেশের সড়ক পরিবহন খাতে তৎপর মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলো মূলত চাঁদাবাজির কারণেই সংগঠিত। যানবাহন থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় ছাড়া মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের আর কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা চোখে পড়ে না। এই অবৈধ চাঁদার স্বার্থের সংঘাতে মাঝে মাঝে বিভিন্ন স্থানে সমিতিতে সমিতিতে কিংবা ইউনিয়নের মধ্যে বিরোধ, পরিবহন ধর্মঘট, রুট দখল-পাল্টা দখলের ঘটনা ঘটছে। এক জেলার বাস যেতে পারে না অন্য জেলার ওপর দিয়ে। সড়ক, মহাসড়ক ও ফেরিঘাটে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে বেহাল অবস্থা বাস-ট্রাক মালিকদের। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরিবহনশ্রমিকদের জন্য মালিক সমিতি কিংবা শ্রমিক ইউনিয়নগুলো তেমন কোনো ভূমিকাই রাখে না। তারা মূলত পরিবহন খাতের অপরাধীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং চাঁদাবাজির বিস্তারে ভূমিকা রাখে।

সারা দেশে বাস এবং ট্রাক পরিবহন খাতে মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন মিলিয়ে ৫ শতাধিক সক্রিয় সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনভুক্ত সংগঠনের সংখ্যা ২০৩। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতি ৭০টি ও ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সদস্য সংখ্যা রুট কমিটি ও মালিক সমিতি মিলিয়ে ১৪৪। বাকি সংগঠনগুলো ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, ঢাকা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ও ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান সমিতি এসব আঞ্চলিক ইউনিট নিয়ন্ত্রণ করে। সূত্র জানায়, এসব ইউনিট কমিটি অনুমোদনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটিকে এককালীন মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়।

সারা দেশে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিগুলোর মূলত মালিকদের প্রতিনিধিত্ব ও শ্রমিকদের কল্যাণ দেখার কথা। কিন্তু বিদ্যমান সাংগঠনিক ব্যবস্থায় ৩ শতাধিক মালিক সমিতির অধিকাংশই শ্রমিক ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, বাণিজ্য সংগঠন হিসেবে তারা শ্রমিক ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন নেয় কীভাবে? এসব মালিক সমিতির বছর শেষে কোনো অডিট হয় না। তাদের কোথাও কোনো জবাবদিহিতা নেই।

বাসমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গাও প্রকৃত পরিবহন ব্যবসায়ী নন। তিনি প্রধানত রাজনীতিক, জাতীয় পার্টির এমপি ও সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী। মালিক সমিতির এই শীর্ষ নেতার ‘সঞ্চিতা’ পরিবহন নামে একটি মাত্র বাস রয়েছে। এটি রংপুরের অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচল করে।

পরিবহন খাতের বহুল আলোচিত নেতা খন্দকার এনায়েত উল্লাহ কয়েক বছর ধরে সড়ক পরিবহনের সামগ্রিক তৎপরতার নিয়ামক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানায়। দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসনামলেই সমান তৎপর ছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে পরিবহন সেক্টরের কর্তৃত্ব চলে যায় বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের হাতে। এ সময় মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বাধীন কমিটির সাধারণ সম্পাদক হন খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। পরে মির্জা আব্বাসের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হলে খন্দকার এনায়েতের বাস ময়মনসিংহে নিয়ে আটকে রাখেন মির্জা আব্বাসের লোকজন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে তৎকালীন এমপি ও সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি আলহাজ মকবুল হোসেনের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক হন খন্দকার এনায়েত। ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় গেলে খন্দকার এনায়েত পরিবহন নেতৃত্বের বাইরে থাকলেও গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকেই তিনি নগরীর টার্মিনালগুলো নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় হন। পক্ষ-বিপক্ষ প্রায় সব শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করে তিনি মহাখালী, সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। গাবতলী টার্মিনাল ছেড়ে দিতে হয় বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনকে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন বিএনপির বগুড়ার এমপি এস আর পরিবহনের স্বত্বাধিকারী গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) সিরাজ। এখন সেই জি এম সিরাজের বাসগুলোকেও বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত হারে চাঁদা দিয়ে চলতে হয়। বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান নেতৃত্বেও রয়েছেন সাভার বিএনপির নেতা হানিফ পরিবহনের স্বত্বাধিকারী কফিল উদ্দিন। তিনি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক। সভাপতি সোহাগ পরিবহনের এমডি ফারুক তালুকদার সোহেলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে।

কমিউনিস্ট পার্টির উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খান বিপ্লবী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃত্ব দিতেন বেশ ভালোভাবেই। নগরীর একাধিক টার্মিনালে তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল একসময়। এখন মন্ত্রী শাজাহান খানের ফেডারেশনের নিয়ন্ত্রণ চলছে সর্বত্র। সড়ক পরিবহনের আরেক নেতা আবদুল অদুদ নয়ন ২০০৯ সালে মনজুরুল আহসান খানের বিপ্লবী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ছেড়ে শাজাহান খানের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনে মিশে গেছেন। বাসদ নেতা ওসমান আলীও আছেন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের মূল নেতৃত্বে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। বর্তমানে আবদুল অদুদ নয়ন ও দোহার বিএনপির নেতা করম আলীর নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল। তারা দুজনই শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনেরও নেতা।

১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের আগে থেকেই সড়ক পরিবহন খাতের বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন টার্মিনালে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। ১৯৮৯ সালে দেশের প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলো নিয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। তিন বছরের মাথায় ’৯২ সালে এই ফেডারেশন ভেঙে তিনটি ফেডারেশন গঠিত হয়। ভাঙার সময় তারা পরস্পরকে চাঁদাবাজির দায়ে অভিযুক্ত করে। কিন্তু অল্প সময়েই দেখা যায় তিনটি গ্রুপই শ্রমিক ফেডারেশন নামে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ে। একেক টার্মিনালে একেক গ্রুপ দখলদারিত্ব বজায় রাখে। টার্মিনাল দখল আর পাল্টা দখল নিয়ে নব্বই দশক জুড়ে ঢাকার টার্মিনালগুলোয় বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটে।

নব্বই দশকের শুরু থেকেই বিভিন্ন মত ও পথের নেতৃবৃন্দ নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন টার্মিনালগুলোয় প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। ১৯৯২ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত শ্রমিক ফেডারেশনের ২০৩টি স্বীকৃত ইউনিয়নের তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন সড়ক, মহাসড়ক ও বাস টার্মিনালে চাঁদাবাজি চলছে। কিন্তু পরিবহন শ্রমিক নেতৃবৃন্দ একে চাঁদাবাজি বলতে নারাজ। তারা সংগঠনের পরিচালন ব্যয় হিসেবে ইউনিয়ন ও ফেডারেশনের জন্য মোট ৭০ টাকা আদায় করেন বলে স্বীকার করেন। দেশে আরও কয়েকটি বৈধ শ্রমিক সংগঠন থাকলেও সড়ক-মহাসড়কে তাদের তৎপরতা সীমিত। সিপিবির উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খানের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ১৯৯৫ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সায়েদাবাদ ও গুলিস্তান টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ করত। ২০০২ সালে তাদের তাড়িয়ে শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন টার্মিনালগুলো নিয়ন্ত্রণে নেয়। বাকি দুটি শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যক্ষ আবদুর রশিদ ও বাংলাদেশ ট্রাক চালক শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা রায় রমেশচন্দ্র। এই সংগঠনের কার্যক্রম এখন সীমিত। ওয়ান ইলেভেনের পর পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কমে গেলে চাঁদাবাজিতে ভাটার টান লাগে। পরে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনে সর্বদলীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা পায়।

up-arrow