Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১০ আগস্ট, ২০১৮ ২৩:০১
কীভাবে বন্ধ হবে এই নৈরাজ্য
ঝর্ণা মনি ও জয়শ্রী ভাদুড়ী
কীভাবে বন্ধ হবে এই নৈরাজ্য

সকাল ৯টা। কুড়িল বিশ্বরোডে দুই পাশে দাঁড়িয়ে শ-খানেক মানুষ। ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও দ্রুতগতির যানবাহনের সামনে হাত উঁচিয়ে পার হচ্ছেন অধিকাংশ মানুষ। বিমানবন্দর থেকে বনানী অভিমুখী গাড়িগুলোও মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাল্লা দিয়ে যাত্রী তুলছে। পাশের কুড়িল রেলক্রসিংয়ে নেই কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী। ট্রেন চালক দফায় দফায় হুইসেল দিলেও ভ্রুক্ষেপ নেই রেললাইন পার হওয়া লোকজনের। গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা আর নগরবাসীর অসচেতনতার এরকম ঘটনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে রাজধানীজুড়ে। এই নৈরাজ্যের চরম পরিণতিতে ঘটছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে স্বজনহারা মানুষের কান্না। সড়কে শৃঙ্খলা নিয়ে আসতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কয়েক দিন পরিবর্তন চোখে পড়লেও আবার যে পরিস্থিতি ছিল- তাই এসে দাঁড়াচ্ছে।

এই নৈরাজ্যের স্থায়ী সমাধানের খোঁজে কথা হয় বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদের সঙ্গে। তিনি বলেন, গণপরিবহনে নৈরাজ্য দূর করে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু চালকের ওপর নির্ভর করে না। সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে অনেক বিষয় এর সঙ্গে জড়িত। তার মধ্যে ত্রুটিমুক্ত যানবাহন এবং দক্ষ চালকের ভূমিকা অবশ্যই প্রধান। কিন্তু একই সঙ্গে সড়কে চলাচলে জনগণের সচেতনতার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের একশ্রেণির চালক যেমন বেপরোয়া, তেমনি জনগণের একটি বড় অংশও বেপরোয়া।

গবেষক, লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ আরও বলেন, সড়কের পাশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয় না। সেসবও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যরাও দায়িত্ব পালনে অমনোযোগী। পরিবহন মালিক এবং শ্রমিক নেতাদের অবহেলার কারণে এত আলোচনা-সমালোচনা করেও অবস্থার উন্নতি ঘটছে না। এই গণপরিবহন নৈরাজ্য শুধু যে দুর্ঘটনার কারণ তা নয়, অর্থনীতির ওপরও এটা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সামগ্রিক বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। সেজন্য কঠোর আইন ও তার সুষ্ঠু প্রয়োগই একমাত্র সমাধান। রাজধানীর নাগরিক জীবনের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা। দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে চললেও মিলছে না স্থায়ী কোনো সমাধান। এ ব্যাপারে নগর বিশ্লেষক ও স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, আনিসুল হক রুট ফ্র্যাঞ্চাইজের মাধ্যমে ধাপে ধাপে চার হাজার উন্নত মানের বাস নামানোর যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, তা সম্পন্ন হলে আজ এই নৈরাজ্যের অবসান হতো। এতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমত। এর মাধ্যমে যানজট অনেকটা প্রশমিত হতো। ঢাকা শহরের নগরের রাস্তাঘাট যেহেতু সিটি করপোরেশনের, তাই পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও সিটি করপোরেশনের আওতায় আসা উচিত। ভাঙাচোরা ফিটনেসবিহীন যানবাহনে চলছে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা। এসব ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি নিয়েই প্রতিযোগিতায় নামছেন চালকরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা হলে দেখা যাবে রাজধানীতে চলাচলকারী একটা বাসও ফিটনেস সার্টিফিকেট পাওয়ার যোগ্য নয়। বিআরটিএ ফিটনেস যাচাই করতে শুধু গাড়ির কাগজপত্র নবায়ন করা হয়েছে কিনা- তা দেখে। কাগজ না দেখে রাস্তায় চলার যোগ্যতা আছে কিনা- সেটা যাচাই করতে হবে। ট্রাফিক নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা জোরদার করতে হবে। সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে দীর্ঘদিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। লড়াই সংগ্রাম চলমান থাকলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা। উল্টো সড়ক দুর্ঘটনায় দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি, বাড়ছে স্বজনহারাদের কান্না। এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে নিসচার (নিরাপদ সড়ক চাই) চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সড়কে নৈরাজ্য আমাদের মজ্জাগত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৪৭ বছরের এই জঞ্জাল সাফ করতে কষ্ট হবে। রাজনৈতিক সমস্যা রয়েছে। সড়ক ব্যবস্থাপনা কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। সড়ক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন, শ্রম ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং সিটি করপোরেশন মিলে সমন্বিতভাবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি অথরিটি গঠন করা। যা মনিটর করবেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন সচিব।

সম্প্রতি কেবিনেটে অনুমোদিত আইন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, আইনের নামকরণ যথার্থ হয়নি। আমরা আইনের নামকরণ চাই ‘সড়ক নিরাপত্তা এবং সড়ক পরিবহন আইন।’ আইনে মুখবন্ধ নেই। সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছর বলা হয়েছে, কিন্তু সর্বনিম্ন শাস্তি কত? ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়নি। আইনে শুধু চালকদের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনার জন্য দায়ী তো মালিকও হতে পারেন। এখানে বিষয়টি উহ্য রাখা হয়েছে। অসঙ্গতিপূর্ণ আইন দিয়ে সড়কে নৈরাজ্য কমবে না।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow