Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৬ আগস্ট, ২০১৮ ২৩:২৪
চীনের সঙ্গে ব্যবসা টাকা ইউয়ানে, ডলার বাদ
রুকনুজ্জামান অঞ্জন
চীনের সঙ্গে ব্যবসা টাকা ইউয়ানে, ডলার বাদ

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে এখন থেকে আমদানি-রপ্তানি হবে টাকা ও ইউয়ানে। অর্থাৎ দুই দেশের ব্যবসায়ীদের আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা ডলার ব্যবহার করে এলসি খুলতে হবে না। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা চাইলেই টাকা দিয়ে সরাসরি ইউয়ান কিনে এলসি (ঋণপত্র) খুলতে পারবেন, তেমনি চীনের ব্যবসায়ীরা স্থানীয় মুদ্রায় এলসি খুলে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে পারবেন। এর মধ্য দিয়ে ইউয়ানকে মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রার স্বীকৃতি দিল বাংলাদেশ। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ চীনের ইউয়ানকে নিজেদের মুদ্রা ঝুড়িতে অন্তর্ভুক্ত করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রার স্বীকৃতি অর্জনের পর থেকেই চীন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নিজস্ব মুদ্রা ইউয়ান ব্যবহারের প্রচেষ্টা চালায়। গত জানুয়ারি থেকে পাকিস্তান চীনের সঙ্গে রুপি ও ইউয়ানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য করার সিদ্ধান্ত  নেয়। এবার সিদ্ধান্ত নিল বাংলাদেশ।

জানা গেছে, বর্তমানে মার্কিন ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ড, ইউরো, কানাডিয়ান ডলার ও জাপানি ইয়েন আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তে এখন ওইসব মুদ্রার পাশাপাশি চীনের স্থানীয় মুদ্রাটিও আন্তর্জাতিক মুদ্রার মর্যাদা পেল বাংলাদেশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, আর্থিক ও মুদ্রা বাজারের নীতিনির্ধারণের অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে— যার ফলে এখন থেকে আমদানি, রপ্তানি এবং আর্থিক লেনদেনের জন্য চীনা ইউয়ান ব্যবহার করা যাবে। বিধি অনুসারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে চীনের মুদ্রা ইউয়ানকে অনুমোদন দিয়েছে। ফলে ডলারের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে ইউয়ান ব্যবহার বৈধতা পেল। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে চীন থেকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট আমদানির ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ এসেছে চীন থেকে, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ সারাবিশ্ব থেকে মোট তিন লাখ ৭২ হাজার ১৮ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে চীন থেকে আমদানি করেছে এক লাখ ৫ হাজার ১৬৬ কোটি টাকার পণ্য। চীন থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আমদানি করে টেক্সটাইল ও টেক্সটাইলজাত পণ্য, মেশিনারি, ইলেকট্রনিক সরঞ্জামাদি, বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক পণ্য, বেস মেটাল, প্লাস্টিক ও রাবারের পণ্য। এর বাইরে যানবাহন, উড়োজাহাজ, যানবাহনের সরঞ্জামাদি, লৌহজাত পণ্য, মিনারেল পণ্যও চীন থেকে আমদানি করা হয়। সম্প্রতি চীন থেকে দুটি সাবমেরিন কিনেছে সরকার। এ ছাড়া সমুদ্র পরিবহনের জন্য দেশটি থেকে পাঁচটি জাহাজ কেনার বিষয়েও আলোচনা চলছে। কেবল বাণিজ্য নয়, বাংলাদেশে বিনিয়োগের দিক থেকেও এখন অন্যান্য দেশকে ছাড়িয়ে গেছে চীন। স্বপ্নের পদ্মা সেতু ছাড়াও সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মেগা প্রকল্পগুলোতে অংশীদারি বাড়ছে চীনা কোম্পানির। দেশের বৃহত্তম প্রকল্প পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে চীনা ঋণে। ঢাকা-সিলেট ফোর লেন হাইওয়ে, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী টানেল, পায়রাবন্দরে বিদ্যুৎ প্রকল্প ছাড়াও বিভিন্ন উন্নয়ন বাস্তবায়নে চীন থেকে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট নিচ্ছে। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে দেশটি। এসব প্রকল্পের প্রয়োজনীয় মালপত্র চীন থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের নিজস্ব কেনাকাটাও বেড়ে যাওয়ায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ছে। ২০০৬-০৭ অর্থবছর থেকেই বাংলাদেশ চীন থেকে সর্বাধিক পণ্য আমদানি করে থাকে। বর্তমানে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা চলছে। বিষয়টির সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখতে দুই দেশই এমওইউ সই করেছে। উপরন্তু আপটা থেকে বেরিয়ে গিয়ে চীনের কাছ থেকে ডব্লিউটিওর আওতায় জিরো ট্যারিফ স্কিম সুবিধা নিতে সম্মতিপত্র পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। এর ফলে চীনে ৯৭ শতাংশ পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে দুই দেশের শুধু বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। আর এর পুরোটাই যদি ডলারের পরিবর্তে ইউয়ানে হয় তবে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় ব্যয়ও অনেক কমে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যেহেতু চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার সে কারণে এই সিদ্ধান্তটি তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। কারণ টাকা দিয়ে ডলার কিনে সেই ডলার আবার রূপান্তরিত করে আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে কমিশন দিতে হয়। এতে সময়ের অপচয়ও হয়। এ ছাড়া ডলারের চাহিদা বেড়ে গেলে দামেও হেরফের হয়। সরাসরি টাকা-ইউয়ানে বাণিজ্য হলে ব্যবসায়ীদের আর তৃতীয় কোনো মুদ্রা ব্যবহারের ঝামেলায় যেতে হবে না। ডলার বাদ দিয়ে ইউয়ান ব্যবহারের এই বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নাখোশ হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর বলেন, এতে নাখোশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ দুই বছর আগেই আইএমএফ ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন বাংলাদেশ দিল।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow