Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৩১ আগস্ট, ২০১৮ ২৩:১২
৪১ বছরে কঠিন দুঃসময়
চেয়ারপারসন জেলে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডনে, নেতারা ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে, আজ বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
মাহমুদ আজহার

একচল্লিশ বছরে পা রাখল দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি। প্রতিষ্ঠার পর দলটি সবচেয়ে কঠিন সময় অতিক্রম করছে এখন। সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিয়াউর রহমানের গড়া বিএনপি নানা প্রতিকূলতার মুখে রয়েছে। প্রথমবারের মতো দুর্নীতির মামলায় দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়া ‘নির্জন’ কারাগারে বন্দী। বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ১০ বছর ধরে লন্ডনে নির্বাসিত। দুর্নীতির এক মামলায় তিনিও সাত বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি। একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ও দোরগোড়ায়। ওই মামলায় তারেক রহমানের সর্বোচ্চ ‘সাজা’ হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন আইনজীবীরা।

জিয়া পরিবারের এই দুই কর্ণধারের একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা অনেকটা অনিশ্চিত। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের পারস্পরিক সন্দেহ-অবিশ্বাস তো আছেই। খালেদা জিয়াবিহীন বিএনপি ও জোটে ভাঙাগড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ৪০ বছরে নানা চড়াই-উত্রাই পার করলেও দলটি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হলেও ৮১টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৩০টির জেলার কোনো কমিটি দিতে পারেনি। যেসব জেলায় কমিটি হয়েছে তার বেশিরভাগই আংশিক। কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া কমিটিকে ‘পকেট কমিটি’ আখ্যা দিচ্ছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। কেন্দ্রে ৫০২ সদস্যের ঢাউস কমিটি হলেও মাঠে-ময়দানে গুটিকয়েক নেতাকেই দেখা যায়।   

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সামরিক শাসনাধীন দেশে রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালে প্রয়াত জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। বিএনপি পাঁচবার দেশ শাসন করেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার ভাঙনের কবলেও পড়ে দলটি। প্রথমে হুদা-মতিন, দ্বিতীয়বার শাহ আজিজ, তৃতীয়বার কে এম ওবায়দুর রহমান, চতুর্থবার অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, পঞ্চমবার কর্নেল (অব.) অলি আহমদ এবং ষষ্ঠবার আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ভাঙনের মুখে পড়ে দলটি।

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনে চরম দুঃসময় নেমে আসে বিএনপিতে। এ সময় দলটি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলে তা রুখে দেয় খালেদা জিয়ার সুদৃঢ় নেতৃত্ব আর সংগঠনের প্রতি তৃণমূল নেতা-কর্মীদের গভীর নিষ্ঠা-ভালোবাসা। ক্ষমতা ছাড়ার পর বিপর্যস্ত দলটি ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর পঞ্চম এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয় বটে, তবে আজও সেভাবে দাঁড়াতে পারেনি। ৪১ বছরে পা রাখা বিএনপি আজ কোথায়— এমন প্রশ্নে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও বিএনপি আজ শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। আমি মনে করি, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বিএনপি আজ শক্তিশালী। ফ্যাসিস্ট সরকারের মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় আজ আমাদের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দী। তারপরও দল পরিচালনায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকনির্দেশনায় ও স্থায়ী কমিটিসহ সর্বস্তরের নেতাদের মতামতের ভিত্তিতেই এখন দল সূচারুভাবে ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আজ হাজার হাজার নেতা-কর্মী গ্রেফতার হয়েছে, মামলা হয়েছে। গুম, খুন হয়েছে অনেক নেতা-কর্মী। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে অধিকাংশ জেলায় কমিটি দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগরসহ অঙ্গ সংগঠনের কমিটিও দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, দল পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে বিএনপি একটি শক্তিশালী দলে পরিণত হবে। কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যে চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে, তা মোকাবিলায় আমরা সক্ষম। গণতান্ত্রিক আন্দোলন-কর্মসূচির মাধ্যমেই গণতন্ত্রের নেত্রী বেগম জিয়াকে মুক্তি করা হবে।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে সিপাহি জনতার এক স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব ঘটে। এরপর সংবিধান সংশোধন করে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম হয়। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ৪০ বছরে আমরাও যে ভুল করিনি তা নয়। তবে আমাদের শাসনকাল ছিল অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও সাফল্যমণ্ডিত।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সারা দেশে বিএনপির এখনো অনেক জনসমর্থন রয়েছে। কিন্তু সাংগঠনিক কাঠামো অত শক্তিশালী নয়। দলটি এখনো নেতা-কর্মীবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি। তাছাড়া একের পর এক রাজনৈতিক ‘ভুল’ সিদ্ধান্তে পিছিয়ে পড়ে দলটি। বিগত ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচন বর্জন করা ছিল চরম ভুল। তা ছাড়া ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. প্রণব মুখার্জির সঙ্গে ঢাকায় বৈঠক বাতিল করা, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে ঘিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেলিফোনে সাড়া না দেওয়া, মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর লাশ বাংলাদেশে আসার পর বেগম খালেদা জিয়াকে গুলশান কার্যালয়ে সান্ত্বনা দিতে যাওয়া প্রধানমন্ত্রীকে সাক্ষাতের সুযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তও সঠিক ছিল না বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।

তাদের মতে, জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতেও বিএনপির অবস্থান ছিল বরাবরই অস্পষ্ট। এটাকে ভালো চোখে দেখছে না বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা। এমনকি জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনকে ভালো চোখে দেখছে না আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তাছাড়া সরকারকে মোকাবিলায় ও দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। নেতা-কর্মীদের মধ্যে আস্থাহীনতা, একে অপরকে সন্দেহ-অবিশ্বাসও পিছিয়ে দিয়েছে বিএনপিকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়াও দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা আজ বিচারের মুখোমুখি। দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের বেশ কিছু দিন পর কমিটি ঘোষণা হলেও নানা দুর্বলতায় ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দলটি। কাঁচা হাতে করা কমিটি গঠনে হয়েছে নানা বিশৃঙ্খলা। কমিটি হলেও সারা দেশে পুরো দলই এখন অগোছালো। বিএনপি নেতারা অবশ্য বলছেন, সরকারের জুলুম, নির্যাতনসহ নানাভাবে হয়রানি বহুগুণ বেড়ে গেছে। কোনো সভা-সমাবেশও করতে দেওয়া হয় না। এতে স্বাভাবিকভাবেই দল পরিচালনা করতে গিয়ে নানামুখী সমস্যায় পড়তে হয়।

এ প্রসঙ্গে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য খালেদা জিয়ার কারামুক্তি আজ খুবই জরুরি।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপিকে তার অতীতের ভুলভ্রান্তিগুলো সংশোধন করতে হবে। ভুলভ্রান্তি বলতে বোঝাচ্ছি, অতীতে অপারেশন ক্লিনহার্ট ও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২১ আগস্টের মতো মর্মান্তিক ঘটনা। এর দায় তারা এড়াতে পারে না। এ জাতীয় ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, জঙ্গিবাদের যেন পুনরুত্থান না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দলের অভ্যন্তরেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে মির্জা ফখরুল দেশবাসীকে বিএনপির পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ সকাল ১০টায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের নেতা-কর্মীরা  শেরেবাংলানগরে সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিয়াউর রহমানের মাজারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন। দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীকে যথাসময়ে মাজারে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করা হয়েছে। এর আগে ভোর ৬টায় নয়াপল্টনসহ দেশের সব বিএনপি কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। আজ বিকাল ২টায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করা হবে। এরই মধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে মৌখিক অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভী। সমাবেশকে ঘিরে রাজধানীতে ধরপাকড়ও চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পরদিন আগামীকাল বেলা ৩টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে বিএনপির সিনিয়র নেতারা ছাড়াও দল সমর্থিত বুদ্ধিজীবীরা বক্তব্য দেবেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির পক্ষ থেকে বিশেষ ক্রোড়পত্র ও পোস্টার প্রকাশ করা হবে। এ ছাড়া সারা দেশে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠন নানা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করবে। 

এই পাতার আরো খবর
up-arrow