Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : রবিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:০৪
পল্টনে বিএনপির শোডাউন
খালেদাকে জেলে রেখে নির্বাচন নয়
নিজস্ব প্রতিবেদক
পল্টনে বিএনপির শোডাউন
গতকাল রাজধানীর পল্টনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির সমাবেশ -বাংলাদেশ প্রতিদিন

বিএনপির ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জাতীয় নির্বাচনে যাওয়ার বার্তা দিল বিএনপি। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে বেশ কিছু শর্ত। দেড় মাস পর রাজধানীর নয়াপল্টনে গতকাল বড় ধরনের শোডাউন করে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করা দল বিএনপি। এতে দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবির পাশাপাশি জনসভায় নেতাদের বক্তব্যে উঠে আসে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে যাওয়ার বার্তা।

সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘অবিলম্বে গণতন্ত্রের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দীকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। বেগম জিয়াকে জেলে রেখে কোনো নির্বাচন নয়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। ভেঙে দিতে হবে সংসদ। নির্বাচনের সময় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। সামরিক বাহিনীকে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে এবং নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে।’ গতকাল বিকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এ জনসভার আয়োজন করে বিএনপি। জনসভা করতে পুলিশ বিএনপিকে ২৩টি শর্তও জুড়ে দেয়। অবশ্য শেষ পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শেষ হয় জনসভা। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে ট্রাকের ওপর নির্মিত সমাবেশের মঞ্চ। মঞ্চের ব্যানারে বিশাল আকারে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি টানানো হয়। জনসভা শুরুর আগে বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের শিল্পীরা দলীয় সংগীতসহ খালেদা জিয়াকে নিয়ে লেখা গান পরিবেশন করে হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে উৎসাহিত করেন। এর আগে সকালে মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে নেতা-কর্মীরা দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে সুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকেও পৃথকভাবে জিয়ার কবরে ফুল দেওয়া হয়। এ সময় বিশেষ মোনাজাত করেন নেতা-কর্মীরা। ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সভা-সমাবেশ, দোয়া মাহফিলসহ সারা দেশে নানা কর্মসূচি পালিত হয়। নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মির্জা ফখরুলের সভাপতিত্বে বেলা ২টায় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া জনসভা শেষ হয় বিকাল ৫টায়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও সহ-প্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলিমের পরিচালনায় জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, বরকতউল্লা বুলু, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, শামসুজ্জামান দুদু, অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, হাবিবুর রহমান হাবিব, ফজলুর রহমান, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, আবদুস সালাম, আতাউর রহমান ঢালী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির  খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, ফজলুল হক মিলন, অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সালাউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা জেলার দেওয়ান মো. সালাউদ্দিন, টাঙ্গাইলের শামসুল আলম  তোফা, মুন্সীগঞ্জের কামরুজ্জামান রতন প্রমুখ।

অঙ্গ সংগঠনের মধ্যে ঢাকা মহানগরের কাজী আবুল বাশার, মুন্সী বজলুল বাসিত আনজু, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, যুবদলের সাইফুল আলম নিরব, স্বেচ্ছাসেবক দলের শফিউল বারী বাবু, শ্রমিক দলের আনোয়ার হোসেইন, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাদেক আহমেদ খান, ছাত্রদলের রাজীব আহসানও বক্তব্য দেন। জনসভায় সিলেটের নির্বাচিত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ  কেন্দ্রীয় বিএনপি, অঙ্গ সংগঠন ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

দুপুরের আগেই ফকিরেরপুল মোড় থেকে শুরু করে কাকরাইল পর্যন্ত লম্বা সড়কটির দুই পাশে নেতা-কর্মীদের ঢল নামে। মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ব্যানার হাতে হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থক খণ্ড খণ্ড মিছিলে জনসভাকে জনসমুদ্রে পরিণত করে। দুপুর ২টায় শুরু হয়ে জনসভাটি শেষ হয় বিকাল সাড়ে ৫টায়।  নেতা-কর্মীরা ‘মুক্তি মুক্তি মুক্তি চাই, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই,’ ‘আমার নেত্রী, আমার মা, বন্দী থাকতে দেব না’, ‘খালেদা জিয়াকে বন্দী রেখে নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না’, ‘তারেক রহমান বীরের বেশে আসবে ফিরে বাংলাদেশে’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকে। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে কার্যালয়ের সামনে তার বিশাল প্রতিকৃতি সম্বলিত কয়েকটি ডিজিটাল ব্যানার টানানো হয়। সভাপতির বক্তব্যে খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রসঙ্গ টেনে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘মিথ্যা-মামলায় দেশনেত্রীকে কারাগারে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। আমি জনগণের কাছে ফরিয়াদ করতে চাই, দেশনেত্রী আজ গণতন্ত্রের জন্য কারাগারে রয়েছেন। স্বামী হারিয়েছেন, পুত্র হারিয়েছেন, বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন, এক পুত্র নির্বাসিত। তার কী এটা প্রাপ্য এই জাতির কাছে? আজকে আপনাদের বুকে সাহস নিয়ে, বুকে বল নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। গণতন্ত্রের মাতাকে আমরা আর কারাগারের অন্তরালে দেখতে চাই না। সরকারকে বলতে চাই,  দেশনেত্রীকে অবিলম্বে মুক্তি দিন। তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। অন্যথায় সব দায়দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে।’ বিএনপি মহাসচিব জাতীয় ঐক্যের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আসুন এখন আর কোনো বিভেদ নয়, গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য, দেশকে রক্ষা করার জন্য, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগে আহ্বান করেছিলেন জাতীয় ঐক্য তৈরি করতে। সেই জাতীয় ঐক্য তৈরি হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমরা স্বাগত জানাই যারা আজকে ঐক্য করছে। আমরা তাদের আহ্বান জানাই আসুন আরও বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলি এই দুঃশাসনকে, এই স্বৈরাচারকে, যারা আমাদের বুকের ওপর বসে আছে তাদের পরাজিত করি।’

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হামলার রায় নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্র হচ্ছে অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আজকে নতুন ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। রায়ের আগেই বলা হচ্ছে ২১ আগস্ট মামলায় তারেক রহমানের সাজা হবে। আপনারা কী বিচারকের দায়িত্ব নিয়েছেন? ষড়যন্ত্র করেছেন ঠিকমতো? আপনারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই মামলার তদন্তকে প্রভাবিত করেছেন। তিনজন আইও পরিবর্তন হওয়ার পরে আওয়ামী লীগ সরকার আসার পরে নতুন করে তদন্ত করিয়েছেন। মুফতি হান্নানকে দিয়ে একটা মিথ্যা ১৬৪ ধারায় তারেক রহমানকে আসামি করেছেন। আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, এ ধরনের ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেবে না এবং দেশের মানুষ এর দাঁতভাঙা জবাব  দেবে।’

আওয়ামী লীগ বিএনপিভীতি, খালেদা জিয়াভীতি, তারেক রহমানভীতিতে ভুগছে অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘রাতে তাদের নেতারা বিএনপিভীতিতে চিৎকার করে ওঠে— এ বুঝি বিএনপি এলো। এ ভয়ে তাদের ঘুম হয় না। এ থেকে বাঁচার জন্য কত রকমের কারসাজি। এখন নিয়ে আসছে কী ইভিএম। যদি এই মেশিন তাদের রক্ষা করতে পারে, তাদের জানের মানুষ তাদের রক্ষা করতে পারবে না। জনগণ তাদের কাছ থেকে দূরে সরে  গেছে।’ জনসভা সফল করার জন্য কারাবন্দী খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শুভেচ্ছা বার্তাও নেতা-কর্মীদের জানিয়ে দেন বিএনপি মহাসচিব।

প্রধান অতিথির ভাষণে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার  মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের নেতা-কর্মীদের কাছে আবেদন, আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হোন। আন্দোলন ছাড়া, দেশনেত্রী মুক্ত হওয়া ছাড়া, মাদার অব ডেমোক্র্যাসির মুক্তি ছাড়া গণতন্ত্র মুক্ত হবে না, জাতীয় সংসদ নির্বাচনও হবে না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবাজ, ব্যাংক ডাকাতি ও লুটেরা চিহ্নিত ব্যক্তিরা যাতে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যেতে না পারে তার ব্যবস্থা আপনাদের গ্রহণ করতে হবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘সরকার  দেশনেত্রীর মুক্তি আটকিয়ে রেখেছে। আইনি প্রক্রিয়ায় তার মুক্তি সম্ভবপর নয়। একমাত্র পথ হচ্ছে রাজপথ। আমাদের আন্দোলন হবে আমাদের নেত্রীর মুক্তির জন্য, সংসদ ভেঙে দেওয়ার জন্য, একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘ক্ষমতাসীনদের সুষ্ঠু নির্বাচনে ভয় কেন? দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। আগামী দিনে তাঁর নেতৃত্বেই নতুন সরকার গঠন হবে ইনশা আল্লাহ।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘গত রাতে বাসাবাড়িতে পুলিশ পাঠিয়েও আপনারা জনসভার জনস্রোত রুখতে পারেননি। এই জনসভা আপনাদের পতন ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। সরকারকে বলতে চাই, এখনো সময় আছে সাবধান হোন।  দেশনেত্রীকে মুক্তি দিন।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ ও এরশাদ ছাড়া এ দেশের সব মানুষ চায়। এই এরশাদ গৃহপালিত বিরোধী দল নয়, হিজড়া। তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘আজ গণতন্ত্র গুম হয়েছে। গণতন্ত্রের নেত্রীও জেলে। তাঁকে জেলে রেখে সন্তানেরা আজ ভালো নেই। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য শেখ হাসিনা ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে পদত্যাগ করতে হবে।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ভয়ভীতি করে ক্ষমতায় থাকার নীলনকশায় ওরা ভরসা করতে পারছে না বলে এখন ইভিএমের ওপর ভর করেছে। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, দেশনেত্রীকে মুক্তি দিতে হবে। আর অবৈধভাবে জোর করে ক্ষমতায় থাকা যাবে না। নইলে গণতন্ত্রের মা  দেশনেত্রীর মুক্তির জন্য যে সুনামি আসবে তাতে ইভিএমসহ সব কিছু ভেসে যাবে। দেশের জনগণ আজকে স্বৈরাচার থেকে মুক্ত হতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।’

দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেল বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জেলে এটা আমাদের জন্য বেদনার ও লজ্জার। শেখ হাসিনাকে বলব, জনগণের আওয়াজ কী আপনি শুনতে পাচ্ছেন না? এই আওয়াজ আপনার পতনের আওয়াজ। ক্ষমতাসীন দলের লুটেরাদের বিরুদ্ধে পাড়ায়-মহল্লায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বানও জানান তিনি।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow