Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২২:৫১
শ্রমবাজার নিয়ে হচ্ছেটা কী
জুলকার নাইন
শ্রমবাজার নিয়ে হচ্ছেটা কী

দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানিতে আস্থার প্রতীক ছিল উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থাভুক্ত জিসিসির ছয়টি দেশ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভিসা জটিলতা, কূটনৈতিক ব্যর্থতাসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে ক্রমে সংকুচিত হয়ে এসেছে এ শ্রমবাজার। ফলে প্রতিবছর কমছে জনশক্তি রপ্তানি। চলতি বছরের প্রথমার্ধে গত বছরের এই সময়ের তুলনায় ৪৫ শতাংশের বেশি জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। সৌদি আরবের নতুন আইন, নানা চেষ্টা সত্ত্বেও আরব আমিরাতের বন্ধ শ্রমবাজার খুলতে না পারা ভাবিয়ে তুলেছে প্রবাসীদের। একমাত্র আশার আলো জ্বালিয়ে রাখা মালয়েশিয়ায়ও তৈরি হয়েছে নতুন আশঙ্কা। এত কিছুর পরও থেমে নেই জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে এজেন্সিগুলোর নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-হানাহানি আর বিদেশ গমনেচ্ছুদের সঙ্গে প্রতারণা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি ব্যবসা এখন বহির্বিশ্বে ‘ভিসা ট্রেডিং’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। কারণ আমাদের দেশের জনশক্তি রপ্তানিকারী ব্যবসায়ীরা জনশক্তি রপ্তানিতে যতটা না উৎসাহী, তার চেয়ে বেশি উৎসাহী ভিসা ব্যবসায়। জনশক্তি রপ্তানির নামে অবৈধ বেআইনি ভিসা ব্যবসা তারা এখন জনশক্তি খাত থেকে সম্প্রসারিত করে শিক্ষা এবং বিদেশে অভিবাসন খাত পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে। ফলে শুধু জনশক্তি রপ্তানি খাত মহাসংকটে পড়েনি, এই খাত থেকে আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমতে শুরু করেছে। অপরদিকে ‘ভিসা ট্রেডিং’ করে দরিদ্র মানুষের টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ দুই হাতে লুটে নিচ্ছে একশ্রেণির অসৎ জনশক্তি ব্যবসায়ী। তারা বিদেশে প্রেরণের নামে বিদেশ গমনেচ্ছুদের কাছ থেকে প্রয়োজনের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ গুণ পর্যন্ত বেশি টাকা আদায় করে নিজেরা যেমন আত্মসাৎ করছে, তেমনি বিদেশে তাদের ‘ভিসা ট্রেডিং’ পার্টনারদের অবৈধভাবে শত শত কোটি টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছে। বিদেশে এ ধরনের ব্যবসা পাকাপোক্তভাবে করার জন্য অনেক জনশক্তি ব্যবসায়ী শ্রমিক নিয়োগকারী দেশে অফিস করেছে, এজেন্সি খুলেছে, সে দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছে, এমনকি কেউ কেউ সে দেশে বিয়ে করেছে। শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে সে দেশের নিয়োগকর্তা বা জনশক্তি আমদানিকারক সাজিয়ে জমজমাটভাবে ‘ভিসা ট্রেডিং’ চালিয়ে যাওয়ার উদাহরণও আছে। অন্যদিকে ভুয়া কাগজপত্রে শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার দেশেও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘ভিসা ট্রেডিং’য়ের কথা গোপন না করে, বরং লোকজনকে প্রলুব্ধ করে অনেক টাকার চুক্তিতে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডায় লোক পাঠানো হচ্ছে। এতে একদিকে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে শত শত বাংলাদেশি বিদেশ গিয়ে প্রতারিত হয়ে, কাজ না পেয়ে, না খেয়ে থাকছে, জেলে যাচ্ছে অথবা কোনো টাকা উপার্জন না করেই দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। পাশাপাশি বদনাম হচ্ছে বাংলাদেশের, নষ্ট হচ্ছে শ্রমবাজার।

জানা যায়, একসময় কুয়েত ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাজার। অথচ এখন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বাজারটি। এ ছাড়া ছোট হয়ে এসেছে সৌদি আবরের শ্রমবাজার। লিবিয়ার দুয়ারও বন্ধ। ইরাকও প্রায় বন্ধের মতোই। অথচ জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনাময় এই খাত থেকে অতীতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। শেষে একমাত্র মালয়েশিয়ার বাজার ছিল চাঙা। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতার নামে কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির অহেতুক শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব, আরেক পক্ষের বাজার কুক্ষিগত রাখার ইচ্ছা প্রায় নষ্ট করে ফেলেছে এই শ্রমবাজারকে। কোনো ধরনের প্রতারণার ঘটনা না ঘটিয়ে জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে যখন গতি বাড়ানো প্রয়োজন ছিল, তখন বায়রার দুই পক্ষের হানাহানিতে জিটুজি প্লাস পদ্ধতিই বন্ধ হয়ে গেল। এখন পুরনো পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় গিয়ে আবার প্রতারিত হয়ে বাংলাদেশিদের রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রাণভোমরার ভূমিকা পালনকারী এই খাতে প্রাণসঞ্চার করতে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোর দুয়ার বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য এখন কার্যত বন্ধ। চলতি বছর বিদেশগামী ১০ লাখ কর্মীর ৯০ শতাংশেরই গন্তব্য পুরনো বাজার মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে। সে ক্ষেত্রেও বিরাজ করছে নানা ধরনের সংকট। কিন্তু এসব বিষয়ে সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ না করে বায়রার নেতারা ব্যস্ত নিজেদের মধ্যে হানাহানি নিয়ে। চলতি নির্বাচন ইস্যুতে দুই পক্ষ মুখোমুখি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সি আর আবরার বলেন, বায়রার কাজ সম্পর্কেও স্বচ্ছতা দরকার। আইন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু এর বাস্তবায়ন দরকার। অনিয়মিত অভিবাসন রোধ করতে হবে। তিনি বলেন, দালাল একটা বাস্তবতা। তাদের ডেটাবেজ সিস্টেম এবং জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। শ্রমিকদের সমস্যার জন্য অনেক সময় অন্য মন্ত্রণালয় দায়ী থাকলেও  প্রবাসী মন্ত্রণালয়কে দায়ী করা হয়।

বিকল্প নেই দক্ষ শ্রমিকের : বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের ৯০ লাখেরও বেশি প্রবাসী শ্রমিকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু এশিয়ার অনেক দেশ একই সময়ে এর চেয়েও অনেক কম প্রবাসী শ্রমিকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পেয়েছে বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। উল্টো এ দেশের অদক্ষ অনেক শ্রমিক পদে পদে হয়রানি ও শোষণের শিকার হন। নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতা না থাকায় কম মজুরিতে নিয়োগ, নিচু পদে কাজ করা, এমনকি চাকরিচ্যুত হওয়াসহ নানা রকম বিড়ম্বনায় পড়েন তারা। বিদেশে গিয়ে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে এমন উদাহরণও ঢের। জনশক্তি আমদানিকারক দেশগুলো অদক্ষ কর্মী নিতেও আগ্রহী নয়।

দেশের একমাত্র সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল হান্নান জানান, প্রবাসে ১০ জন অদক্ষ কর্মী যা আয় করতে পারেন, এর চেয়ে বেশি আয় করতে পারেন তিনজন দক্ষ কর্মী। অন্যদিকে প্রশিক্ষণ না নিয়ে গেলে সারা জীবন শ্রমিকই থাকতে হয়। তাই শ্রশিক্ষণ নিয়েই বিদেশে যাওয়া উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, বাংলাদেশে অল্পশিক্ষিত ও অদক্ষ লোকদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বেশি। এ সুযোগও নিচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। তারা অদক্ষদের বিদেশে পাঠাচ্ছে, নিজেরা ট্রেনিং সেন্টারও খুলছে না। তাই সরকারকেই প্রাথমিকভাবে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। ট্রেনিং খাত লাভজনক হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এতে বিনিয়োগে উৎসাহী হবে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow