Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : রবিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৪৭
পাঁচ পাঁচে বিপরীত চিত্র
মানিক মুনতাসির
পাঁচ পাঁচে বিপরীত চিত্র
bd-pratidin

সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত (ফাস্টট্র্যাকভুক্ত) ১০টি প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে পদ্মা সেতুর কাজ। পদ্মা নদীতে তিনটি স্প্যান বসানো হয়েছে। ফলে এ প্রকল্পের প্রায় এক কিলোমিটার এখন দৃশ্যমান। স্বপ্নের এই পদ্মা সেতু ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। মেইন ব্রিজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড জানিয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে কমপক্ষে আরও তিন বছর সময় লাগবে। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে মেট্রোরেলের কাজও এগোচ্ছে ক্ষিপ্র গতিতে। বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের দিয়াবাড়ী-আগারগাঁও পর্যন্ত প্রথম অংশ আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কাজের অগ্রগতির এই চিত্র বাস্তবতায়ও দেখা যাচ্ছে। এমনকি মেট্রোরেলের কোচ তৈরির কাজও শুরু হয়েছে জাপানে। এ ছাড়া পদ্মা সেতুতে যেদিন থেকে গাড়ি চলবে সেদিন থেকে রেল চলাচল ব্যবস্থাও খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা। এ কাজের জন্য ইতিমধ্যে চীনের সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে। রেলের ইঞ্জিন এবং বগি তৈরির কাজও শুরু করেছে চীন। 

টানা ১০ বছরের উন্নয়নমূলক কাজের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে যাচ্ছে মহাজোট সরকার। এ জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর কাজের অগ্রগতির তথ্য পৃথকভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা খসড়া প্রতিবেদনের তথ্য থেকে জানা গেছে, অগ্রাধিকার প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের মূল কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এর টারবাইন ও জেনারেটর বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পের এক নম্বর ইউনিটে গত ১৮ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কোর ক্যাচার’ বা ‘মেল্ট ট্র্যাপ’ স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। রিয়্যাক্টরের তলদেশে স্থাপিত এই ডিভাইসটি আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিষ্ক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদিকে প্রায় ১০ বছর ধরে পরিকল্পনাতেই আটকে আছে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর, দোহাজারী ঘুমধুম রেলপথ প্রকল্প। তবে সামান্য অগ্রগতি রয়েছে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের। আর রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প আদৌ হবে কিনা, এ নিয়ে বিতর্ক এখনো চলছে। সুন্দরবনের কাছাকাছি হওয়ায় পরিবেশের ঝুঁকি রয়েছে এমন অভিযোগে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করে আসছে শুরু থেকেই। সরকার অবশ্য এ ব্যাপারে অনড় অবস্থান নিয়েছে। তবে বাস্তবে কাজ শুরু হয়নি এখনো। এ ছাড়া ফাস্টট্র্যাকভুক্ত ১০টি প্রকল্পের বাইরে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ এগোচ্ছে দ্রুতগতিতে। এ প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি এগিয়েছে। এ এক্সপ্রেসওয়ের প্রথম অংশের ৭ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার অংশে মোট ২৩৩টি পিলার হবে। এরই মধ্যে ৪০টি পিলারের কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। আংশিক কাজ হয়েছে আরও ৪০টি পিলারের। নির্মাণ কাজের জন্য আনা হয়েছে ভারী যন্ত্রপাতি। বিমানবন্দরের সামনে প্রি-কাস্ট ইয়ার্ড তৈরি করা হয়েছে। ওই ইয়ার্ডে এক্সপ্রেসওয়ের গাডার তৈরি করা হচ্ছে। পরে তা নিয়ে মূল কাঠামোর সঙ্গে জোড়া দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনও করা হবে এ মেয়াদেই। যার প্রস্তুতি নিচ্ছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

পদ্মা সেতু : জানা গেছে, পদ্মা সেতুর পঞ্চম স্প্যান বসানো হয়েছে। পুরো প্রকল্পের কাজ এগিয়েছে ৫৮ শতাংশ। পঞ্চম স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে সেতুর কাজ আরেক ধাপ এগিয়েছে। যার ফলে সেতুটির ৭৫০ মিটার দৃশ্যমান হয়েছে। ৪২টি পিলারের মধ্যে ১১টি পিলার উঠেছে। নকশা বাকি রয়েছে সাতটি পিলারের। নদীতে ৪০টি পিলারে ২৬২টি পাইল ড্রাইভ করতে হচ্ছে পদ্মা সেতুতে। এখন পর্যন্ত পাইল ড্রাইভ শেষ হয়েছে ১৬৫টির।

সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, পদ্মা সেতুর কাজ মোটামুটি দ্রুতই এগোচ্ছে। পরিকল্পনামাফিক বাস্তবায়ন কাজ এগিয়ে নিতে পারলে ঘোষিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব হতো। নদীর স্রোত ও গতিপথসহ প্রতিকূল পরিবেশ মাঝে মাঝেই প্রকল্পের কাজে বাধার সৃষ্টি করেছে। ফলে বাস্তবায়নের সময় কিছুটা বাড়বে। তিন বছর আগে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাজ শুরু হয়। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতুর কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে না। ২০১৯-এ এটি চালু করা যাবে বলে জানিয়েছেন সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম। প্রায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে চলছে সেতুর নির্মাণকাজ।

পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ : পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ প্রকল্পের কাজের জন্য ইতিমধ্যে চীনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। সেতুটি যেদিন খুলে দেওয়া হবে সেদিনই সেতুর উভয় অংশ রেল চলাচলের জন্য প্রস্তুত থাকবে। তবে সে সময়ের মধ্যে সেতুর উভয় প্রান্তে রেললাইন প্রস্তুত হওয়া নিয়ে অনিয়শ্চতা দেখা দিয়েছে। ফলে এ প্রকল্পের মেয়াদও বাড়াতে হবে সরকারকে। এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ১৩ শতাংশ। নদীর উপরিভাগের বাইরে নদীর উভয় পাশের প্রকল্প এলাকার মোট ৯টি জেলায় জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি তিন জেলায় এ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে।

মেট্রোরেল : রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে দুটি পিলার যুক্ত করে মেট্রোরেলের একটি স্প্যান বসানো হয়েছে। এর মাধ্যমেই দৃশ্যমান হয়েছে মেট্রোরেলের লাইনের কাজ। এ ছাড়া চলতি মাসেই আগারগাঁও এলাকায় বসানো হতে পারে আরেকটি স্প্যান। এ এলাকায় পিলার নির্মাণের কাজ চলছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের আগেই মেট্রোরেলের উত্তরা-আগারগাঁও অংশ ট্রেন চলাচলের জন্য প্রস্তুত হবে বলে আশা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্প এলাকায় দিন-রাত নির্ঘুম পালাক্রমে কাজ করছেন প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র : জানা গেছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রকল্প এলাকার এক, দুই উভয় ইউনিটে টারবাইন ও জেনারেটর বসানো হচ্ছে। পুরো প্রকল্পের কাজ প্রায় ২০ শতাংশ এগিয়েছে। গত ১৮ আগস্ট এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের এক নম্বর ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কোর ক্যাচার’ বা ‘মেল্ট ট্র্যাপ’ স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। রিয়্যাক্টরের তলদেশে স্থাপিত এই ডিভাইসটি আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিষ্ক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাবনায় পদ্মা নদীর পাড়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন নেতৃত্ব দিচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজে। বলা হচ্ছে, দুই ইউনিটের এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ নির্ধারিত ২০২৪ সালে এবং প্রথম ইউনিটের কাজ ২০২৩ সালের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কর্ণফুলী টানেল : চট্টগ্রামে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের নির্মাণ কাজ ২৪ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কয়েক দিন আগে পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ কাজ পরিদর্শন শেষে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এ কথা বলেন। এ ছাড়া আগামী মাসেই এ প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্পের পাইলিং কাজ চলছে। ‘ওয়ান সিটি অ্যান্ড টু টাউন’ মডেলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় কর্ণফুলী নদীর তলদেশে চার লেনের টানেলটি নির্মাণ করছে। ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। পাঁচ বছরের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে চীন ২ শতাংশ হারে সুদের শর্তে ২০ বছর মেয়াদে ঋণ দিচ্ছে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ জোগানো হবে সরকারি তহবিল থেকে।

মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল সম্পন্ন : কক্সবাজারের মহেশখালীতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এ টার্মিনালের মাধ্যমে ইতিমধ্যে এলএনজি আমদানিও শুরু হয়েছে।

রামপাল ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র : জানা গেছে, সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের মধ্যে রামপাল ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের অগ্রগতি খুবই সামান্য। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট কাজের ১১ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। যদিও সুন্দরবনের পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে এমন আশঙ্কায় পরিবেশবাদীরা এর বিরোধিতা করে আসছেন দীর্ঘদিন থেকে। এ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার কথা ২০২১ সালে। আর মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ এখন পর্যন্ত এগিয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এ প্রকল্পের কাজ শেষ করার সময় ২০২৪ সাল।

পায়রা ও সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর : পায়রা বন্দর নির্মাণ কর্তৃপক্ষের অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পটিকে ১৯টি কম্পোনেন্টে ভাগ করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় কিছু জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। এ প্রকল্পের নির্মাণ কাজেও তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। এ ছাড়া সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি বাস্তবিকপক্ষে শূন্য।

দোহাজারী ঘুমধুম রেলপথ : দোহাজারী ঘুমধুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। এর মধ্যে প্রকল্প এলাকায় কিছু জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে। আর প্রকল্পের কাজের সুবিধার্থে একটি জরিপ করা হয়েছে। যা কোনোভাবেই সন্তোষজনক অগ্রগতি নয় বলে মনে করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। জানা গেছে, এসব প্রকল্পের বাইরে গত ১০ বছরে মহাজোট সরকার ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কয়েকটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করেছে, যা দেশের যোগাযোগ খাতে সাফল্য এনেছে। শুধু তাই নয়, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করেছে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উেক্ষপণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সেই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে চলমান সাফ ফুটবলের ম্যাচগুলো পরীক্ষামূলকভাবে সম্প্রচার করা হচ্ছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow