Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২২:৫৯
হলোই না ডাকসু নির্বাচন
নিজস্ব প্রতিবেদক
হলোই না ডাকসু নির্বাচন
bd-pratidin

প্রায় ২৮ বছর ধরে হয় না ডাকসু নির্বাচন। এই নির্বাচনের জন্য চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ছয় মাসের সময় বেঁধে দেয় আদালত। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচনের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে নির্বাচন হওয়ার যে সম্ভাবনা প্রদীপ জ্বলে উঠেছিল তাও আবার নিভু প্রায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্য হাল ছাড়ছে না। যে কোনো মূল্যে তারাও চান ডাকসু নির্বাচন। এ জন্য কাজও শুরু হয়েছে বলে জানায় প্রশাসন। কেন্দ্রীয় ও হলভিত্তিক ভোটার তালিকা করে ডাটাবেজ তৈরি, পরিবেশ পরিষদের (ক্রিয়াশীল) সঙ্গেও কথাবার্তাও শুরু হয়েছে।

তবে সরকারি দল সমর্থিত ছাত্রলীগ ছাড়া অনেকেই হলের আবাসিক ছাত্র হলেও ক্যাম্পাসে যেতে পারছে না ছাত্রলীগের বাধায়। এমনকি পরীক্ষা পর্যন্ত দিতে পারছে না। এ অবস্থায় কোনো কোনো ছাত্রনেতা বলছেন, নির্বাচনের আগে ছাত্র সংগঠনগুলোর সহাবস্থান খুবই জরুরি। পরিবেশ পরিষদকেও কার্যকর করতে হবে। নির্বাচনকে উৎসবমুখর করে তুলতে হলে ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের বিকল্প নেই।

ঢাবি প্রশাসন আন্তরিক : প্রক্টর : সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানীর কাছে। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডাকসু নির্বাচনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন খুবই আন্তরিক। সবাই চায় ডাকসু নির্বাচন। কেন্দ্রীয়ভাবে এবং হলকেন্দ্রিক ভোটার তালিকা তৈরি করে একটি ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। আগামী বছরের মার্চ মাস অর্থাৎ স্বাধীনতার মাসেই ডাকসু নির্বাচন করতে চায় বর্তমান প্রশাসন। সেই লক্ষ্যে চলছে প্রস্তুতি গ্রহণের কাজ। তৈরি হচ্ছে ভোটার তালিকা। আশা করি, মার্চের পরে আর কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না—‘কেন ডাকসু নির্বাচন হয় না?’ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি এসব কথা বলেন। অধ্যাপক গোলাম রব্বানী বলেন, ডাকসু নির্বাচনের বিষয়টি সব সময় আলোচনায় ছিল। সর্বশেষ নির্বাচনের সময় আমি ছাত্র ছিলাম। তখন আমিও ভোট দিয়েছিলাম। নির্বাচন একটি ধারাবাহিক পক্রিয়া। এর মধ্য দিয়ে নতুন নতুন নেতৃত্ব উঠে আসে। কিন্তু ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়াটি ঢাবিসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যত্যয় ঘটেছে। দীর্ঘ দিন ধরে ডাকসু নির্বাচনও হয়নি। বর্তমান উপচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পরই ডাকসু নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে এবং সেই জন্য ছাত্রদের দীর্ঘ দিনের যে দাবি সেটি পূরণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ঢাবি প্রক্টর বলেন, ডাকসু নির্বাচনের জন্য মানসিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি দরকার। সে জন্য আমি বিভিন্ন সময়ে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে ডাকসু নিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু প্রায় তিন দশক আগে যে নির্বাচনটি হয়েছিল তখনকার অবস্থা আর বর্তমান অবস্থার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে।

নির্বাচন না হওয়ার সংস্কৃতি চাই না : ছাত্রলীগ : ডাকসুসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। নির্বাচনের জন্য ছাত্রলীগ সব সময় প্রস্তুত রয়েছে জানিয়ে শোভন বলেন, ডাকসু নির্বাচন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাণের দাবি। আমরাও চাই ডাকসু নির্বাচন হোক। দীর্ঘদিন ধরে আমরাও নির্বাচনের পক্ষে কথা বলে আসছি। প্রশাসনের কাছে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছি। এরই ধারাবাহিকতায় প্রশাসন আগামী বছরের মার্চ মাসে নির্বাচনের কথা বলছে। আশা করি নির্বাচন না হওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তা দূর হবে। ছাত্রলীগ সভাপতি বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্রদের প্রকৃত প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠছে না।

আগে জরুরি সহাবস্থান : ছাত্রদল সভাপতি : ডাকসু নির্বাচনের আগে ক্যাম্পাসে সবার আগে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর সহাবস্থান জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাজিব আহসান। তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আগে আন্তরিক হতে হবে। তাদের একতরফা নীতি গ্রহণ করা যাবে না। পরিবেশ পরিষদকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। যে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের মতো একটি সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা হলে যেতে পারে না, নিয়মিত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না, সেখানে ভোটের পরিবেশ কীভাবে বজায় থাকবে বোধগম্য নয়। এ জন্য ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর রাজনৈতিক ও একাডেমিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। একতরফাভাবে ভোটার তালিকা করে যদি ছাত্রদলকে বলে নির্বাচনে অংশ নিন, তাহলে তো সুষ্ঠু ভোট হবে না। এ জন্য ছাত্রদের ক্যাম্পাসে নিয়মিত ক্লাস ও রাজনীতি করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু ঢাবি প্রশাসন এখন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো আলোচনা করেনি।’

অতি দ্রুত নির্বাচন চাই : লিটন নন্দী : ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেছেন, ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিনির্মাণ রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। বর্তমানে ডাকসুর অনুপস্থিতির কারণে ক্যাম্পাসে অগণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে। ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস, গেস্ট রুমে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন, সিট বাণিজ্যসহ নানা কারণে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ঘটেছে। অতি দ্রুত ডাকসু নির্বাচন দিয়ে দক্ষ নেতৃত্ব বাছাইয়ের মধ্য দিয়েই এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। লিটন নন্দী বলেন, গত জানুয়ারি মাসে হাই কোর্ট ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন করতে নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু প্রশাসন কোনো রকম মেয়াদ বৃদ্ধি না করেই আগামী বছর নির্বাচন করার কথা বলছে। এক্ষেত্রে তারা আদালত অবমাননা করেছে। নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন না করায় প্রশাসনকে আইনি নোটিসও দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই অনতিবিলম্বে ডাকসু নির্বাচন করে সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হোক। ছাত্র ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক বলেন, প্রশাসন ও ক্ষমতাসীনরা জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে ডাকসু নির্বাচনের তুলনা করার কারণে সংকট তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় বলা হয় ক্যাম্পাসে ডাকসু নির্বাচন করার মতো পরিবেশ নেই।

 কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত স্বৈরাচার শাসনের সময় প্রায়ই ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল থাকত। কিন্তু সেই সময়েও ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। আর বর্তমানে ক্যাম্পাস অনেক স্থিতিশীল। সুতরাং পরিবেশের কথা বলে নির্বাচন বিলম্বিত করার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে গণতন্ত্র চর্চার সর্বোচ্চ জায়গা। কিন্তু সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধিত্ব না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের স্বৈরতন্ত্র চলছে। সামগ্রিক অগণতান্ত্রিক এই ব্যবস্থা থেকে মুক্তির জন্য ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে সিনেটের মূল স্টেক হোল্ডার বা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সব ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রশাসনকে ঐকমত্য সৃষ্টি করতে হবে।

লিটন নন্দী বলেন, ডাকসু নির্বাচনের জন্য ছাত্র ইউনিয়ন প্রস্তুত। প্রশাসন নির্বাচনের উদ্যোগ নিলেই আমরা মাঠে নামব। যদি নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা হয় তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত আমাদের দিকেই আসবে। কারণ শিক্ষার্থীরা সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ বা গেস্টরুমে নির্যাতনকারীদের ভোট দেবে না।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow