Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:০২
বিশেষ আদালতে হাজির হতে অস্বীকৃতি খালেদা জিয়ার
অনুপস্থিতিতে বিচার চলবে কিনা শুনানি আজ
নিজস্ব প্রতিবেদক

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত অস্থায়ী এজলাসে হাজির হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গতকাল এই মামলার যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য দিন ধার্য থাকলেও খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির না করে কাস্টডি প্রতিবেদন পাঠায় কারা কর্তৃপক্ষ। এতে বলা হয়, খালেদা জিয়া আদালতে হাজির হতে অনিচ্ছুক। পরে আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়া যায় কিনা, আইনজীবীদের কাছে এ বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা চান বিচারক। এসব বিষয়ে অধিকতর শুনানি ও আদেশের জন্য আজ বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ড দেয় আদালত। ওই দিন আদালত থেকেই খালেদা জিয়াকে নিয়ে যাওয়া হয় নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে। অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের পর খালেদা জিয়াকে একদিনও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় শুনানিতে হাজির করা সম্ভব হয়নি। প্রায় প্রতি তারিখেই আদালতকে তার অসুস্থতার কথা জানানো হয়েছে কারাগারের পক্ষ থেকে। এরপর আদালত স্থানান্তর করে এই পুরনো কারাগারে আনা হলে প্রথম ধার্য তারিখে খালেদা জিয়া এলেও গতকাল আদালতে হাজির হতে অনীহা প্রকাশ করেন। আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল। খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া। অপর দুই আসামি মনিরুল ইসলাম ও জিয়াউল ইসলাম মুন্নার পক্ষে বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম। এ সময় মহানগর পিপি আবদুল্লাহ আবু ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন মানিক আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

গতকাল বেলা ১২টা ২০ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে খালেদার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া আদালতে বলেন, এ আদালত প্রকাশ্য আদালত নয়, এটা সংবিধান পরিপন্থী। তিনি মামলার বিচার কার্যক্রম স্থ্থগিত রেখে খালেদা জিয়ার জামিন বাড়ানোর আবেদন করেন। এ অবস্থায় বিচারক খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের কাছে জানতে চান, মামলার প্রধান আসামির অনুপস্থিতিতে কীভাবে জামিন শুনানি হবে? কাস্টডিতে লেখা তিনি আদালতে আসতে অনিচ্ছুক। আবার জামিন চাইলেন। তাহলে কীভাবে বিচার চলবে? আইন কী বলে? এর কোনো জবাব দেননি খালেদার আইনজীবীরা। এ সময় জামিনের বিরোধিতা করে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতে বলেন, খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন। তিনি আদালতে না এলে আইন অনুযায়ী এ মামলার বিচারকাজ চলবে।

খালেদার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, খালেদা জিয়া অসুস্থ। আমাদের চারজন সিনিয়র আইনজীবী কারাগারে উনার সঙ্গে দেখা করেছেন। দলের মহাসচিব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। তিনি বলেন, কারাগারের ভিতরে আদালত বসানো আইনের পরিপন্থী কিনা, সংবিধান পরিপন্থী কিনা সেটা দেখতে হবে। রাষ্ট্রপক্ষের উচিত ছিল এখানে আদালত বসানোর আগে প্রধান বিচারপতির মতামত নেওয়া। এ সময় দুদকের আইনজীবী কাজল বলেন, বার বার বলা হচ্ছে খালেদা অসুস্থ। উনি (খালেদা) কিসের অসুস্থ। উনি আদালতে এসে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সবাই দেখেছেন। এ পর্যায়ে আরেক আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্নার আইনজীবী আমিনুল ইসলাম আদালতকে বলেন, এ আদালত গুহার মতো। এখানে ঠিকমতো শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া যায় না। যে কোনো সময় যে কারও ‘সাফোকেশন’ হতে পারে। এ আদালত সংবিধান পরিপন্থী। এক মাসের জন্য আদালতের কার্যক্রম মুলতবি চেয়ে করা আবেদনে আমিনুল বলেন, আইনজীবী, সাংবাদিকদের বসার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। সাধারণ মানুষের আদালতে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। এটি কোনোভাবে প্রকাশ্য আদালত হতে পারে না। এ ব্যাপারে আদালতের হস্তক্ষেপ চান তিনি।

এরপর দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতকে বলেন, আইন মেনে এ আদালত গঠিত হয়েছে। খালেদা জিয়ার সুবিধার জন্য এখানে আদালত বসেছে। একদিকে খালেদার আইনজীবীরা বলছেন, এ আদালত প্রকাশ্য আদালত নয়, সংবিধান পরিপন্থী। অথচ এ আদালতে আবার জামিন চাচ্ছেন। কাজল আরও বলেন, এ মামলার প্রধান আসামিকে যথাযথ সম্মান দিয়েই বিচার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। খালেদা জিয়া বলছেন, তিনি আদালতে আসবেন না। তিনি বিচারকাজে সহায়তা করছেন না। তার নিরাপত্তার কথা ভেবে এখানে আদালত বসেছে। এ সময় খালেদা জিয়া আদালতে আসতে না চাইলে তাকে অনুপস্থিত রেখে বিচার কার্যক্রম চালানোর জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেন তিনি। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে বেশ কিছু সময় তর্ক-বিতর্ক চলে।  এ ছাড়া প্রধান আসামি খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে কীভাবে এ মামলার বিচার কার্যত্রক্রম চলবে, তার অনুপস্থিতিতে যুক্তিতর্ক শুনানি করা যাবে কিনা? এ নিয়ে আদালতে খালেদার আইনজীবী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবীরা গতকাল নিজ নিজ পক্ষে বক্তব্য রাখেন। আসামির অনুপস্থিতিতে যুক্তিতর্ক শুনানি চালানো যায় কিনা, এ বিষয়ে দুই পক্ষের আইনজীবীর কাছেই ব্যাখ্যা চান বিচারক। আইনজীবীদের ব্যাখ্যা শুনে আজ বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে আদেশের জন্য দিন ধার্য করে বেলা ১টা ২০ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম মুলতবি করেন বিচারক। এদিকে, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার শুনানি উপলক্ষে গোটা আদালত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। সকাল থেকে পুরনো কারাগারের সামনের সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ রাখা হয় আশপাশের দোকানপাটও। মোতায়েন করা হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য।

কুমিল্লার দুই মামলায় খালেদার জামিন শুনানি পেছাল : কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে কাভার্ড ভ্যান পোড়ানো এবং চৌদ্দগ্রামে বাসে আগুন দিয়ে আটজন হত্যার পৃথক দুটি মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি পিছিয়েছে। গতকাল কাভার্ড ভ্যান পোড়ানোর মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের ওপর অধিকতর শুনানির জন্য আজ বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছে কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক কে এম সামছুল আলম। অন্যদিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনে খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি পিছিয়ে ২০ সেপ্টেম্বর দিন ঠিক করেন কুমিল্লার ৫ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক বিপ্লব দেবনাথ। পরে খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিংকু বলেন, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে কাভার্ড ভ্যান পোড়ানো মামলায় খালেদা জিয়ার জামিনে একাধিক দিন শুনানি হয়েছে। বারবার অধিকতর শুনানি চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের লক্ষ্য খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটকে রাখা। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম উপজেলার হায়দারপুল নামক স্থানে একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ২০১৫ সালের ২৬ জানুয়ারি চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই নুরুজ্জামান হাওলাদার বাদী হয়ে থানায় বিএনপি চেয়ারপারসনসহ ২০ দলের স্থানীয় ৩২ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়। মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নাশকতায় হুকুমের অভিযোগ আনা হয়। ২০১৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে ২০-দলীয় জোটের অবরোধের সময় চৌদ্দগ্রামের জগমোহনপুরে একটি বাসে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। এতে আটজন যাত্রী দগ্ধ হয়ে মারা যান, আহত হন ২০ জন। এ ঘটনায় চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই নুরুজ্জামান বাদী হয়ে ৭৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow