Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০২:১১
সিনহার বিরুদ্ধে ১১ অভিযোগ আইনজীবীদের
প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেবে দুদক
নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজের আত্মজীবনী ও বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে বই লিখে নতুন করে আলোচনায় আসা সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতিসহ ১১টি নৈতিক স্খলনজনিত যে অভিযোগ রয়েছে তার দ্রুত তদন্ত দাবি করেছেন আইনজীবীদের একটি অংশ। অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন, ঘুষগ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিদেশে অর্থ পাচার ও নারী কেলেঙ্কারি অভিযোগ রয়েছে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে। আইনজীবীদের দাবি, দেশের সাবেক একজন প্রধান বিচারপতি নিজে দুর্নীতি করেছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এখন নিজেই আবার মিথ্যাচার করে বই লিখছেন। তাদের মন্তব্য, এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক রবিবার নারায়ণগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) খতিয়ে দেখছে। দুদক তাঁর বিরুদ্ধে যখন মামলা করবে, তখনই মামলা হবে। সরকার এখানে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।’ আইনমন্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে গতকাল সাংবাদিকরা দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদকে প্রশ্ন করেন। তার জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘মন্ত্রীর কথায় মামলা হবে না। তদন্তও হবে না। তিনি যেসব কথা বলেছেন, সবই তার একান্ত বিষয়। দালিলিক প্রমাণ ছাড়া দুদক কারও বিরুদ্ধে তদন্ত বা অনুসন্ধান করে না। গতকাল বিকালে দুদক প্রধান কার্যালয়ে ইকবাল মাহমুদ এসব কথা বলেন। এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে ১১ অভিযোগের কথা আমরা বছর খানেক আগে থেকেই শুনে আসছিলাম। ওই সময় ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্্হাব মিঞাসহ আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিরা এসব অভিযোগের বিষয়ে একমত হয়ে সিনহার সঙ্গে এজলাসে বসবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেন। তার মন্তব্য, এখন তিনি নিজে বিচার বিভাগকে কলুষিত করার জন্য মিথ্যাচার করে বই লিখছেন। তিনি বলেন, সময় এসেছে বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোর তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ইয়াদিয়া জামান বলেন, বিচারপতি সিনহার মতো এমন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি এর আগে বিচার বিভাগে কোনোদিন দেখা যায়নি। তিনি নিজে নানা ধরনের অপকর্ম করেছেন। এখন সেই অপকর্ম ঢাকতে মিথ্যাচার করে যাচ্ছেন। সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বিচারপতি সিনহা দায়িত্বে থাকা অবস্থায়ও নানা অপকর্ম করে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। এখন আবার বইয়ে মনগড়া মিথ্যা কথা লিখে বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া এস কে সিনহার বিরুদ্ধে থাকা ১১ অভিযোগ হলো— সাবেক এই প্রধান বিচারপতির আয়-ব্যয়ের হিসাব সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে থেকে ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ব্যাংকে টাকা পাওয়া গেছে। সিঙ্গাপুরেও একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিচারপতি সিনহার দেড় কোটি টাকা ও অস্ট্রেলিয়ায় আরেকটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বাংলাদেশি টাকায় এক কোটি টাকা রয়েছে। দেশের বাইরে কোনো ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সিনহা সেই অনুমতি নেননি। এ ছাড়া কানাডায় একটি ব্যাংকে বিচারপতি সিনহার নামে আরেকটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সন্ধানও পেয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এই অ্যাকাউন্ট খুলতে সিনহা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, এস কে সিনহা তথ্য গোপন করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজে ও ভাইয়ের নামে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে অবৈধভাবে প্লট নিয়েছেন। সেই প্লটের মূল্যও পরিশোধ করেননি। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিম কোর্ট শাখায় বিচারপতি সিনহার বেতন অ্যাকাউন্টে দুটি পে-অর্ডারে চার কোটি টাকা জমা হয়। এই টাকার উৎস তিনি জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি আয়কর হিসাবেও এই টাকা দেখাননি। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পাঁচজন ব্যবসায়ীকে বিভিন্ন মামলায় অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার জন্য বিচারপতি সিনহা অন্তত ৬০ কোটি টাকা বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের ব্যাংকের অনুমোদন না নিয়ে অবৈধ পন্থায় বিদেশে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার করেছেন। যে ব্যক্তিকে দিয়ে টাকা পাচার করিয়েছেন তিনি স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই একজন সাবেক বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা বন্ধ করতে দুদককে চিঠি দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার এবং অধস্তন আদালতে বিচারক বদলির ক্ষেত্রেও ঘুষ গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, সুপ্রিম কোর্টের একজন নারী কর্মকর্তার (জেলা জজ পদমর্যাদার বিচারক) সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, যার ভিডিও রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া হয়। সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে থাকা এ ১১ অভিযোগের পাঁচটি তদন্তে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক চারটি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দুটির তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।

প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা : আইনমন্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে গতকাল সাংবাদিকরা দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদকে প্রশ্ন করেন। তার জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘মন্ত্রীর কথায় মামলা হবে না। তদন্তও হবে না। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা সম্পর্কে অপর প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান আরও বলেন, ফারমার্স ব্যাংকের দুই ব্যক্তিকে চার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। এস কে সিনহা ওই ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা অনেক বড় বিষয়। এ নিয়ে আমাদের বিব্রত না করাই ভালো। ওই টাকা এস কে সিনহার অ্যাকাউন্টে গেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, প্রমাণ ছাড়া আমরা কোনো মামলা করব না। দালিলিক প্রমাণ পেলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

 উল্লেখ্য, রবিবার বিকালে নারায়ণগঞ্জের চাঁদমারীতে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী সমিতির কার্যকরী কমিটির অভিষেক ও ডিজিটাল বার ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানের বক্তব্যে আইনমন্ত্রী সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে দুর্নীতিবাজ বলে অভিহিত করেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow